ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট বা আইবিএর প্রতি শিক্ষার্থীদের একটা আলাদা আগ্রহ আছে। নিয়োগদাতারাও আইবিএ স্নাতকদের একটু আলাদা চোখে দেখেন। আইবিএতে ভর্তি প্রসঙ্গে লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর স্নাতক জেসমিমা জেমিম। গত বছর পাস করে তিনি এখন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে কাজ করছেন।

ব্যবসা বা করপোরেট জগতের প্রতি যদি আগ্রহ থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় আইবিএ হতে পারে প্রথম পছন্দ। আইবিএর প্রস্তুতিটা কিন্তু বেশ অন্য রকম। এখানে শুধু মুখস্থ করে ভালো ফল করার সুযোগ কম। দরকার ইংরেজি, গণিত, যুক্তি এবং ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা।
আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, আইবিএতে পড়তে হলে যে বাণিজ্য বিভাগ থেকেই আসতে হবে, এমন কোনো কথা নেই, বরং বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীই এখানে বেশি। তাই বিভাগ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে প্রস্তুতি শুরু করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আমি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ নিয়েই বলি। ভর্তি পরীক্ষা মূলত তিনটি বিষয়ে হয়—ইংরেজি, গণিত ও অ্যানালিটিক্যাল বা বিশ্লেষণী দক্ষতা। অন্য অনেক ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে এর খুব বেশি মিল নেই। তার ওপর আসনসংখ্যা মাত্র ১২০। ফলে শুরুতেই অনেকের মনে হয়, ‘থাক, আমাকে দিয়ে হবে না।’ কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, ভয় পাওয়ার চেয়ে একবার চেষ্টা করে দেখা ভালো।
প্রস্তুতি শুরু করার আগে আমি বরং একটা কাজ করতে বলব, আগের কোনো বছরের প্রশ্ন নিয়ে বসে একটা পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট দিন। সময় ধরে পরীক্ষা দেবেন, নেতিবাচক নম্বরের হিসাবও করবেন। এরপর দেখুন, তিনটির মধ্যে কোনটিতে আপনার অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। শুরু করুন সেখান থেকেই। কারণ, আইবিএর পরীক্ষায় তিনটি বিষয়েই আলাদাভাবে ভালো করতে হয়। গণিতে দুর্দান্ত নম্বর পেয়েও লাভ নেই, যদি ইংরেজি বা বিশ্লেষণী দক্ষতায় খারাপ করেন।
গণিতে মূলত বীজগণিত ও জ্যামিতির মতো বিষয়ই আসে, তবে প্রশ্নগুলো তুলনামূলক কঠিন। আর এখানে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা যায় না। তাই দ্রুত গুণ-ভাগ করা, মাথায় হিসাব করতে পারা এবং সময় বাঁচানোর কৌশল জানা খুব কাজে দেয়।
ইংরেজিতে গ্রামারের খুঁটিনাটি জানার পাশাপাশি শব্দভান্ডার (ভোকাবুলারি) বাড়াতে হবে। শুধু বইয়ের শব্দ মুখস্থ করলেই হবে না; নিয়মিত শুদ্ধ ইংরেজি লেখা ও পড়ার অভ্যাস করতে হবে।
বিশ্লেষণী দক্ষতা একটু ভিন্ন। একাডেমিক পড়াশোনায় আলাদা বিষয় হিসেবে এটি আমরা সাধারণত পড়ি না। এখানে যুক্তি, মনোযোগ ও ধৈর্য দিয়ে বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। প্রথম দিকে কঠিন লাগলেও পরে প্রশ্নগুলো সমাধান করতে বেশ মজাই লাগে। একই সমস্যাকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখার অভ্যাসও তৈরি হয়।
আমি কোনো ব্যক্তিগত শিক্ষক রেখে পড়িনি। একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলাম মূলত দিকনির্দেশনার জন্য। এরপর প্রচুর প্রশ্নব্যাংক সমাধান করতে করতে পরীক্ষার সময় ব্যবস্থাপনা আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেছি। আইবিএর প্রশ্নের পাশাপাশি জিআরই (গ্র্যাজুয়েট রেকর্ড এক্সামিনেশন), জিম্যাট (গ্র্যাজুয়েট ম্যানেজমেন্ট অ্যাডমিশন টেস্ট), টোয়েফলের (টেস্ট অব ইংলিশ অ্যাজ আ ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ) বই থেকেও প্রশ্ন সমাধান করেছি। বাইরের বই পড়ে শব্দভান্ডার বাড়িয়েছি।
আমি বেশ আলসে। তাই খুব যে পড়ার টেবিলে বসে দুলে দুলে পড়তাম, তা নয়, বরং প্রায়ই শুয়ে শুয়ে গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতাম। আলস্যের এই দোষই শাপেবর হয়ে উঠেছিল; মাথায় দ্রুত হিসাব করার অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
আইবিএর ভর্তি পরীক্ষা মূলত একটি দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষা। তাই দিনে ১০ ঘণ্টা পড়তেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই বরং নিয়মিত অনুশীলন, নিজের দুর্বলতা বোঝা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১২০ মিনিটের পরীক্ষায় ৯০ মিনিটের বহুনির্বাচনী অংশ এবং ৩০ মিনিটের লিখিত অংশ—দুটিই মাথা ঠান্ডা রেখে সামলাতে হয়।
১. ৯০ মিনিটের বহুনির্বাচনী পরীক্ষায় প্রথম লক্ষ্য হবে তিনটি বিষয়েই নিরাপদ অবস্থানে থাকা। এরপর যে অংশে আপনি সবচেয়ে ভালো, সেখানে নম্বর বাড়ানোর চেষ্টা করুন।
২. নিজের কাছে মিথ্যা বলবেন না। কোন বিষয়ে আপনি ভালো, কোনটিতে দুর্বল—এটা যত দ্রুত বুঝবেন, প্রস্তুতিও তত কার্যকর হবে।
৩. প্রশ্নব্যাংকের চেয়ে একটু কঠিন প্রশ্ন সমাধান করুন। তাহলে পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র তুলনামূলক সহজ মনে হবে। আর যেহেতু এটি দক্ষতা ও যুক্তি যাচাইয়ের পরীক্ষা, পাঠ্যবইয়ের বাইরের আর্টিকেল পড়া, বই পড়া কিংবা ভালো সিনেমা দেখাও আপনার চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
আইবিএ ছিল জীবনের অন্যতম সেরা সময়। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি হয়তো কঠিন, কিন্তু সেই ১২০ আসনের একটিতে জায়গা করে নেওয়ার পর আদতে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন নয়; বরং বাকি জীবনটার গল্পই নতুন করে লেখা শুরু হয়। তখন মনে হয়, কষ্টটা সার্থক।
বাংলাদেশে ব্যবসায় প্রশাসন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একটি বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট হিসেবে পরিচালিত হয়। স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউট হিসেবে আইবিএ রয়েছে। এ ছাড়া আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিলেট ও সাভারে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>