জাতীয়

এক ঘরে ২২টি কলের গান, পাঁচ হাজার গানের রেকর্ড

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
2 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

কুড়িগ্রামের উলিপুরের কেবলকৃষ্ণ জুম্মাহাটের বাসিন্দা আমজাদ হোসেনের বাড়িতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে পুরোনো দিনের কয়েকটি গ্রামোফোন (কলের গান)। কোনোটির সঙ্গে বড় চোঙ, কোনোটির পাশে হাতল। কাঠের র‌্যাকে (তাক) সারি সারি সাজানো গানের রেকর্ড।

একটু পর একটি রেকর্ড গ্রামোফোনে বসিয়ে হাতল ঘুরিয়ে দেন আমজাদ হোসেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেসে আসে পুরোনো দিনের গান—‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করবও কী...।’

গান শেষ হয়। কিন্তু আমজাদ হোসেনের গল্প শেষ হয় না। কোন রেকর্ডটি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন, কোন শিল্পীর কণ্ঠে কোন গান আছে, কোন গ্রামোফোনের কোন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েছিল, কীভাবে সেটি আবার সচল করেছেন—বলতে বলতে ফিরে যান কয়েক দশক আগের দিনগুলোতে।

এসব গ্রামোফোন এখন আমজাদের কাছে শুধু গান শোনার যন্ত্র নয়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি। তাঁর সংগ্রহে এখন ২২টি গ্রামোফোন। এর মধ্যে হাতে ঘোরানো আটটি দুষ্প্রাপ্য গ্রামোফোন এবং ১৪টি ইলেকট্রিক গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ার। আছে প্রায় ৫ হাজার গানের রেকর্ড—প্রায় ৩ হাজার ইপি (ছোট আকারের ডিস্ক) ও ২ হাজার এলপি (তুলনামূলক বড় রেকর্ড)। আরও আছে হাজারখানেক অডিও ক্যাসেট। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর সংগ্রহের সব কটি গ্রামোফোন এখনো সচল।

উনিশ শতকের শেষ দিকে গ্রামোফোন তৈরি হওয়ার পর বিশ শতকের বড় একটি সময়জুড়ে এটি ছিল গান শোনার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। পরে রেডিও, ক্যাসেট, সিডি ও মুঠোফোনের মতো নতুন প্রযুক্তির কাছে জায়গা হারায় গ্রামোফোন। কিন্তু আমজাদের বাড়িতে সেই সময় এখনো বেঁচে আছে।

নিজের সংগ্রহ দেখাচ্ছেন আমজাদ হোসেন

বাবার মাইকের ব্যবসা থেকে ‘গ্রামোফোন’

এই গল্পের শুরু কয়েক দশক আগে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমজাদের বাবা দেলওয়ার হোসেন ‘জনতা মাইক সার্ভিস’ নামে মাইকের ব্যবসা শুরু করেন। তখন কিশোর আমজাদ মাইক চালাতে গিয়ে গ্রামোফোনের সঙ্গে পরিচিত হন। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে নেশায় পরিণত হয়। যেখানেই পুরোনো গানের রেকর্ডের খবর পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন। একবার আব্বাসউদ্দীন আহমদের একটি গানের রেকর্ডের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেসামরিক বিভাগে চাকরি নেওয়ার পরও আমজাদের সংগ্রহের নেশা থামেনি। অফিস শেষে ঢাকার পুরান ঢাকা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে পুরোনো গ্রামোফোন ও রেকর্ড সংগ্রহ করতেন। চাকরির বেতনের বড় একটি অংশও খরচ করতেন এসব কিনতে। এভাবেই তাঁর সংগ্রহে জমা হয় প্রায় ৫ হাজার রেকর্ড।

এ নিয়ে আমজাদের স্ত্রী মোছলেমা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘সবাই চাকরি করে টাকা সঞ্চয় করেছে। আর আমার স্বামী ক্যাসেট প্লেয়ার সংগ্রহ করেছে। তার কোনো সঞ্চয় নেই। এখন আমি অসুস্থ, অথচ চিকিৎসা করানোর টাকা নেই। গ্রামোফোনের জন্য লোকটা এত ত্যাগ করল, সেই ক্যাসেট রাখার তাকও আমাদের ঘরে নেই। অযত্নে সব নষ্ট হচ্ছে। বিক্রি করতে বললেও সেটাও করে না।’

কলের গানে রেকর্ড বাজিয়ে শোনানোও হয়

মশার কয়েলের প্যাকেটে রেকর্ড সংরক্ষণ

১৯৯১ সালে মিরপুরের কালুবাড়ি-বাউনিয়া এলাকায় ‘জনতা অডিও-ভিডিও সেন্টার’ নামের দোকান দেন আমজাদ। সেখানে গানের রেকর্ড ও ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া দেওয়া হতো। তাঁর সংগ্রহে গান ছাড়াও ইতিহাসের নানা দলিল রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা গান ও তাঁর ভাষণের তিনটি রেকর্ডও আছে। ২০২৪ সালে সেগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় পলিথিনে মুড়িয়ে মাটিতে পুঁতে রাখেন তিনি। পরে তুলে নতুন মোড়ক তৈরি করে সংরক্ষণ করেন।

২০১৭ সালের ৫ জুলাই অবসরের পর গ্রামে ফিরে বাড়ির একটি টিনের ঘরে সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন আমজাদ। সাধ্যমতো তাক বানিয়ে গ্রামোফোন ও রেকর্ড সাজিয়ে রাখেন। যন্ত্র নষ্ট হলে নিজেই মেরামত করেন। তবে জায়গা ও সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে তিনটি কক্ষে ছড়িয়ে থাকা সংগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আমজাদের সংগ্রহে উত্তরবঙ্গের পুরোনো ভাওয়াইয়া গানের পাশাপাশি আব্বাসউদ্দীন, আব্দুল আলীম, কিশোর কুমার, আশা ভোসলে, পঙ্কজ উদাস, মোহাম্মদ রফি, রুনা লায়লাসহ অনেক শিল্পীর রেকর্ড রয়েছে।

তাঁর সংগ্রহে আছে ২২টি গ্রামোফোন

গতকাল সোমবার দুপুরে আমজাদ হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামোফোনের রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য কাগজ কেটে খাপ তৈরি করছেন তিনি। এরপর একে একে তাঁর সংগ্রহশালার তিনটি কক্ষ ঘুরিয়ে দেখান। টিনশেডের ঘরে কোনো যন্ত্র বাঁশের তাকে, কোনোটি বিছানার পাশে, আবার কোনোটি মাটিতে বস্তা বিছিয়ে রাখা। এতে পুরোনো গ্রামোফোন ও রেকর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমার প্রতিদিনের কাজ হলো গ্রামোফোনগুলো পরিষ্কার করা। বাজার থেকে মশার কয়েলের খালি প্যাকেট সংগ্রহ করে মোড়ক বানিয়ে শিল্পী ও অ্যালবামের নাম লিখে রেকর্ডগুলো সংরক্ষণ করি।’

শত শত শিল্পীর গানের রেকর্ড আছে তাঁর সংগ্রহে

টিনের ঘরে কত দিন টিকবে সংগ্রহ

প্রযুক্তি বদলেছে। গান শোনার মাধ্যমও বদলেছে। এখন একটি মুঠোফোনেই কয়েক লাখ গান শোনা যায়। কিন্তু আমজাদের টিনের ঘরে পড়ে আছে এমন কিছু রেকর্ড, যেগুলো হয়তো আর কোথাও সহজে পাওয়া যাবে না।

আমজাদের দুশ্চিন্তাও এখানেই। টিনের ঘরে অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মধ্যে আর কত দিন এসব রেকর্ড ভালো থাকবে, তা জানেন না তিনি। পেশাদার সংরক্ষণব্যবস্থাও নেই। তবু সংগ্রহ থামেনি। পুরোনো কোনো রেকর্ডের সন্ধান পেলেই এখনো তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ, তাঁর কাছে প্রতিটি রেকর্ড শুধু গান নয়, একটি সময়ের সাক্ষী।

আমজাদ হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিকেরা আসেন, ভিডিও করে নিয়ে যান। কিন্তু জায়গার অভাবে এবং ভালো তাক না থাকায় এই সংগ্রহশালা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি সংরক্ষণে সরকার বা কোনো সংস্থা এগিয়ে আসে না। আমি মারা গেলে এসব কে দেখবে?’

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>