বিজ্ঞাপন
সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজারে উঠছে নতুন পাট। তবে গত বছরের চেয়ে দাম একটু বেশি হলেও কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি নেই। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ফলন কম হওয়ায় কৃষকের প্রত্যাশিত লাভ মিলছে না।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে অধিকাংশ পাটগাছের উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ থেকে ৫ ফুট কম হয়েছে। ফলে প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত আঁশের উৎপাদন কমেছে। সাধারণত পাটগাছের উচ্চতা ৭ থেকে ১২ ফুট হলেও অতিবৃষ্টির কারণে এবার সেই উচ্চতা অর্জন করতে পারেনি। জেলার সদর, কাজীপুর, রায়গঞ্জ, কামারখন্দ, বেলকুচি, তাড়াশ, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের হাট-বাজারে সীমিত পরিসরে নতুন পাটের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। কৃষকেরা এখন পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পাটের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি জানতে রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় কেনা হলেও এবার মৌসুমের শুরুতেই ৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে গত বছরের তুলনায় পাটের বাজারদর বেড়েছে।
উপজেলার ঝাপড়া গ্রামের কৃষক আকবর আলী জানান, এ বছর তেল, সার, কীটনাশকের দাম ও শ্রমিক মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমান প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তবে এটা কিছুটা সন্তোষজনক হলেও মৌসুমজুড়ে এ দাম থাকবে কি না, সেটা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, পাট চাষ করে তেমন লাভ হচ্ছে না। আর এ কারণে তিনি পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
একই এলাকার কৃষক আলতাফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, তার এক বিঘা জমিতে ৬ মন পাট উৎপাদন হয়েছে। প্রতি মণ ৪ হাজার ২০০ টাকা হলে ৬ মণ পাটের মূল্য ২৫ হাজার ২০০ টাকা। অথচ তার নিজের পরিশ্রম ছাড়াই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। এতে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলে প্রায় তিন মাসে নিজ পরিশ্রমে এক বিঘা জমিতে তার লাভ দাঁড়ায় মাত্র ৭ হাজার টাকা। এবার অতিবৃষ্টির কারণে ফলন বিঘাপ্রতি প্রায় ২ থেকে ৩ মণ কমেছে বলে দাবি করছেন তিনি।
কাজীপুর উপজেলার কৃষক মকবুল সেখ বলেন, প্রতি মণ পাট উৎপাদনে প্রায় ২ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। এ বছর বিঘাপ্রতি ৬ থেকে ৭ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। দাম কিছুটা বাড়লেও উৎপাদন কম হওয়ায় লাভ তেমন হচ্ছে না।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে পাটের আঁশকে বলা হতো সোনালী আঁশ। আর এখন পাটের আঁশ হয়েছে কৃষকের দুঃখের আঁশ।
তিনি আরও বলেন, পাট চাষে আমরা লাভবান হচ্ছি না। কিন্তু তবুও পাট চাষ করি। কারণ, পাটের আঁশ ও পাট কাঠি আমাদের সংসারে কাজে লাগে। গেল বছর আমি তিন বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। আর এ বছর করেছি দুই বিঘা জমিতে। আগামী বছর জমিতে পাট চাষ করবো কিনা, সেটা নিয়ে চিন্তা করছি।
কাজীপুর উপজেলার পাট ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, আঁশের গুণগতমান অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা দরে কিনছি। খরচ বাদে প্রতি মণ পাট ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লাভে মহাজনদের কাছে বিক্রি করছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় ১৪ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ১৩৮ বেল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক একেএম মনজুরে মাওলা বলেন, পাটের বাজারদর কৃষকের জন্য ইতিবাচক। তবে অতিবৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় উৎপাদন কম হলেও অনেক স্থানে সন্তোষজনক ফলন হয়েছে। সামগ্রিকভাবে কৃষকেরা লাভবান হবেন, এই আশা রাখি।
এনএইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন