বিজ্ঞাপন
আফরিন আলম অথৈ
বাঙালি পাঠকদের প্রকৃতি ও পরিবেশের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে শিখিয়েছেন কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বর্ণনায় পরিবেশের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়গুলো মনোমুগ্ধকর রূপে উঠে আসে। আর সেই প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যকার যোগসূত্র নিয়েই রচিত হয়েছে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আরণ্যক’। বইটি নিয়ে বহু আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে এটি এমন একটি কালজয়ী সৃষ্টি, যা নিয়ে হাজার হাজার শব্দ লেখার পরেও আরও কথা থেকে যাবে।
‘আরণ্যক’ পাঠককে নিয়ে যায় অপার্থিব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। যে কখনো কোনো দিন গাছপালা আর প্রকৃতির দিকে চোখ মেলে তাকায়নি, তার কাছেও প্রকৃতি এসে নবীন রূপে ধরা দেবে। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে পাঠকদের এক প্রকারের চক্ষুদান করেন বিভূতিভূষণ। মনে হয়, তিনি আঙুল দিয়ে ইশারা করে শিখিয়ে দেন, কীভাবে দেখতে হয় এই নৈসর্গিক পৃথিবীকে। অরণ্য এবং অরণ্যের আশ্রয়ে বেঁচে থাকা প্রতিটি প্রাণ যে কত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সুতোয় গাঁথা থাকে, সেটাও পাঠকের কাছে উপলব্ধ হবে।
আরও পড়ুন
মা একটি নদীর নাম: সত্যিকারের জীবনগাথা
সেই অরণ্যের ভূমিকন্যা ছিল মঞ্চীর মতো উচ্ছ্বসিত যৌবনা তরুণী। সামান্য আর নিতান্তই তুচ্ছ কারণে যার মন উদ্বেলিত হতো। আর ছিল রাজকুমারী ভানুমতী; বিশাল জংলি পাহাড়ে চড়ে চড়ে যে শুনত পাখির কলকাকলি আর শিহরিত হতো তার পূর্বপুরুষদের অস্তিত্ব আবিষ্কারে। কত শত বছরের পুরোনো কবরগুলো দেখে ফিরে যেত অজানা অতীতের ভাবনায়। প্রকৃতি, অরণ্য, বন্যপশু আর মানুষ—কী চমৎকার ভাগাভাগি করে নিয়েছিল তারা এই পৃথিবীকে। বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার আলো তো না-ই, এমনকি ছায়াটিও যাদের জীবনে এসে পৌঁছায়নি; তাদেরই গল্পকথায় আবর্তিত হতে থাকে লেখকের এই জীবনস্মৃতি।
এই উপন্যাসে প্রাকৃতিক নৈসর্গিকতার বর্ণনার সাথে আর যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো—প্রকৃতি, মানুষ ও পশুপাখির সহাবস্থান। কিন্তু এই সহাবস্থানের অন্ধকার দিকও তো ছিল। সেই সাথে এই সহাবস্থান কীভাবে এবং কতটা প্রভাবিত করে মানবজীবনকে, তাও দেখা যায় স্পষ্টভাবে। আবার এই বোধটাও চলে আসে যে, সৌন্দর্যতৃষ্ণার চাইতেও মানবজীবনে ক্ষুধা-তৃষ্ণা অর্থাৎ জৈবিক প্রয়োজনের তাড়নাই মুখ্য।
আরও পড়ুন
পদে পদে মৃত্যুফাঁদ অতিক্রম করে কি পাওয়া যাবে ‘যকের ধন’
শত প্রজাতির অরণ্যানীর ভিড়ে তৎকালীন ভারতবর্ষের অন্ধকারাচ্ছন্ন লবটুলিয়া, নাড়া বইহার প্রমুখ অঞ্চলের মানুষগুলোর জীবন সেই অসার ভূমিতে নিভু নিভু হয়ে ছিল। অভাব আর বন্যপ্রাণীর আক্রমণই নিত্যসঙ্গী ছিল তাদের। তাদের নিত্য আহার্য হিসেবে ছিল ‘কলাই’। আর সাদা ভাত তাদের জন্য ছিল খুবই উপাদেয় খাবার। দেখা যায় কুন্তার মতো এক সম্বলহীন মাকে, সন্তানের ক্ষুধাই যার উৎকণ্ঠার একমাত্র কারণ। আরও ছিল ‘ধাতুরিয়া’র মতো হতদরিদ্র কিশোর, অরণ্যের ছন্দে যার নিত্যকুশলী প্রতিভা বেড়ে উঠতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানেও নিষ্ঠুর সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা ‘অভাব’ এসে বাধ সাঁধে। এই অভাবের ছোপ লেগে আছে প্রতিটি চরিত্রে, মূলত গহীন প্রকৃতিসিদ্ধ সৌন্দর্যভূমির আড়ালে লুকিয়ে ছিল কুৎসিত ‘অভাব’। গল্পের শেষে সেই ‘অভাব’ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে প্রকৃতির বেড়ে ওঠার স্বাধীনতায় হতক্ষেপের বিষয়টিই চিত্রিত হয়েছে।
প্রকৃতিকে তার মতো বেড়ে উঠতে দিলে কি মানবজাতির উৎকর্ষ সম্ভব হতো? না, পৃথিবীতে সৌন্দর্যবোধ আর প্রয়োজনীয়তার মধ্যে প্রয়োজনই মানুষকে টিকিয়ে রেখেছে। বিশাল অরণ্যানীর গহীনে খাদ্যের ছিল বড়ই অভাব। আর তাই, বন পুড়িয়ে তৈরি হলো ফসলের জমি। সেই ভূখণ্ডের মানুষ জয় করল প্রতিকূলতা, তারা পেল আধুনিক পৃথিবীর সভ্যতার আলো। কালে কালে এভাবেই মানবজাতি সৌন্দর্যবোধকে উপেক্ষা করে প্রয়োজনীয়তার স্বার্থে এগিয়ে গেল। সেই অরণ্য, সেই প্রকৃতি আর সেই অরণ্যসংকুল প্রাণীদের আশ্রয় সরিয়ে দিয়েই তো মানুষ এই নিরাপদ আশ্রয় পেল। অতঃপর পৃথিবীটা হলো ‘মানুষের’।
লেখক: শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
এসইউ
বিজ্ঞাপন