রাজধানীর বঙ্গবাজার মোড়ে তীব্র যানজট। মোটরসাইকেলে বসে সামনে এগোনোর পথ খুঁজছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজীর হোসাইন। চোখের সামনে সড়কের দুই পাশে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে। চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে।
রাস্তায় বাস পার্কিং কেন? দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে প্রশ্ন করেন তানজীর। জবাবে পুলিশ সদস্য বলেন, ‘আমরা পারি না, আপনি একটু বাইক থেকে নাইম্যা বাসগুলো সরায়া দ্যান।’
গত ৩১ আগস্ট দুপুরের ঘটনা এটি। কথোপকথনের সময় সেখানে এই প্রতিবেদকও উপস্থিত ছিলেন। তানজীর হোসাইন পরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সড়কে বাস পার্কিংয়ের কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে, অথচ তা নিয়ে পুলিশের এমন গা–ছাড়া বক্তব্যে হতাশ হয়েছি।’
বঙ্গবাজার মোড়ের ওই দৃশ্য বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, বঙ্গবাজার থেকে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার সড়কের দুই পাশ কার্যত বাসের পার্কিংয়ে পরিণত হয়েছে। শুধু বাস দাঁড়িয়ে থাকাই নয়, সড়কে বাস পার্কিং নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন লাইনম্যানও।
ব্যস্ত এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করেন। এমন একটি এলাকায় সড়কের বড় অংশজুড়ে দিনের পর দিন বাস দাঁড়িয়ে থাকলেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ঢাকার যানজট কমাতে গত ১৫ জুন রাজধানীর ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করে কেরানীগঞ্জে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগেও টার্মিনালটি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে সেটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে চলা এই অব্যবস্থাপনায় যানজটের চাপ বাড়ছে, ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারী, যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল যদি আসলেই সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে এই এলাকার যানজট অনেকটাই কমে আসবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের (ট্রাফিক) অতিরিক্ত কমিশনার এহসানুল কামরান তানভীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাস পার্কিংয়ের কারণে এই এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। মাঝে ডিসি স্যার এটা বন্ধ করেছিলেন। তবে আবার বাস পার্কিং শুরু হয়েছে।’
ঢাকার যানজট কমাতে গত ১৫ জুন রাজধানীর ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করে কেরানীগঞ্জে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যদিও এর আগেও টার্মিনালটি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে সেটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
২ সেপ্টেম্বর দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়কের নিচে বঙ্গবাজার মোড় থেকে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার সড়কের দুই পাশের লেনে অন্তত ৭৪টি বাস পার্কিং করা। কোন বাস কোথায় দাঁড়াবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় কয়েকজনকে। স্থানীয়ভাবে তাঁরা লাইনম্যান হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বাস পার্কিংয়ের জন্য তাঁদের সেখানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
ব্যস্ত সড়কের জায়গা এভাবে বাসের সারিতে ভরে যাওয়ায় যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দিনের ব্যস্ত সময়ে বঙ্গবাজার ও গুলিস্তান এলাকায় যানজট আরও তীব্র হয়।
গুলিস্তান মোড়ের সামনে উড়ালসড়কের নিচে তুলনামূলক সরু একটি জায়গায় মোটরসাইকেল রেখেছিলেন বেসরকারি সংস্থার কর্মী শাহাদাত হোসেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন বাস পার্কিংয়ের লাইনম্যান খাইরুল।
শাহাদাতের ভাষ্য, মোটরসাইকেল রেখে তিনি কাছের একটি টয়লেটে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পর বাস পার্কিংয়ের লাইনম্যান খাইরুল তাঁর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান। পরে আরও একজন ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগ দেন। একপর্যায়ে তাঁরা মারমুখী আচরণ করেন।
শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বাইকটি রেখে তিন মিনিটের মতো হবে টয়লেটে গিয়েছিলাম। ফিরে আসার পর তাঁরা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে এবং বাইক রাখার জন্য টাকা চায়। আমি পরিচয় দিলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। তাঁরা বলে, ‘এটা আমাদের বাস পার্কিংয়ের জায়গা।”’
ব্যস্ত একটি সড়কের জায়গা কীভাবে একটি গোষ্ঠী নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে পার্কিংয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করে, আর তা দেখার কেউই থাকে না? এভাবে প্রশ্ন তোলেন শাহাদাত।
ডিএমপির (ট্রাফিক) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এহসানুল কামরান তানভীর বলেন, ওই এলাকার বাস টার্মিনাল আগামী চার মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এটা বাস্তবায়ন হলে সমস্যার সমাধান হবে।

গুলিস্তান শুধু একটি বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক এলাকা নয়। এটি রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র। ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল দিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১৭ জেলার মানুষ যাতায়াত করেন।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তান এলাকা থেকে এই অঞ্চলের বাসের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে গুলিস্তান পাইকারি পণ্যের বড় বাজার হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের চাপও বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এলাকাটিতে যাত্রীর চাপের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়।
এই চাপের মধ্যে সড়কের দুই পাশে বাস পার্কিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
ফুলবাড়িয়ার জাকের সুপার মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী হায়দার আলী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা তাঁদের মার্কেটে কাপড় কিনতে আসেন। কিন্তু মার্কেটের সামনের সড়কে বাস পার্কিং করে রাখায় যানজট তৈরি হয়।
হায়দার আলী বলেন, ‘যানজটের কারণে ক্রেতারা ভোগান্তিতে পড়েন, আমরাও সমস্যায় থাকি। এটার একটা স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি।’
২ সেপ্টেম্বর দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়কের নিচে বঙ্গবাজার মোড় থেকে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার সড়কের দুই পাশের লেনে অন্তত ৭৪টি বাস পার্কিং করা ছিল। কোন বাস কোথায় দাঁড়াবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় কয়েকজনকে।
ঢাকার যানজট কমাতে ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের উদ্যোগ নতুন নয়। এর আগেও টার্মিনালটি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এবার ঢাকার যানজট কমাতে গত ১৫ জুন এবং পরে ২৯ আগস্ট ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তানসহ চারটি বাস টার্মিনাল দ্রুত স্থানান্তরের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন–সংক্রান্ত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে।
স্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হওয়ায় আগামী চার মাসের মধ্যে ঝিলমিল প্রকল্পের ১৫ একর জমিতে একটি অস্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্তও হয়েছে ওই সভায়। সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যমান প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন দিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি দলকে ১৫ দিনের সময়ও দেওয়া হয়েছে।
টার্মিনাল সরানো গেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে বাস ও আন্তজেলা যানবাহনের চাপ কমবে এবং যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>