ব্রেকিং নিউজ
কর্মদক্ষতা অর্জনে ইসলামের ৮ নির্দেশনা মোহাম্মদপুর-তুরাগে পুলিশের বিশেষ অভিযান, গ্রেফতার ৪৪ ৩৮ লাখ টাকা নিয়ে কর নথি পরিবর্তন, কর কর্মকর্তার পদোন্নতি ৮ বছর স্থগিত সুনামগঞ্জে হ্যান্ডকাফসহ পুলিশের হাত থেকে পালালো আসামি শিক্ষার্থীদের জন্য ১৮ এসি বাস চালু করল ইউআইইউ ‘২ লাখ কর্মী নেওয়া’-সংক্রান্ত প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের বক্তব্য বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়: মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে হাজতখানায় কেক কাটার অভিযোগ এসেছে, বললেন চিফ প্রসিকিউটর ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আবার ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে এশিয়ান গেমসে যাচ্ছে বাংলাদেশ দুদককে আবারও বিরোধীদল দমনের হাতিয়ার করার অপচেষ্টা হচ্ছে
জাতীয়

নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন বাবা

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
চোখেমুখে ক্লান্তি, দুশ্চিন্তায় কুঁচকে গেছে কপালের ভাঁজ। নেপালের দুর্গম পাহাড়ি পথে দিনের পর দিন হাঁটতে হাঁটতে তালকা সদার গোড়ালি ব্যথায় জর্জরিত। পেটে ক্ষুধা, মনে ক্ষোভ। কখনো ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বাঁধছেন, আবার পরক্ষণেই ভর করছে অসহায়ত্ব। তবু থামছেন না তিনি। একটাই লক্ষ্য- নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজে বের করা। পঞ্চাশের কোঠায় থাকা তালকা সাদার বাড়ি নেপালের তেরাই অঞ্চলের সপ্তরি জেলায়। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত সমতলভূমি এই তেরাই অঞ্চল। এর দক্ষিণে ভারতীয় সীমান্ত, আর উত্তরে শিবালিক পাহাড়। এই অঞ্চলের মানুষদের সাধারণত ‘মাধেশি’ বলা হয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের দিক থেকে তারা বৈচিত্র্যময় একটি জনগোষ্ঠী। সাদার একমাত্র ছেলে ১৯ বছর বয়সী বিনোদ। তিন মেয়েও রয়েছে তার। গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপালের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার পর থেকে বিনোদ নিখোঁজ। বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি, স্কুল, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বহু স্থাপনা ও স্থাপনা-সংলগ্ন এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। বন্যার এক দিন আগে শেষবার ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল সাদার। ভোতেকোশি নদীর পানি ফুলে ভয়াবহ ওই বন্যার সৃষ্টি হয়। এর এক মাস আগে কাজের সন্ধানে রাসুয়া জেলায় গিয়েছিলেন বিনোদ। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি এই রাসুয়া। সেখানে একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সিমেন্ট মেশানোসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করতেন বিনোদ। বিনোদের সঙ্গে কাজ করা আরও চার তরুণও নিখোঁজ। তাদের সবার বয়স ১৭ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। চোখের পানি মুছতে মুছতে তালকা সাদা বলেন, আমার স্ত্রী কতটা কাঁদছে, তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আমি নিজেও গভীর কষ্টের মধ্যে আছি। কী করবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। খুঁজছেন, পাহাড় পেরোচ্ছেন, আবার খুঁজছেন সাদার পরনে মলিন শার্ট-প্যান্ট। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে গায়ে জড়িয়েছেন কমলা রঙের পলিথিনের ব্যাগ। কাঁধে ধূসর রঙের একটি ব্যাগ। তার সঙ্গে রয়েছেন ভাই। ছেলেকে খুঁজতে দীর্ঘ ও ক্রমেই হতাশাজনক হয়ে ওঠা এই যাত্রায় ভাইটিই তার সঙ্গী। পকেট থেকে একটি ময়লা রুমাল বের করে দেখান সাদা। এর মধ্যে কুঁচকে রাখা কিছু নোট। সব মিলিয়ে ২ হাজার নেপালি রুপিরও কম- বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে প্রায় ১৬০০ টাকা। ছেলেকে খুঁজতে নেপালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরতে এই টাকা ধার করেছেন তিনি। সাদা বলেন, সপ্তরি থেকে এখানে আসার জন্য আমি টাকা ধার করেছি। ধার করা প্রতি ১০০ রুপির বিপরীতে আমাকে ২০ রুপি সুদ দিতে হবে। এই টাকা থেকে কিছু খরচ করে সপ্তরি থেকে রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত বাসে যান দুই ভাই। সপ্তরি থেকে কাঠমান্ডুর দূরত্ব ২৯২ কিলোমিটার (১৮১ মাইল)। নেপালের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এই পথ যেতে প্রায় নয় ঘণ্টা সময় লাগে। কাঠমান্ডু পৌঁছে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে শুরু করেন তারা। বন্যার পর উত্তর নেপাল থেকে আহত ও বেঁচে যাওয়া মানুষদের পাশাপাশি অনেক মরদেহও কাঠমান্ডুতে নিয়ে আসা হয়েছিল। সাদা খুঁজছিলেন বিনোদকে- হয়তো জীবিতদের মধ্যে পাওয়া যাবে, অথবা মৃতদের তালিকায় থাকবে তার নাম। হাসপাতালের মর্গের বাইরে রাখা মরদেহের ছবিগুলোও অনেক সময় চেনার উপায় থাকে না। উদ্ধার করা অনেক মরদেহ পচে গেছে, কোনো কোনোটি আবার খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু কোথাও বিনোদের সন্ধান মেলেনি। কোনো হাসপাতালের তালিকায়ও পাওয়া যায়নি তার নাম বা ছবি। এরপর কাঠমান্ডু থেকে নুওয়াকোটের দিকে হাঁটা শুরু করেন সাদা ও তার ভাই। কাঠমান্ডু থেকে নুওয়াকোটের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। সেখান থেকে বিনোদ যে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করতেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেটি আরও কাছে। ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে তারা পৌঁছান ত্রিশূলি শহরে। পথে থাকা এই শহরের বাজার এখন ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও পানিতে ঢেকে আছে। সাদা বলেন, গত রাতে এখানে পৌঁছানোর পর একটি লজে থাকার জন্য আমাদের ১ হাজার ৫০০ নেপালি রুপি দিতে হয়েছে। তারা আমাদের মাত্র এক বাটি ভাত দিয়েছিল। তাতেও আমাদের ক্ষুধা মেটেনি। তিনি আরও বলেন, এখন যদি আমাদের আরেক রাত এখানে থাকতে হয়, তাহলে আমার হাতে থাকা সব টাকা শেষ হয়ে যাবে। বাড়ি ফেরার জন্য তখন আমার কাছে কিছুই থাকবে না। ‘তারা আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে’ সাদা ও তার ভাইয়ের দাবি, তারা শুধু মর্গ এবং উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য স্থাপন করা সেনা ক্যাম্পগুলোতে ঢোকার সুযোগ চান। এসব ক্যাম্পে দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে জীবিতদের সরিয়ে নেওয়া ও মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। কিন্তু তাদের অভিযোগ, বারবার সেখানে যেতে চাইলেও তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই ভাই মনে করছেন, তাদের সাহায্য না করার পেছনে নেপালের দীর্ঘদিনের জাতিগত ও বর্ণভিত্তিক বিভাজন কাজ করছে। তেরাই অঞ্চলের মানুষ মাধেশিরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, পাহাড়কেন্দ্রিক নেপালি অভিজাতরা তাদের সঙ্গে বৈষম্য করেন। সাদার পরিবার ‘মুসাহার’ সম্প্রদায়ের। নেপালের তেরাই অঞ্চল এবং ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারে বসবাসকারী এই সম্প্রদায়টি দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। কাঁদতে কাঁদতে সাদা বলেন, আমরা গরিব। তারা আমাদের মাধেশি ও বিহারি হিসেবে দেখে। আমরা নেপালি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারি না। এ কারণেই তারা আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠাচ্ছে। তিনি বলেন, মরদেহ হলেও সেটি দেখার অধিকার আমাদের আছে। আমরা সর্বত্র নিজেদের নাম নিবন্ধন করেছি- থানা থেকে শুরু করে সেনা ক্যাম্প পর্যন্ত। কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করছে না। তবে নেপাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ভয়াবহ এই দুর্যোগের ব্যাপকতায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত ১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন ও হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেও সব জীবিত মানুষকে খুঁজে বের করে সাহায্য করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। একদিকে আশা, অন্যদিকে অসহায়ত্ব ছেলের ফোন নম্বরে আবারও ফোন করেন দুই ভাই। কতবার যে ফোন করেছেন, তার হিসাব নেই। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। সাদা বলেন, আমরা তার সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। তার কণ্ঠও শুনতে পাচ্ছি না। তাই বাড়িতে সবাই ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী আমাকে ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে বলেছে। তাই আমরা সব জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে খুঁজছি। কিন্তু কোথায় গিয়ে তাকে পাবো? কখনো অবশ্য আশার আলোও দেখতে পান এই বাবা। তিনি বলেন, আমার ছেলে তরুণ। সে মালবাহক হিসেবে কাজ করে। দিনমজুর। তাই সে চটপটে। নিশ্চয়ই কোথাও হেঁটে বা দৌড়ে চলে যেতে পেরেছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই আশাকে গ্রাস করে অসহায়ত্ব। সাদা বলেন, আমার আর কোনো আশা নেই। বিনোদ যদি বেঁচে থাকতো, তাহলে নিশ্চয়ই কোথাও থেকে ফোন করতো। এমনকি, পানি খেতে গেলেও ফোন করতো। তারপরও হাল ছাড়তে রাজি নন তিনি- অন্তত এখনই নয়। তাই আবারও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটির দিকে হাঁটার প্রস্তুতি নেন সাদা ও তার ভাই। বিনোদ সেখানে কাজ করতেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছেলেকে খুঁজতে তাদের পথচলা চলতেই থাকে। সূত্র: আল-জাজিরা এসএএইচ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>