ব্রেকিং নিউজ
জাতীয়

নারী উদ্যোক্তার ওপর এ কেমন ‘ফ্লাইং কিক’ প্রতিযোগিতা!

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

করোনা মহামারিতে মানুষের কাজকর্ম যখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, চাকরি–বাকরি হারিয়ে সবাই বেকার হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ঘরে ঘরে নারীরা নতুন এক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি করেছিলেন। সাংসারিক কাজের বাইরে যে যা সামান্যটুকু পারেন, কোনো এককালে যা শিখেছিলেন, তা নিয়েই সাহস করে নেমে পড়েছিলেন উপার্জনের রাস্তায়।

অনলাইনের মাধ্যমে ‘নারী উদ্যোক্তা’ পরিচয়টি যেন তখন আরও বেশি বড় হয়ে উঠেছিল। মধ্যবিত্ত ঘরের নারীদের নিজে কিছু করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সম্মান বা মর্যাদার জায়গাটা সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

তবে নারী উদ্যোক্তারা করোনার মতো আর মুঠোফোনের পর্দায় পড়ে নেই। পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। হাটে–বাজারে পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে নেই। ফলে ব্যবসায়িক নানা বিরোধে তাঁদের জড়িয়ে পড়াটাও অস্বাভাবিক নয়। আর ব্যবসায়িক বিরোধ যে কতটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, তা ‘মার্কেট’ ঘুরলেই বোঝা যায়। তেমনই এক বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন হয়তো রাজবাড়ী কাপড়বাজারের ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানা। কিন্তু তাঁকে যেভাবে হেনস্তা হতে হলো, তা চরম অমানবিক।

ব্যস্ততম বাজারে পুলিশের পাহারায় থাকা অবস্থাতেই জাকিয়া সুলতানা পেছন থেকে একের পর এক যুবকের ‘ফ্লাইং কিক’ বা লাথি মারার দৃশ্য কেবল ট্রমাটিক নয়, এতে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ চরমভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ঘটনার একটি ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সদর থানা-পুলিশের এক নারী সদস্য ভুক্তভোগী জাকিয়া সুলতানার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন এবং পেছনে দুজন পুরুষ পুলিশ সদস্য রয়েছেন। অথচ ঠিক সেই রাষ্ট্রীয় পাহারার ভেতরে ঢুকে কীভাবে একাধিক যুবক ওই নারীর ওপর উন্মত্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং একের পর এক লাথি মারলেন, তা কোনো সুস্থ ও সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

একজন মানুষের প্রতি কিংবা বিশেষভাবে একজন নারীর প্রতি ক্ষোভের প্রকাশ কতটা অসভ্য পর্যায় পৌঁছালে এ ধরনের ন্যক্কারজনক দৃশ্য দেখা যায়?

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের নির্মমতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত সমাজে জেঁকে বসা ‘মব ভায়োলেন্সেরই’ ধারাবাহিকতা। মিশেল ফুকোর সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা থেকে বলা যায়, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের নিরাপত্তা ও শাস্তির একমাত্র কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু যখন নাগরিক সমাজ ধরে নেয় যে তাৎক্ষণিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে অপরাধ বা বিরোধের ‘মীমাংসা’ সম্ভব এবং রাষ্ট্র তা নীরব দর্শকের মতো মেনে নেবে, তখন সেখানে আইনের শাসন ভেঙে পড়ে। তৈরি হয় এক বিষাক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতি। মব ভায়োলেন্সের প্রবণতা থেকে তো বিষয়টি এখন জোরালো ও স্পষ্ট।

রাজবাড়ীর এ ঘটনায় দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন মূলত দুজন ব্যবসায়ী। জাকিয়া সুলতানা নামের ওই নারী উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে তাঁর সাবেক নারী কর্মচারীর বেতন না দেওয়া বা অসদাচরণের যে অভিযোগ ব্যবসায়ীরা তুলেছেন, তা সত্য কি মিথ্যা, সেটা প্রমাণের দায়িত্ব বাজার কল্যাণ সমিতি ও আইনি আদালতের। কিন্তু ব্যবসায়িক সেই বিরোধ যখন রাজপথে এসে ট্রমাটিক এক হামলায় রূপ নিল, সেখানে পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের আদিম রূপটি নগ্নভাবে ফুটে উঠল।

জাকিয়ার বিরুদ্ধে এ–ও অভিযোগ, তিনি বাজার কল্যাণ সমিতির ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বারবার অসদাচরণ করেছেন, তাঁদের সালিসি সিদ্ধান্ত মানেননি বা সমঝোতায় আসেননি। এমন অভিযোগের যদি সত্যতা থেকেও থাকে, এর বহিঃপ্রকাশ এমন কেন হবে?

একজন নারী যখন ব্যবসায়িক সমাজে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চান কিংবা নিজের দাবি নিয়ে প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেন, তখন সমাজের একশ্রেণির পুরুষদের কাছে তা আর কেবল‘ব্যবসায়িক সংঘাত’ থাকে না। বরং তা পরিণত হয় ‘নারীর ঔদ্ধত্য’ চূর্ণ করার হিংস্র তাড়নায়। পুলিশের উপস্থিতিতে চারদিক থেকে উড়ন্ত লাথি মারার মধ্য দিয়ে সেটিই প্রতিষ্ঠা পায়। এ যেন বার্তা দেওয়া যে পুরুষশাসিত বাজারে বা সমাজে ক্ষমতার লড়াইয়ে নামলে পরিণতি হবে এই অসভ্যতা।

একজন নারী উদ্যোক্তার ওপর এমন উড়ন্ত লাথি নারীদের উদ্যোগের মনোবলের ওপর বড় আঘাত। ঘটনাটিতে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও দুঃখজনক দিক হলো পুলিশের উপস্থিতিতেই এ তাণ্ডব ঘটেছে।

সদর থানার পুলিশ সদস্যরা ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিচ্ছিলেন, যা নিশ্চিতভাবেই প্রশংসনীয়। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত বাহিনীর বলয়ের ভেতর ঢুকেও কীভাবে দুষ্কৃতিকারীরা কোনো বাধা ছাড়াই সেই নারীকে অতর্কিত লাথি মারতে পারল? সরকারি কোনো বাহিনীর সদস্যের হাত ধরে থাকা অবস্থায় একজন নাগরিক যদি লাঞ্ছিত হন, তবে তা কেবল সেই ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়; তা সরাসরি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আইনের প্রয়োগব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।

জাকিয়া সুলতানার দাবি, তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জেলাজুড়ে প্রায় চার হাজার নারী কর্মীর কর্মসংস্থান যুক্ত। একটি ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিতে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হলে একদিকে যেমন হাজারো কর্মহীন নারীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এক চরম ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হবে। এসব ঘটনা যে মব ভায়োলেন্সকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করবে, তাতে সন্দেহ নেই।

কয়েকজন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের শাস্তি নিশ্চিত করাই হবে কাম্য। অপরাধীরা রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবে পার পেয়ে না যায়, সেটিই আমরা দেখতে চাই।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
    মতামত লেখকের নিজস্ব

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>