ব্রেকিং নিউজ
জাতীয়

চিঠিতেই প্রেম, ঝরেছে অশ্রু আর এনেছে মুক্তি

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
মোহাম্মদ রায়হান ‌‘এইটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও। তোমার শাড়ির মতো-অক্ষরের পাড় বোনা একখানি চিঠি’—প্রেয়সীর প্রতি মহাদেব সাহার দাবি ছিল এটুকুই। একখানি চিঠিতেই যেন যুগের আকুতি। ছোট্ট কিশোরী আনা ফ্রাঙ্ক। কিটির প্রতি তার কী প্রেম! আনার কিটির এখন কোটি কোটি পাঠক। তার টুকে রাখা ছোট্ট ছোট্ট চিঠিতেই একাকিত্ব আর বন্দিজীবনের আবেগ কিটিরা জেনেছে। ইংরেজ লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফের চিঠি তাঁকে মুক্তি দিয়েছে। আব্রাহাম লিংকনের চিঠি শিক্ষকের প্রতি ভক্তি, অনুগত্য শিক্ষা দেয়, রবিঠাকুরের মৃণালিনী সিঁথির সিঁদুরে লিখেছেন প্রেমপত্র। যুগে যুগে চিঠি এনে দিয়েছে প্রেমের বার্তা, ঝরেছে অশ্রু আর এনেছে মুক্তি। হাল আমলের কঠিন গদ্যের মাঝে আজকের দিনে প্রিয়জনকে লিখুন একটি চিঠি। চিঠির কদর সুপ্রাচীন। আধুনিক বিশ্বে নতুন প্রজন্ম চিঠির মানে না বুঝলেও শতবর্ষ আগেই বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা ভাবে উদ্ভাসিত হয়েছিল চিঠির কদর। কবিতায়, গল্পে-গানে চিঠির মাহাত্ম্য ফুটে উঠেছে অনেক। আজ বিশ্ব চিঠি দিবস। চিঠি দিবসকে তুলে রাখুন ‘চিঠিদের’ জন্য। ২০১৪ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রিচার্ড সিম্পকিন এই দিবসের প্রচলন করেন। নব্বই দশকের শেষের দিকে সিম্পকিন নিজ দেশের বড় ব্যক্তিত্বদের চিঠি পাঠিয়েছেন। সব সময় সেই চিঠির উত্তর পেতেন না। তবে যখন পেতেন; তখন তার আনন্দের সীমা থাকত না। এই আনন্দ নাকি তার কাজকর্মে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিত। সেই ভালোবাসা থেকে সিম্পকিন ২০১৪ সালে এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেন। যে পত্র শিখিয়েছে সংজ্ঞা অর্থ চেয়ে পিতার নিকট পুত্রের চিঠি; পরীক্ষার ফলাফল খারাপ করায় সান্ত্বনা দিয়ে ছোটভাইকে চিঠি কিংবা বন্ধুর পিতার মৃত্যুতে সমবেদনা জানিয়ে লেখা চিঠির ধারা এখনো মস্তিষ্কে ভাসছে। চিঠি লেখার হাতেখড়ি মেলে স্কুলের বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পাঠে। সেখানে পরীক্ষার নম্বরের বিনিময়ে হরেকরকম চিঠির বাক্স খুলতেন শিক্ষকেরা। আধুনিক কিংবা ডিজিটাল বিশ্বে কাগজে টুকে দেওয়া চিঠির হয়তো কদর কমেছে, তথাপি কিশোর বয়সেই পত্রের সঙ্গে মিতালি গড়ে তোলে বাঙালি সমাজ। যে চিঠি মুক্তি দিয়েছে ইংরেজি ভাষার নারীবাদী কবি ভার্জিনিয়া উলফ একটি সুইসাইড নোটে নিজের মুক্তির গল্প লিখে গেছেন। নোটটি ছিল প্রিয়তম স্বামীর প্রতি। তার মৃত্যুও ছিল কাব্যিক ব্যঞ্জনার। নিজের ওভারকোটের পকেটে নুড়ি পাথর বোঝাই করে হেঁটে নেমে গিয়েছিলেন খরস্রোতা পাথুরে নদীতে। আর কোনদিন ফিরে আসেননি। চিঠিতে তিনি নিজের জীবনের হতাশা, রোগমুক্তি কামনা, আর স্বামীকে নিজের দেওয়া কষ্ট থেকে মুক্ত করে নিজেও মুক্তি লাভ করেন। তিনি চিঠিতে স্বামীকে ‘প্রিয়তম’ বলে সম্বোধন করেন। চিঠি শেষ করেন, ‘আমার মনে হয় না আমাদের দুজনের চেয়ে বেশি সুখী আর কেউ হতে পারবে’ এমন কথা দিয়ে। স্বামীর প্রতি প্রেম, ভালোবাসা রেখে দিয়ে মুক্তির উদ্দেশ্যে আত্মহননের পথ বেছে নিলেন উলফ। আরও পড়ুন ‘দুখু মিয়া’ ছাড়াও আর কী কী নামে ডাকা হতো নজরুলকে? পুত্রের শিক্ষকের জন্য চিঠি আমেরিকার রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকন তাঁর পুত্রকে স্কুলে পাঠিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন; তাতে শিক্ষকের কাছে একজন পিতার প্রত্যাশা বিশ্বের সব পিতার প্রত্যাশা রূপেই ফুটে উঠেছে। তিনি চিঠিতে শিক্ষককে ‘মাননীয় মহাশয়’ বলে সম্বোধন করেন। ‘আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে প্রেরণ করলাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন—এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি’ বলেই শুরু করেন চিঠি। চিঠিতে তিনি পুত্রকে মানুষ বানানোর জন্য শিক্ষকের প্রতি বিশেষ অনুরোধ করেন। ডায়েরিতে চিঠি ডায়েরিজুড়ে চিঠি। অসংখ্য চিঠি লেখা ‘আদরের কিটি’র জন্য। আনা ফ্রাঙ্ক। জন্মদিনে একটি ডায়েরি উপহার পেয়েছিলেন। সেই ডায়েরিই এই পৃথিবীতে অমর করে রেখেছে আনা ফ্রাঙ্ককে। বিশ্বযুদ্ধের সময়ের দিনলিপি যেখানে স্থান পেয়েছে। তবে নিজের ডায়েরি নিয়ে নিজেই দ্বিধায় ভুগতেন আনা। ভেবেছিলেন, ডায়েরিটি কেউ পড়বেই না। এই যুগের প্রতিটি পাঠকই যেন আনার সেই কিটি। আনা ফ্রাঙ্ক ছিলেন হলোকাস্টের শিকার ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত ও আলোচিত ইহুদি কিশোরী। চিঠি লিখবো কার কাছে? পত্রে ভাব জমে, পত্রে মিলে পাত্র। চিঠিতে কখনো প্রাপকের সঙ্গে ভাব জমবে জম্পেশ, কখনো সঠিক মানুষটিকে খুঁজে দেবে। কখনো আত্মাকে হালকা করবে। এর বাইরেও চিঠি লিখুন কারণে-অকারণে। চিঠি লিখুন মায়ের কাছে মা পরম যত্নে গড়ে তোলেন সন্তানকে। খেয়ে-না খেয়ে, রোগে-শোকে ভুগেও সন্তানকে যত্নে-স্নেহে লালন করেন। মায়ের ত্যাগের প্রতিদান দিতে কোনো সন্তানই পারে না। কিন্তু মায়ের ত্যাগের বিনিময়ে মায়ের প্রতি ভালোবাসাই জমিয়ে রাখে সন্তানেরা। সেই ভালোবাসা সন্তানেরা খুব কমই প্রকাশ করে। কখনো প্রকাশ করার সুযোগ হয় না, কখনোবা প্রকাশ করতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ে। কখনো প্রকাশের ইচ্ছে জাগে না। তাই আজ ঝটপট সুদৃশ্য বাহারি খামে মায়ের হাতে পৌঁছে যাক ভালোবাসার চিঠি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মায়ের প্রতি লেখা চিঠির মতো বিশাল নয়, যাতে অন্তত স্পষ্ট অক্ষরে লেখা থাকুক ‘ভালোবাসি মা’। আরও পড়ুন কবি ও নাট্যকার লোরকার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি, নিষিদ্ধ হয় লেখাও করুণা করে হলেও চিঠি দিও ‘তোমার যত্নে গড়া আঙুলের ডগায় যে তুলিতে বেদনা আঁকো, সে তুলিতেই লিখো ভুল-অক্ষরের চিঠি’—সকাল-রাতে বিরক্তিকর শহুরে ঝঞ্ঝাটে এপাশ থেকে ওপাশে কত রুঢ় শব্দে প্রেম বিনিময় করি। কখনো নীরবে নিশপিশ করা ঠোঁটে ফিসফিসিয়ে প্রেমের আদান-প্রদান করি। রঙিন খামের কালো অক্ষরে পত্রপ্রেম হয়ে যাক আজ। আজকের দিনে এই নিবেদন, করুণা করে কঠিন প্রেমের বদলে কুচকে যাওয়া কাগজে হলেও পাঠাও এক টুকরো প্রেম। তোমার কপালের খসে পড়া একখানি টিপ এঁটে দিও পত্রের এক কোণে। সাদা কাগজে তোমার কুন্তলের সুবাস মেখে পাঠিয়ে দিও মায়ার খামে। নদীর নামে ডাকা প্রেমিকাদের নির্মল বয়ে চলার ফাঁকে কিছুক্ষণ নিশ্বাস পড়ুক প্রেমিকের ঠিকানায় পাঠানো কাগজের কালো অক্ষরের ভিড়ে, মায়া ঝরুক চিঠিতে। না-বলা কথা টুকে দিন কথা হলো পাখি, মন পাখির খাঁচা। দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা একেক রকম পাখি; মানুষের মন নামের খাঁচায় বন্দি থাকে হরহামেশাই। একটি নির্জন দুপুরে পাখির ডাক শুনতে শুনতে বলবো কিংবা একটি চাঁদনি রাতে আসন পেতে মেঘের জলে চাঁদনিস্নান দেখতে দেখতে মন-খাঁচার কথা নামের পাখিগুলোকে ছেড়ে দেবো বলে ভেবে রাখি। কতকাল চলে যায়, আর নির্জন দুপুর পাওয়া হয় না, জোছনা দেখতে বসা হয় না বাড়ির ছাদে। এমনই খাঁচাবন্দি কথাগুলো মুক্তি পাক চিঠি দিবসে। কথা নামের পাখিগুলো প্রাণ পাক কালো অক্ষরে অক্ষরে। লিখে ফেলুন একটি চিঠি কিংবা একটি হলুদ খামের চিরকুট। উড়ো চিঠি গানে কবিতায় উড়ো চিঠির বন্দনা আর কত? গানে গানে আকাশের ঠিকানায় চিঠি নয় আর। আপন মনের কথা অন্যকে শুনিয়ে যেমন মন হালকা হয়; তেমনই কাগজবন্দি কালো অক্ষরকে মুক্ত করে চিঠি বেনামি ঠিকানায় পোস্ট করে দিন এই চিঠি দিবসে। এতেও হালকা হবে মন। আকাশের প্রতি প্রেম, সাগর-সলিল কিংবা পাথারের তরে প্রেম উঠে যাক সাদা কাগজে কলমের ডগায়। পত্রেই হোক প্রেম এ যুগের মৃণালিনী দেবীদের মন কাড়ার চেষ্টায় রবিঠাকুরের সুরেই একখানি পত্র পৌঁছে যাক ডাকে। ‘তোমার সন্ধ্যা বেলাকার মনের ভাবে আমার কি কোনো অধিকার নেই?’ বলে রবিঠাকুর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন মৃণালিনী দেবীকে। কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন প্রেমের গান। ‘তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নববর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে। মেঘ-মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি বারিধারার প্লাবন নেমেছিল, তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নব মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার...’। এ যুগেও জীবন্ত সব মৃণালিনী দেবী আর নার্গিসরা ছুটে যাক ডাকঘরে। বুকপকেটে চেপে রাখুক হলুদ খামের চিঠি কিংবা রেগেমেগে খুলে বসুক চিঠির পাতা। এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>