বিজ্ঞাপন
বিআরটিসির ‘পিংক বাস’ সার্ভিস নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। চালক, কন্ডাক্টর থেকে যাত্রী—এর কেন্দ্রবিন্দুতে নারী। তাই বাসটির গোলাপি রং শুধু পরিচয়ের রং হয়ে না থেকে নারীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তাও বহন করতে পারে।
গোলাপি রং ও Pink Ribbon বিশ্বজুড়ে স্তন ক্যান্সার সচেতনতার প্রতীক। পিংক বাসের রং, এর নারী যাত্রী এবং স্তনস্বাস্থ্য সচেতনতার লক্ষ্যগোষ্ঠী—তিনটিই এখানে স্বাভাবিকভাবে একসূত্রে গাঁথা। আর রঙের সর্বজনীন ভাষা তৈরি করেছে একটি চমৎকার সুযোগ। তাই প্রতিদিন একজন নারী যখন এই বাসে উঠবেন কিংবা রাস্তায় গোলাপি বাসটি ছুটে যেতে দেখবেন, তখন এই রং যেন নীরবে তাঁকে মনে করিয়ে দেয়—নিজের স্তনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
এই গোলাপি রং যদি নারীরা শুধু চোখে না দেখেন, বরং সচেতনতার বার্তা হিসেবে মনেও ধারণ করেন, তাহলে পিংক বাস একটি পরিবহনসেবার গণ্ডি পেরিয়ে জনস্বাস্থ্যের এক জীবন্ত মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। বাসে স্তন ক্যান্সার ও নারীস্বাস্থ্যবিষয়ক সংক্ষিপ্ত বার্তা, শিক্ষামূলক ভিডিও এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার তথ্য যুক্ত করা গেলে, নিরাপদ যাতায়াতের পাশাপাশি তৈরি হতে পারে বৃহত্তর সামাজিক প্রভাব।
পিংক বাস শুধু নারীকে বহন করুক না; বহন করুক নিরাপত্তা, মর্যাদা, কর্মসংস্থান, স্তন ক্যান্সার ও নারীস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং নারীর প্রতি আরও সম্মানজনক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা। গোলাপি রং হয়ে উঠুক নারীর নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের চলমান প্রতীক।
নিরাপদ যাত্রা, নারীর কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসচেতনতা—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে ধারণ করে পিংক বাস হয়ে উঠতে পারে নারীর ক্ষমতায়নের এক চলমান প্রতীক।
কিন্তু বিআরটিসির ‘পিংক বাস’ সার্ভিস চালুর পর সামাজিক মাধ্যমে নানা বিতর্ক চোখে পড়ছে। কেউ একে নারীদের বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ বলছেন, কেউ নারী চালক-কন্ডাক্টরের দক্ষতা নিয়ে কটাক্ষ করছেন, আবার কেউ এর রাজনৈতিক অতীত খুঁজছেন। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, পিংক বাসের ড্রাইভার ও অ্যাটেনডেন্টদের নিয়ে যেসব অশ্লীল মন্তব্য করা হচ্ছে, তা সত্যিই নিন্দনীয় ও কুরুচিপূর্ণ।
এমন প্রতিক্রিয়াই বরং আমাদের সমাজে নারীর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ চলাচলের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। এসব প্রতিক্রিয়া একত্র করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সমস্যাটা বাসের নয়, দৃষ্টিভঙ্গির।
Gender equity-এর দৃষ্টিতে নারীর বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া বৈষম্য নয়; বরং ন্যায্য ও নিরাপদ সুযোগ নিশ্চিত করার একটি প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের হয়রানি ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অবশ্যই এমন গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদায় চলাচল করবেন। কিন্তু সেই অবস্থায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত নারীদের জন্য একটি অতিরিক্ত নিরাপদ বিকল্প তৈরি করাকে বিচ্ছিন্নতা হিসেবে না দেখে বাস্তবতার আলোকে দেখা উচিত। নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়—এটি অধিকার।
নারী চালক-কন্ডাক্টরের সক্ষমতা নিয়ে সংশয়েরও অবকাশ নেই—দক্ষতা লিঙ্গ নয়, প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার বিষয়। বরং এই উদ্যোগ নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তাঁদের নিয়ে ট্রলিং বা অবমাননাকর মন্তব্য আমাদের সামাজিক ভাষা ও মানসিকতারই প্রতিফলন। সেই ভাষাকে আরও সম্মানজনক ও মানবিক করে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার।
আর জনকল্যাণের উদ্যোগের রাজনৈতিক পরিচয় কেন? কোন সরকারের সময় একটি উদ্যোগের পরিকল্পনা হয়েছিল, সেটি অবশ্যই মুখ্য; কিন্তু আসল বিবেচ্য হলো—উদ্যোগটি জনস্বার্থে কতটা কার্যকর ও কল্যাণকর। একটি ভালো পরিকল্পনা পরবর্তী সরকার বাস্তবায়ন করলে সেটি রাজনৈতিক দুর্বলতা নয়; বরং জনস্বার্থে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে।
সমালোচনা অবশ্যই থাকবে, তবে তা হোক গঠনমূলক—কীভাবে সেবাটি আরও নিরাপদ, কার্যকর ও নারীবান্ধব করা যায়, সেই প্রশ্নকে সামনে রেখে।
একটি বাস সমাজ বদলে দেবে না। কিন্তু পরিবর্তনের একটি ধারণা তৈরি করতে পারে। পিংক অক্টোবরের চেতনা শুধু অক্টোবরেই সীমাবদ্ধ না থাকুক—পিংক বাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ুক সারা বছর।
পিংক বাস শুধু নারীকে বহন করুক না; বহন করুক নিরাপত্তা, মর্যাদা, কর্মসংস্থান, স্তন ক্যান্সার ও নারীস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং নারীর প্রতি আরও সম্মানজনক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা। গোলাপি রং হয়ে উঠুক নারীর নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের চলমান প্রতীক।
লেখক : চেয়ারম্যান, পোস্টগ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া।azadcmc@gmail.com
এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন