ব্রেকিং নিউজ
আদালতে ‘অপহৃত’ প্রেসিডেন্টের ধারালো যুক্তি, বাতিল হবে মামলা? সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ২ দিনে ২,৩০০ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে ৩৭ হাজার আবেদন  শাপলা চত্বরের মামলা: হাসিনা–আজিজসহ ৩০ আসামিকে আত্মসমর্পণে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ আত্মশুদ্ধির জন্য নিভৃত ইবাদত কেন জরুরি যমুনা ব্যাংকে চাকরির সুযোগ, দেখুন আবেদনের যোগ্যতা হঠাৎ ভেসে ওঠে এক দ্বীপ, আবার উধাও সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে এপিএমডি, সভাপতি মহিউদ্দিন সম্পাদক জাহিদ শ‌জি‌মে‌কে দ্বিতীয় দিনে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি জামালপুর-ঢাকা রুটে বাস চলাচল বন্ধ, ভোগান্তি বেরোবিতে যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে আলোচনা সভা
জাতীয়

কোন পথে বাংলা কবিতা

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

গত এক দশকে বাংলা সাহিত্যের আসরে একটি বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠেছে—‘ফেসবুকের কবি’ আর ‘বইয়ের কবি’ নিয়ে। একদিকে আছেন তাঁরা, যাঁরা এখনো লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা আর প্রকাশনার দীর্ঘ, ধৈর্যশীল পথে হেঁটে কবিতা লেখেন; অন্যদিকে আছেন তাঁরা, যাঁরা মুহূর্তের মধ্যে ফেসবুকের টাইমলাইনে কবিতা পোস্ট করে হাজার হাজার লাইক আর মন্তব্য পান। এই দুই ধারার মধ্যে টানাপোড়েন শুধু মাধ্যমের পার্থক্য নয়—এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সাহিত্যের মান, পাঠকের রুচি, প্রকাশনার অর্থনীতি এবং কবি-পরিচয়ের সংজ্ঞা নিয়ে গভীর প্রশ্ন। এই নিবন্ধে আমরা দুই ধারার ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, পারস্পরিক সমালোচনা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা কবিতার প্রকৃত অভিমুখ কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বাংলা কবিতার আধুনিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে মূলত মুদ্রিত শব্দের হাত ধরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে জীবনানন্দ দাশ, তারপর চল্লিশের দশকের কল্লোল-কালিকলম যুগ, পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কৃত্তিবাস গোষ্ঠী, সত্তর দশকের হাংরি আন্দোলন—এই সমস্ত ধারা গড়ে উঠেছে ছোট ছোট সাহিত্য পত্রিকা বা ‘লিটল ম্যাগাজিন’কে কেন্দ্র করে। এই পত্রিকাগুলো সাধারণত বাণিজ্যিক লাভের চিন্তা না করে, স্রেফ সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রকাশিত হতো। সম্পাদক, সহলেখক আর পাঠকদের একটি ঘনিষ্ঠ চক্র মিলে কবিতার মান যাচাই করতেন—কবিতাটি ছাপা হওয়ার আগে বহুবার সম্পাদনা, প্রত্যাখ্যান আর পুনর্লিখনের মধ্য দিয়ে যেত।

এই প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য। একজন তরুণ কবিকে বছরের পর বছর পত্রিকার দরজায় ঘুরতে হতো, প্রবীণ কবি-সম্পাদকদের কাছে নিজের কবিতা দেখাতে হতো, সমালোচনা হজম করতে হতো। কিন্তু এই কষ্টসাধ্য পথের একটি সুফলও ছিল—কবিতার ভাষা, ছন্দ, চিত্রকল্প ও গঠনের ওপর একধরনের কঠোর নজরদারি তৈরি হতো। ‘বইয়ের কবি’ বলতে আমরা যাঁদের বুঝি, তাঁরা মূলত এই ধারারই উত্তরসূরি—যাঁরা এখনো মনে করেন কবিতা একটি নির্মাণশিল্প, যার জন্য সময়, ধৈর্য ও নিমগ্নতা প্রয়োজন। তাঁদের কাছে বই এখনো কবিতার প্রকৃত ও স্থায়ী আবাসস্থল—যা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ঊর্ধ্বে থেকে পাঠকের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করে।

২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ—উভয় অঞ্চলেই ফেসবুক কবিতার এক বিস্ফোরণ ঘটে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা আর ইন্টারনেট সংযোগের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যে কেউ, যেকোনো সময়, নিজের অনুভূতি কবিতার আকারে লিখে সরাসরি হাজার হাজার পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন—কোনো সম্পাদকের অনুমোদন ছাড়াই, কোনো প্রকাশকের দ্বারস্থ না হয়েই। এই সহজলভ্যতা কবিতাকে এক অর্থে গণতান্ত্রিক করে তুলেছে। যাঁরা প্রথাগত সাহিত্য-বলয়ের বাইরে থেকে এসেছেন—মফস্‌সলের তরুণ, গৃহিণী, চাকরিজীবী, প্রবাসী বাঙালি—তাঁরাও এখন কবি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন।

ফেসবুক-কবিতার ভাষা সাধারণত সহজ, সরাসরি ও আবেগঘন। প্রেম, বিরহ, একাকিত্ব, সামাজিক অন্যায়, রাজনৈতিক ক্ষোভ—এই বিষয়গুলো নিয়ে ছোট ছোট পঙ্‌ক্তিতে লেখা কবিতাগুলো দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। কিছু কবি এই মাধ্যমেই বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে পরবর্তী সময়ে বই প্রকাশ করেছেন এবং সেই বই বেস্টসেলারের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে, যা প্রথাগত প্রকাশনাজগতের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বইমেলায় এখন এমন অনেক তরুণ কবির স্টলে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, যাঁদের নাম প্রথাগত সমালোচক-মহল আগে কখনো শোনেননি।

এই দুই ধারার সংঘাতের মূল কেন্দ্রে আছে একটি প্রশ্ন—কবিতার ‘মান’ কে নির্ধারণ করবে? প্রথাগত সাহিত্য-বলয় মনে করে, কবিতার মান নির্ধারিত হওয়া উচিত সম্পাদক, সমালোচক ও বিদগ্ধ পাঠকদের দ্বারা—যাঁরা ভাষা, ছন্দ, চিত্রকল্প ও গভীরতার নিরিখে একটি কবিতাকে যাচাই করেন। অন্যদিকে ফেসবুককেন্দ্রিক কবিতার জগতে মান নির্ধারিত হয় লাইক, শেয়ার আর মন্তব্যের সংখ্যা দিয়ে—অর্থাৎ পাঠকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই এখানে চূড়ান্ত বিচারক। এই দুই মানদণ্ডের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। একটি কবিতা যা অ্যালগরিদমের কারণে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা অগত্যা সাহিত্যিক গুণে সমৃদ্ধ না–ও হতে পারে—আবার একটি নিরীক্ষাধর্মী, জটিল কবিতা, যা সাহিত্য পত্রিকায় প্রশংসিত হয়, তা হয়তো সাধারণ পাঠকের কাছে কখনোই পৌঁছাবে না। ফলে ভালো কবিতা বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তা নিয়েই এখন দুই শিবিরের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব তৈরি হয়েছে।

প্রথাগত সাহিত্য-সমালোচকদের অনেকেই ফেসবুক কবিতাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। তাঁদের প্রধান আপত্তিগুলো কী? আসুন বোঝার চেষ্টা করি। প্রথমত রয়েছে দ্রুততার চাপ। ফেসবুকের সংস্কৃতিতে একজন কবি প্রায় প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন কবিতা পোস্ট করার তাগিদ অনুভব করেন, কারণ নিয়মিত উপস্থিতিই অনুসারী ধরে রাখার একমাত্র উপায়। এই তাড়াহুড়োয় কবিতা সম্পাদনা, পুনর্লিখন বা দীর্ঘ সময় ধরে ভাবনার অবকাশ প্রায়ই থাকে না। দ্বিতীয়ত, সূত্রায়িত আবেগ। সমালোচকদের অভিযোগ, অনেক ফেসবুক কবিতা একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে তৈরি হয়—সহজ প্রেম-বিরহের বাক্য, চমকপ্রদ শেষ পঙ্‌ক্তি, যা মূলত ‘শেয়ারযোগ্য’ হওয়ার জন্যই লেখা। এতে ভাষার গভীরতা বা নতুন চিত্রকল্প নির্মাণের বদলে জনপ্রিয় আবেগকে সহজ ভাষায় মুড়ে দেওয়া হয়, যাকে অনেকে ‘উর্দু শায়েরি ঘরানার বাংলা সংস্করণ’ বলেও কটাক্ষ করেন। তৃতীয়ত, সম্পাদকীয় নজরদারির অভাব। লিটল ম্যাগাজিনে একটি কবিতা প্রকাশের আগে যে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেত, ফেসবুকে তার কোনো বালাই নেই। ফলে ভাষাগত ত্রুটি, দুর্বল গঠন বা চিন্তার অসম্পূর্ণতা নিয়েই কবিতা প্রকাশিত হয়ে যায়। চতুর্থত, স্থায়িত্বের প্রশ্ন। ফেসবুকের পোস্ট অ্যালগরিদমনির্ভর—আজ যা টাইমলাইনে ভেসে ওঠে, কাল তা হারিয়ে যায় হাজারো নতুন পোস্টের ভিড়ে। এটি বইয়ের মতো একটি স্থায়ী মুদ্রিত দলিল তৈরি করে না, যা বছরের পর বছর ধরে গ্রন্থাগারে বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে টিকে থাকে।

তবে এই সমালোচনার বিপরীতেও শক্তিশালী যুক্তি আছে। আছে গণতন্ত্রীকরণের প্রশ্ন। বহু দশক ধরে বাংলা সাহিত্যের জগৎ একধরনের কেন্দ্রীভূত বলয়ে আবদ্ধ ছিল—ঢাকা বা কলকাতার নির্দিষ্ট কিছু সাহিত্য পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমেই একজন কবির ‘স্বীকৃতি’ নির্ধারিত হতো। এই ব্যবস্থায় প্রান্তিক অঞ্চলের, নারী, নিম্নবিত্ত বা প্রবাসী লেখকদের জন্য প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত। ফেসবুক এই দেয়াল অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে—এখন যে কেউ নিজের কণ্ঠ সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। আছে তাৎক্ষণিক সংযোগের সুযোগ। ফেসবুক কবিতা পাঠকের সঙ্গে একধরনের সরাসরি, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে, যা প্রথাগত প্রকাশনায় সম্ভব ছিল না। একজন পাঠক সরাসরি মন্তব্যে কবির সঙ্গে কথা বলতে পারেন, নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন—এই সংযোগ কবিতাকে আরও জীবন্ত করে তোলে। আছে নতুন পাঠক তৈরির প্রক্রিয়া। যাঁরা কখনো কবিতার বই কিনতেন না বা সাহিত্য পত্রিকা পড়তেন না, তাঁরাও এখন ফেসবুকের মাধ্যমে কবিতার সংস্পর্শে আসছেন। অনেক তরুণ পাঠকের কাছে কবিতার প্রথম পরিচয় ঘটেছে ফেসবুকের নিউজফিডের মাধ্যমেই। এই নতুন পাঠকশ্রেণি ভবিষ্যতে হয়তো ধীরে ধীরে গভীরতর সাহিত্যের দিকেও ঝুঁকতে পারে। আর আছে প্রতিষ্ঠিত কবিদেরও অংশগ্রহণ। এটি ভুল ধারণা যে শুধু নতুন বা অপেশাদার লেখকেরাই ফেসবুকে সক্রিয়। বহু প্রতিষ্ঠিত ও প্রবীণ কবিও এখন ফেসবুককে তাঁদের কবিতা প্রকাশ ও পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগের একটি অতিরিক্ত মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন—যা প্রমাণ করে, মাধ্যমটি নিজে সাহিত্যিক মানের শত্রু নয়।

গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘ফেসবুকের কবি’ আর ‘বইয়ের কবি’—এই দুটি সম্পূর্ণ পৃথক, পরস্পরবিরোধী শ্রেণি নয়; বরং একটি বর্ণালির দুই প্রান্ত। বাস্তবে অনেক কবিই উভয় জগতে যুক্ত—তাঁরা লিটল ম্যাগাজিনে জটিল, নিরীক্ষাধর্মী কবিতা লেখেন, আবার ফেসবুকে তুলনামূলক সহজ কবিতা পোস্ট করে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ রাখেন। মাধ্যম বদলালে ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি বদলায়, কিন্তু কবি-সত্তা একই থাকে। আবার এটাও সত্য যে বহু ফেসবুককেন্দ্রিক লেখক ধীরে ধীরে বইয়ের জগতেও প্রবেশ করছেন, এবং সেখানে তাঁদের কবিতা কঠোরতর সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় অনেকের লেখায় পরিণতির ছাপ পড়ছে। অন্যদিকে অনেক প্রথাগত কবিও লক্ষ করছেন যে ফেসবুকে তাঁদের কবিতার প্রচার বাড়ালে বইয়ের বিক্রিও বাড়ে—ফলে বাণিজ্যিক বাস্তবতার কারণেই দুই জগতের মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান আন্তনির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। সুতরাং এই বিতর্ককে শুধু ‘ভালো বনাম মন্দ’ বা ‘প্রকৃত বনাম নকল’ কবিতার লড়াই হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং এটি একটি রূপান্তরের কাল—যেখানে মুদ্রণকেন্দ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতি ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিখছে এবং এই প্রক্রিয়ায় কিছু ঘর্ষণ, কিছু বিভ্রান্তি ও কিছু মানের টানাপোড়েন অনিবার্য।

এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রকাশনাশিল্পের বদলে যাওয়া অর্থনীতি। আগে একজন কবির বই প্রকাশ পেত মূলত প্রকাশকের সাহিত্যিক বিচারবুদ্ধির ভিত্তিতে। এখন ফেসবুকে যাঁদের বিপুল অনুসারী আছে, প্রকাশকেরা তাঁদের বই প্রকাশে বেশি আগ্রহী হন—কারণ পাঠকের ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি থাকে, বিক্রির নিশ্চয়তা বেশি। এতে একদিকে নতুন কবিদের জন্য প্রকাশনার দরজা সহজে খুলছে, অন্যদিকে সাহিত্যিক গুণের বদলে জনপ্রিয়তাই প্রকাশনার প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠছে কি না, এই প্রশ্নও উঠছে। বইমেলাগুলোতেও এই বদল স্পষ্ট। ফেসবুক-খ্যাত কবিদের বইয়ের স্টলে দীর্ঘ লাইন, আর প্রথাগত সমালোচক-প্রশংসিত কবিদের স্টলে অপেক্ষাকৃত কম ভিড়—এই দৃশ্য এখন নতুন স্বাভাবিকতা। এটি প্রথাগত সাহিত্য-বলয়ে একধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ বাণিজ্যিক সাফল্য আর সাহিত্যিক মূল্যায়ন—এই দুটি সব সময় একই দিকে যায় না।

এই বিতর্কের পেছনে একটি স্পষ্ট প্রজন্মগত মাত্রাও আছে। প্রবীণ প্রজন্মের অনেক কবি ও সমালোচক মুদ্রিত শব্দের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে বেড়ে উঠেছেন, তাঁদের কাছে বই এখনো কবিতার একমাত্র ‘যথার্থ’ প্রকাশমাধ্যম। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে ডিজিটাল মাধ্যমই স্বাভাবিক বাস্তবতা—তাঁরা জন্ম থেকেই ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত, তাই তাঁদের কাছে ফেসবুকে কবিতা প্রকাশ করা কোনো ‘বিকল্প’ পথ নয়, বরং স্বাভাবিক পথ। এই প্রজন্মগত ব্যবধানের কারণেই বিতর্কটি প্রায়ই আবেগপ্রবণ ও দ্বিধাবিভক্ত রূপ নেয়।

তাহলে সামগ্রিকভাবে বাংলা কবিতা কোন দিকে এগোচ্ছে? এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই, তবে কয়েকটি প্রবণতা স্পষ্ট। মাধ্যমের বহুত্ব বাড়ছে, একচেটিয়া কর্তৃত্ব কমছে। আগে যেখানে কয়েকটি নির্দিষ্ট পত্রিকা বা প্রকাশনা সংস্থা কবিতার ভাগ্য নির্ধারণ করত, এখন কবিতা একযোগে বই, লিটল ম্যাগাজিন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউব—বহু মাধ্যমে বাঁচছে। এই বহুত্ব আগামী দিনেও বাড়বে বলেই মনে হয়। ‘উভচর কবি’দের সংখ্যা বাড়ছে—যাঁরা ফেসবুকেও সক্রিয়, আবার সাহিত্য পত্রিকা ও বইয়েও নিয়মিত লেখেন। ভবিষ্যতে সম্ভবত এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কঠোর বিভাজনরেখা আরও ঝাপসা হয়ে যাবে। পাঠকের রুচি ক্রমে বিভক্ত হচ্ছে—একদল পাঠক দ্রুত, আবেগঘন, সহজবোধ্য কবিতা খুঁজবেন, আরেক দল খুঁজবেন জটিল, নিরীক্ষাধর্মী, গভীর কবিতা। উভয় ধারার পাঠক ও লেখক পাশাপাশি টিকে থাকবেন—একে অপরকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করবেন না। আর দীর্ঘ মেয়াদে সাহিত্যের ইতিহাস নিজেই বাছাই করে নেবে কোন কবিতা টিকে থাকবে। ফেসবুকে জনপ্রিয় হওয়া কবিতার মধ্যে থেকেও হয়তো কিছু কবিতা কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সাহিত্যের মূলধারায় জায়গা করে নেবে, আবার অনেক প্রশংসিত ‘সিরিয়াস’ কবিতাও কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে। ইতিহাস চিরকালই এভাবে নির্মম বাছাই-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে—মাধ্যম বদলালেও এই সত্য বদলাবে না।

‘ফেসবুকের কবি বনাম বইয়ের কবি’ বিতর্ক আসলে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক রূপান্তরের প্রতিফলন—যেখানে প্রযুক্তি সাহিত্যের উৎপাদন, বিতরণ ও গ্রহণযোগ্যতার প্রচলিত নিয়মগুলোকে নতুন করে লিখছে। এই রূপান্তর একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি বহন করে। সুযোগ এই অর্থে যে আরও বেশি মানুষের কণ্ঠ এখন শোনা যাচ্ছে, কবিতা আরও ব্যাপক পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। ঝুঁকি এই অর্থে যে দ্রুততা ও জনপ্রিয়তার চাপে ভাষার গভীরতা ও কারুকাজ কখনো কখনো উপেক্ষিত হচ্ছে।

তাই আমার মনে হয় বাংলা কবিতার অভিমুখ সম্ভবত কোনো একক দিকে নয়; বরং একটি মিশ্র, বহুমুখী পথে। বই ও ফেসবুক, প্রথাগত সম্পাদকীয় নজরদারি ও তাৎক্ষণিক গণপ্রতিক্রিয়া—এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত যতটা, তার চেয়ে বেশি হবে ধীর, জটিল আপস ও সহাবস্থান। যে কবিরা এই দুই জগতের ভালো দিকগুলো আত্মস্থ করতে পারবেন—ফেসবুকের প্রাণবন্ত সংযোগ আর বইয়ের নিমগ্ন কারুকাজ, উভয়কেই সম্মান জানিয়ে—তাঁরাই সম্ভবত আগামী দিনের বাংলা কবিতাকে নেতৃত্ব দেবেন। তাই ‘কোন কবি সত্যিকারের কবি’ তা নয়, বরং ‘কীভাবে একটি বদলে যাওয়া সময়ে কবিতা তার প্রাণশক্তি ও গভীরতা—দুটোই ধরে রাখতে পারে’, সেটাই এখন ভেবে দেখার বিষয়।

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>