বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির গাজা উপত্যকা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে বিদেশে পাঠানোর একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, পরিকল্পনাটি বাস্তবসম্মত ও প্রথম বছরে গাজা থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর পরবর্তী ছয় বছরে উপত্যকার বাকি প্রায় ২০ লাখ মানুষকে সরানোর লক্ষ্য রয়েছে।
আসন্ন ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে দেওয়া বক্তব্যে বেন-গভির বলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নিতে প্রস্তুত রয়েছে এমন কয়েকটি দেশ। তবে তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি।
আন্তর্জাতিক আইনে দখল করা ভূখণ্ড থেকে বেসামরিক মানুষকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গাজা নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে উগ্রপন্থি নেতাদের মধ্যে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে।
ইহুদিদের বিরুদ্ধেও বিতর্কিত অবস্থান
গাজার ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বেন-গভির ইসরায়েলের দুই সংসদ সদস্যসহ আরও কয়েকজনকে দেশ থেকে বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, তারা ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত নন।
এমনকি, এই তালিকায় ইহুদিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি। পরবর্তী সরকারে তার দল থাকলে এ ধরনের নীতি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন বেন-গভির।
‘অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ চান বেন-গভির
বেন-গভির জানিয়েছেন, পরবর্তী সরকার গঠনের সময় তার নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থি দল জিউইশ পাওয়ার ‘অভিবাসনবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি জানাবে। তার ভাষায়, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরানোর পরিকল্পনাটি দেড় বছর ধরে কাজ করার পর তৈরি করা হয়েছে এবং এটি ‘বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট’।
২০ পৃষ্ঠার ওই পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ন্যাশনাল ওয়ার্ক প্ল্যান ফর ভলান্টারি এমিগ্রেশন ফ্রম দ্য গাজা স্ট্রিপ’ বা ‘গাজা উপত্যকা থেকে স্বেচ্ছায় অভিবাসনের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’।
পরিকল্পনায় ‘স্বেচ্ছায়’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এটিকে জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হতে পারে। কারণ, গাজার মানুষের ওপর ইসরায়েলের আরোপ করা কঠিন পরিস্থিতি এবং বেন-গভিরের প্রকাশ্য লক্ষ্য- উপত্যকার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দেওয়া- এই পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
গাজায় ইসরায়েলের হামলা নিয়ে জাতিসংঘের অভিযোগ
চলতি বছরের শুরুতে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্তে বলা হয়, গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলি সরকারের ভেতর থেকেও একের পর এক বক্তব্য আসছে।
বেন-গভিরের বক্তব্যের আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও জানিয়েছিলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদন চাইছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথ আয়োজিত এক সম্মেলনে কাটজ বলেন, ইসরায়েল ‘যে কোনো উপায়ে’ গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের অভিবাসনে সহায়তা করবে। তার এই বক্তব্যকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির নীতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে।
গাজা ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্পও
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে গাজার প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে উপত্যকা ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজা পুনর্গঠন করবে। পরে অবশ্য সেই প্রস্তাব থেকে সরে আসেন ট্রাম্প।
এদিকে বেন-গভিরের নতুন পরিকল্পনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে ও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
নির্বাচনের আগে বেন-গভিরের একের পর এক বিতর্কিত বক্তব্য
অক্টোবরে ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে বেন-গভির তার উগ্র ডানপন্থি সমর্থকদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে কঠোর ও বিতর্কিত বক্তব্য দিচ্ছেন।
এর মধ্যে তিনি এমন একটি স্থানের ভিডিও প্রকাশ করেছেন, যেখানে ইসরায়েলি সামরিক আদালতে প্রাণঘাতী হামলায় দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত ইহুদি উগ্রপন্থীদের ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আরেকটি ভিডিওতে ইসরায়েলি হেফাজতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার নিয়ে বেন-গভিরকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়।
নির্বাচনে আসন বাড়তে পারে বেন-গভিরের দলের
জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন জিউইশ পাওয়ার দলটি প্রায় সাতটি আসন পেতে পারে। বেন-গভিরের বিরুদ্ধে বর্ণবাদে উসকানি ও একটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থনের অভিযোগে সাজা রয়েছে। বিভিন্ন দেশও তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
গাজার ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণের দাবি নেতানিয়াহুর
এরই মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) গাজার একটি সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি বলেন, গাজায় ইসরায়েল যে এলাকাগুলো দখলে রেখেছে, সেখান থেকে তারা সরে যাবে না।
নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরায়েল বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ও আরও এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে। তার ভাষায়, ইসরায়েল সেখানে ‘সন্ত্রাসীদের নির্মূল’ করছে।
তবে ইসরায়েলের উপ-প্রধান সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল তামির ইয়াদাই জানিয়েছেন, ইসরায়েল এখন গাজার ৬৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। গত বছর ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিতে যে ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল, বর্তমান নিয়ন্ত্রণ তার চেয়ে অনেক বেশি।
সূত্র: বিবিসি
এসএএইচ
বিজ্ঞাপন