বিজ্ঞাপন
মাগুরার আলোচিত শিশুধর্ষণ ও হত্যায় করা মামলায় আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত যে বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন তা হলো, ঘটনার সময় আসামি তার পরনে থাকা লুঙ্গিতে বীর্যপাত ঘটিয়েছেন। সেটি ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণার পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে রায়ের এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিনি জানান, মাগুরার শিশু হত্যা ও নির্মম ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলায় আসামি হিটু শেখের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ভুক্তভোগী শিশুটি তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বোনের শ্বশুর কর্তৃক ধর্ষণ এবং শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার শিকার হন। পরবর্তীতে সাতদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে সে।
হিটু শেখ ধর্ষণের শিকার আট বছর বয়সী শিশুটির বোনের শ্বশুর। এ মামলার আসামি হিটু শেখ আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন এবং দায় স্বীকার করে নেন। বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। এরপর মামলাটি হাইকোর্টে আসে। শুনানি শেষে আজকের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলো।
গত বছরের মার্চের শুরুর দিকে বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল ওই শিশু। এরপর ৬ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাকে অচেতন অবস্থায় মাগুরার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর সাতদিন পর ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। ৮ মার্চ শিশুটির মা মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন।
আরও পড়ুন
মাগুরায় শিশু হত্যা: হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মাগুরা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলাউদ্দিন গত বছরের ১৩ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। পরে গত বছরের ১৭ এপ্রিল মামলাটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয় এবং গত বছরের ২০ এপ্রিল অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয়। গত বছরের ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্যে দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
এ মামলায় গত বছরের ১৭ মে রায় দেন মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া বাকি তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
এরপর আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য বিচারিক আদালতের রায়সহ যাবতীয় নথি গত বছরের ২১ মে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছায়, যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৫ জুন হাইকোর্টে আপিল করেন হিটু শেখ।
এর আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-সংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয় হাইকোর্টে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুনতে গত ১০ জুন হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট ওই বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। গঠিত বেঞ্চটি গত ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।
আরও পড়ুন
উমামা ফাতেমা / রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর সেটারই উদাহরণ মাগুরার শিশুটি
অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শুনতে গঠিত বেঞ্চে মাগুরার আলোচিত শিশুধর্ষণ ও হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ১১ আগস্ট। রাষ্ট্রপক্ষ পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) থেকে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে ১১ আগস্ট এ মামলার শুনানি শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ২৩ ও ২৪ আগস্ট শুনানি হয়। তিনদিন শুনানির পর গত ২৫ আগস্ট আদালত রায়ের জন্য আজ ৩১ আগস্ট দিন ধার্য করেন।
উচ্চ আদালত আজ রায়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত উল্লেখ করেছেন যে, নিম্ন আদালতে আসামিপক্ষে যিনি আইনজীবী ছিলেন, তিনি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আদালত মন্তব্য করেন, সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভালো আইনজীবী হলে হয়তো সাক্ষীদের সঠিকভাবে জেরা করে আসামিপক্ষ কিছু বেনিফিট পেতে পারতো। তবে সে কারণে এ মামলার বিচার এবং বিচারিক আদালত যে কারণ উল্লেখ করেছেন, তার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটা আদালতের একটি পার্শ্ব মন্তব্য। আদালত মামলার রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে হিটু শেখের জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়েছেন।
আসামির জবানবন্দি উল্লেখ করে তিনি বলেন, হিটু শেখ নিজেই বর্ণনা করেছে, আট বছরের ওই শিশুটিকে তিনি ধর্ষণের চেষ্টা করেছেন। শিশুটিকে ধর্ষণ করতে না পেরে পাশের রুমে গিয়ে ব্লেড এনে তার যৌনাঙ্গ কেটেছে এবং আবারও ধর্ষণের চেষ্টা করেছেন। সেখানেও সে সফল হয়নি। একপর্যায়ে যখন মেয়েটির মুখ চেপে ধরেছে এবং মেয়েটি শব্দ করার চেষ্টা করেছে, তখন প্রথমে হাত ও পরে ওড়না দিয়ে তার গলা চেপে ধরে। তখন মেয়েটি অচেতন হয়ে যায়। তখনো সে বারবার মেয়েটির শরীরের ওপর ওঠে এবং তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে।
আরও পড়ুন
নিরাপত্তাহীনতায় মাগুরার আলোচিত সেই শিশুর মা
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, আদালত যেটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন তা হলো, ঘটনার সময় আসামি হিটু শেখ তার পরনে থাকা লুঙ্গিতে বীর্যপাত ঘটিয়েছে। সেটি যে তারই বীর্যপাত ডিএনএ পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমরা ন্যায়বিচার চেয়েছি। এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। যে কারণে হিটু শেখের কোনো অনুকম্পা পাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে আসামি কিন্তু ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। সুতরাং, তা থেকে বোঝা যায় যে তিনি স্বেচ্ছায় এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেটি গ্রহণ করে আদালত সাজা দিয়েছেন।
এফএইচ/এমকেআর
বিজ্ঞাপন