জাতীয়

মাছের সংকট কাটছে, প্রাণ ফিরছে উপকূলের জেলেদের

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
10 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
দীর্ঘদিনের মাছের সংকট কাটিয়ে অবশেষে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে পটুয়াখালীর উপকূলীয় জেলেদের মধ্যে। গত এক সপ্তাহ ধরে সাগরে জেলেদের জালে বাড়ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের পরিমাণ। প্রতিদিন শত শত মাছ ধরার ট্রলার মাছ নিয়ে ফিরছে পটুয়াখালীর আলীপুর-মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে। মাছের সরবরাহ বাড়ায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে মৎস্যবন্দরজুড়ে। জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততায় এখন মুখর পুরো এলাকা। প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত আলীপুর ও মহিপুরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে চলছে মাছ ওঠানো, বাছাই, ওজন ও বিক্রির ব্যস্ততা। সাগর থেকে মাছভর্তি ট্রলার ঘাটে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আড়তদার ও শ্রমিকদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ট্রলার থেকে ঝুড়ি ও ক্যারেটে করে মাছ নামিয়ে নেওয়া হচ্ছে আড়তে। এরপর ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আকার ও মান অনুযায়ী বাছাই করে নিলামে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা জেলেরাও আলীপুর-মহিপুরে মাছ বিক্রি করছেন। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ভোলা, নোয়াখালী, হাতিয়া ও পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকার মাছ ধরার ট্রলার এসব মৎস্যবন্দরে এসে ভিড়ছে। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে মাছের সরবরাহ। দীর্ঘদিন ধরে সাগরে আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় একদিকে যেমন জেলেদের লোকসান গুনতে হয়েছে, অন্যদিকে বাজারে মাছের সরবরাহ কম থাকায় দামও ছিল তুলনামূলক বেশি। তবে গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। সাগরে মাছের পরিমাণ বাড়ায় আলীপুর-মহিপুরের আড়তগুলোতে বেড়েছে ইলিশের সরবরাহ। এর প্রভাব পড়েছে দামে। ‘সাগরে মাছের প্রাপ্যতা বাড়ায় গত কয়েকদিন ধরে আলীপুর-মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সরবরাহ বেড়েছে। ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ বাড়লে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং দামও কিছুটা কমে আসে। পানির চাপ কমলে বড় ইলিশও বাড়বে বলে আশা রাখি।’ ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সাইজের ইলিশের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় মণপ্রতি প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে। এতে একদিকে যেমন জেলেরা মাছ ধরে ভালো দাম পাচ্ছেন, অন্যদিকে সরবরাহ বাড়ায় ব্যবসায়ীরাও স্বস্তিতে মাছ কিনতে পারছেন। বর্তমানে ছোট জাটকা ইলিশ মণপ্রতি প্রায় ১৯ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম মণপ্রতি প্রায় ৬০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকা। আর এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি এক লাখ টাকার ওপরে। তবে মাছের আকার, মান, সতেজতা ও বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাম কিছুটা কমবেশি হচ্ছে। ইলিশের পাশাপাশি আড়তগুলোতে দেখা মিলছে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। বড় বড় ট্রলার থেকে একের পর এক মাছ নামানো হচ্ছে। মাছের সরবরাহ বাড়ায় আড়তগুলোর পুরোনো কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। নোয়াখালী থেকে মাছ বিক্রি করতে আলীপুরে আসা ট্রলার মাঝি জব্বার হোসেন বলেন, আমরা প্রায় ৩ লাখ টাকার বাজার নিয়ে সমুদ্রে গিয়েছিলাম। মাছ পেয়েছি প্রায় ৭ লাখ টাকার। গত এক সপ্তাহ ধরে সাগরে মাছ বাড়ছে। আগে অনেক কষ্ট করে মাছ খুঁজতে হয়েছে। এখন তুলনামূলকভাবে ভালো মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এতে জেলেদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তিনি আরও বলেন, সমুদ্রে মাছ পাওয়া গেলে আমাদের আয় বাড়ে। ট্রলারের খরচ, জ্বালানি, বরফ, খাবারসহ অনেক খরচ আছে। মাছ না পেলে এসব খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে যায়। এখন মাছ বেশি পাওয়ায় আমরা আশাবাদী। আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ী মো. মিজানুর রহমান বলেন, গত কয়েকদিন ধরে মাছের সরবরাহ অনেকটাই বেড়েছে। ইলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছও আসছে। সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছে। আগে মাছের সংকটের কারণে ব্যবসায়ীদের বেশি দামে মাছ কিনতে হয়েছে। এখন মাছ বেশি আসায় কেনাবেচাও বাড়ছে। ‘সাগরে মাছের প্রাপ্যতা কিছুটা বেড়েছে। আলীপুর-মহিপুরসহ জেলার বিভিন্ন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ বাড়ার এখনই সময়, বছরের এই সময়ে মাছের সরবরাহ বাড়ে জেলেরাও খুশি থাকে। সরবরাহ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে দামের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।’ মহিপুর ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি রাজু আহম্মেদ রাজা বলেন, দীর্ঘদিন সাগরে মাছ কম থাকায় জেলে ও ট্রলার মালিকরা বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন। প্রতিটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে জ্বালানি, বরফ, খাবার, শ্রমিকের মজুরিসহ বিপুল টাকা খরচ হয়। মাছ না পেলে সেই খরচই ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। মাছের সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দরে বেড়েছে শ্রমিকদের ব্যস্ততা। ট্রলার থেকে মাছ নামানো, বাছাই, বরফ দেওয়া, ওজন করা, নিলামে তোলা ও পরিবহন। সবকিছুতেই এখন আগের তুলনায় কর্মচাঞ্চল্য বেশি। মাছভর্তি ট্রলার ঘাটে ভেড়ার পরপরই শ্রমিকরা ছুটে যাচ্ছেন ট্রলারের কাছে। কেউ মাছ নামাচ্ছেন, কেউ আড়তে নিয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ মাছের ওজন ও হিসাব করছেন। অন্যদিকে আড়তদারদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠছে পুরো মৎস্যবন্দর। মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, সরবরাহ কম থাকলে যেমন দাম বাড়ে, তেমনি পর্যাপ্ত মাছ এলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং দাম কিছুটা কমে আসে। বর্তমানে আলীপুর-মহিপুরে মাছের সরবরাহ বাড়ায় এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। পাইকারি ক্রেতা মো. সোলাইমান বলেন, গত কয়েকদিন ধরে আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দরে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ অনেক বেড়েছে। আগে মাছের সংকট থাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল, ফলে বেশি দামে মাছ কিনতে হয়েছে। এখন সাগর থেকে প্রচুর মাছ আসায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং এর প্রভাব পড়েছে দামের ওপরও। তিনি আরও বলেন, আমরা পাইকারি ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় কিছুটা কম দামে মাছ কিনতে পারছি। একই সঙ্গে মাছের মান ও আকার অনুযায়ী বিভিন্ন দামে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। এতে আমাদের ব্যবসার জন্যও সুবিধা হচ্ছে। জেলেরা মাছ পাচ্ছেন, আড়তদাররা মাছ বিক্রি করতে পারছেন, আর আমরাও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাছ পাঠাতে পারছি। ‘সাগরে মাছের প্রাপ্যতা কিছুটা বেড়েছে। আলীপুর-মহিপুরসহ জেলার বিভিন্ন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ বাড়ার এখনই সময়, বছরের এই সময়ে মাছের সরবরাহ বাড়ে জেলেরাও খুশি থাকে। সরবরাহ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে দামের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।’ কুয়াকাটা মৎস্য আড়তের খুচরা বিক্রেতা শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন, গত কয়েকদিন ধরে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়তে শুরু করছে। আগে মাছ কম আসায় দামও বেশি ছিল। এখন সাগর থেকে বেশি মাছ আসায় ইলিশের দাম কিছুটা কমেছে। এতে সাধারণ ক্রেতারাও আগের তুলনায় স্বস্তিতে মাছ কিনতে পারছেন। তবে মাছের আকার ও মানের ওপর দাম নির্ভর করছে। তবে আমরা আশা করছি দাম আরও কমবে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি ও জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, সাগরে ইলিশের প্রাচুর্য একটি স্বাভাবিক মৌসুমি প্রক্রিয়ার অংশ। পরিবেশ ও পানির তাপমাত্রা অনুকূলে থাকলে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের বিচরণ ও খাদ্যপ্রাপ্তি বাড়ে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণ বন্ধ রেখে মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ জালের ব্যবহার না কমালে মাছের উৎপাদন বাড়বে না। পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, সাগরে মাছের প্রাপ্যতা কিছুটা বেড়েছে। আলীপুর-মহিপুরসহ জেলার বিভিন্ন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ বাড়ার এখনই সময়, বছরের এই সময়ে মাছের সরবরাহ বাড়ে জেলেরাও খুশি থাকে। সরবরাহ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে দামের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি আরও বলেন, মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ও প্রজনন বাড়াতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জরুরি। জেলেদেরও আইন মেনে মাছ আহরণের পাশাপাশি ছোট মাছ ও জাটকা রক্ষায় সহযোগিতা করতে হবে। ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞায় সমুদ্রগামী নিবন্ধিত জেলেদের জন্য মাসে ৪০ কেজি করে ভিজিএফ চালের ৫৮ দিনের হিসাব অনুযায়ী একজন জেলে মোট প্রায় ৭৭ কেজি ৩৩০ গ্রাম চাল দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কলাপাড়া উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৮ হাজার ৩০৫ জন। অন্যদিকে, ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ নিষেধাজ্ঞার সময় নিবন্ধিত জেলে পরিবারগুলোর জন্য জনপ্রতি ২৫ কেজি করে ভিজিএফ চাল দেওয়ার সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছ ধরতে না পারা জেলে পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সহায়তা দেওয়া হয়। কলাপাড়া মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপ-কেন্দ্র প্রধান ড. কাজী বেলাল উদ্দিন বলেন, লম্বা সময়ে মাছের উৎপাদন কম তবে বর্তমানে মাছের পরিমান দেখা মিলছে, তাই আমাদের পর্যবেক্ষণ চলছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ টন। তবে বর্তমান উৎপাদন এখনো জানা যায়নি। কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, সাগরে মাছের প্রাপ্যতা বাড়ায় গত কয়েকদিন ধরে আলীপুর-মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সরবরাহ বেড়েছে। ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ বাড়লে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং দামও কিছুটা কমে আসে। পানির চাপ কমলে বড় ইলিশও বাড়বে বলে আশা রাখি। এনএইচআর
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>