ব্রেকিং নিউজ
সারাদেশ

‘কপিরাইট’ যখন ডিজিটাল অস্ত্র, চাপে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ

b
bd24live অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
কপিরাইটের উদ্দেশ্য সৃষ্টিশীল কাজের স্বত্ব ও মেধাসম্পদ রক্ষা করা। কিন্তু যে ব্যবস্থাটি সৃষ্টিশীল মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য তৈরি, সেটিই যদি সংবাদ, সমালোচনা কিংবা জনস্বার্থের তথ্য মানুষের কাছ থেকে আড়াল করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে সাংবাদিক ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক কিছু অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নই সামনে আনছে—কপিরাইট সুরক্ষার ডিজিটাল ব্যবস্থা কি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? সম্প্রতি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে বিডি২৪লাইভ। মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশকে নিয়ে প্রকাশিত বিডি২৪লাইভের একটি সংবাদ ভিডিও Intellectual Property (IP) অভিযোগের পর ফেসবুক সরিয়ে দেয়। ফেসবুক থেকে পাওয়া নোটিশে অভিযোগকারী হিসেবে বিকাশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ‘এজেন্টের বিস্ফোরক দাবি: প্রতারণার পেছনে বিকাশের সফটওয়্যার ডেভেলপাররা দায়ী!’—শিরোনামে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে একজন এজেন্টের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছিল। বিডি২৪লাইভ কর্তৃপক্ষ বলছে, ভিডিওটি কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে নেওয়া নয়; নিজস্ব প্রতিনিধি সরাসরি সাক্ষাৎকারটি ধারণ করেছেন। মূল ভিডিওতে বিডি২৪লাইভের ব্র্যান্ডযুক্ত বুমও স্পষ্ট দেখা যায়। ভিডিওটি প্রতিষ্ঠানটির ইউটিউব চ্যানেলেও প্রকাশিত রয়েছে। ঘটনার পর অভিযোগকারী পক্ষের কাছে বিডি২৪লাইভ জানতে চেয়েছে, নিজস্বভাবে ধারণ করা ওই সংবাদ ভিডিওর ঠিক কোন অংশ তাদের মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে Meta-র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। এটাই প্রথম নয়। এর আগে ইলেকট্রনিকস ব্র্যান্ড ভিশনকে ঘিরে প্রকাশিত বিডি২৪লাইভের আরেকটি সংবাদ ভিডিওও কপিরাইট অভিযোগের পর ফেসবুক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। তবে সমস্যাটি শুধু বিডি২৪লাইভের নয়। চলতি বছরের আগস্টে পটুয়াখালীর বাউফলের সাংবাদিক জি এম মশিউর রহমান মিলন অভিযোগ করেন, তার নিজের ফেসবুক লাইভের ভিডিও অন্য একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর উল্টো তার মূল ভিডিওতেই Facebook Rights Manager-এর মাধ্যমে কপিরাইট দাবি করা হয়। তার অভিযোগ অনুযায়ী, এর ফলে মূল ভিডিওটি বিশ্বব্যাপী ব্লক হয়ে যায়। পরে বিষয়টি নিয়ে চ্যা নেল আইকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। চ্যা নেল আইয়ের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, নোটিশ পর্যালোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আরও বিস্তৃত চিত্র উঠে আসে ডিজিটাল অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম The Dissent-এর এক অনুসন্ধানে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের ফ্যাক্টচেক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন ছবি একের পর এক কপিরাইট দাবির কারণে Facebook থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের অনুসন্ধান অনুযায়ী, মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে অন্তত ২৫টি এমন দাবির তথ্য তারা পেয়েছিল। আরও গুরুতর অভিযোগ ছিল—কিছু দাবিতে পরিচিত সংবাদমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হলেও অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ইমেইল ঠিকানা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ঠিকানা ছিল না। অর্থাৎ সমস্যার আরেকটি মাত্রাও রয়েছে। শুধু প্রকৃত প্রতিষ্ঠান বা স্বত্বাধিকারীর অভিযোগ নয়, কারও পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ কপিরাইট দাবিও ডিজিটাল কনটেন্টের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। একই ধরনের ঝুঁকি শুধু কপিরাইটেই সীমাবদ্ধ নয়। জুলাইয়ে Netra News-এর এক অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্টদের Facebook অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করতে প্ল্যাটফর্মের reporting system অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে The Daily Star-এর একজন সাংবাদিকের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরা হয়। এ ধরনের অভিযোগও নতুন নয়। Freedom House-এর ২০২১ সালের Bangladesh Internet Freedom Report-এ সমালোচনামূলক ওয়েবসাইট ও YouTube চ্যানেলের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন copyright complaint ব্যবহারের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘটনাগুলো আলাদা, অভিযোগকারীও আলাদা। তাই এগুলোকে একটি সমন্বিত প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ নেই। তবে ঘটনাগুলো একটি অভিন্ন দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের copyright, intellectual property ও reporting system অপব্যবহৃত হলে সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট খুব দ্রুত মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। এখানেই প্রচলিত গণমাধ্যমের সঙ্গে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কোনো সংবাদপত্র একটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অভিযোগ প্রকাশ করলে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবাদ পাঠাতে পারে, ব্যাখ্যা দিতে পারে, সংশোধন চাইতে পারে কিংবা প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। সেখানে অভিযোগকারী ও সংবাদমাধ্যম—দুই পক্ষেরই বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকে। কিন্তু Facebook-এর মতো প্ল্যাটফর্মে একটি copyright বা IP complaint-এর পর প্রথমেই যদি সংবাদটি অদৃশ্য হয়ে যায় এবং পরে সংবাদমাধ্যমকে আপিল করে সেটি ফেরানোর চেষ্টা করতে হয়, তাহলে আপিল সফল হলেও ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সংবাদ একটি সময়নির্ভর পণ্য। আজকের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ কয়েক দিন পর পুনর্বহাল হলেও তার তাৎক্ষণিক পাঠক, শেয়ার, আলোচনা ও প্রভাবের বড় অংশ ততক্ষণে হারিয়ে যেতে পারে। আর এ কারণেই একটি কপিরাইট অভিযোগ শুধু একটি পোস্ট সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। বারবার এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের page standing, distribution এবং ভবিষ্যৎ কনটেন্টের দৃশ্যমানতার ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। Meta-র নিজস্ব ব্যবস্থায় copyright report-এর কারণে কনটেন্ট সরানো হলে ব্যবহারকারীর আপিলের সুযোগ রয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠানটি original news reporting-এর গুরুত্বও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে। Breaking news, নতুন সাক্ষাৎকার, eyewitness reporting এবং নিজস্ব অনুসন্ধানকে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতা হিসেবে বিবেচনার কথা অতীতে জানিয়েছে Meta। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—একদিকে প্ল্যাটফর্ম যদি original journalism-কে গুরুত্ব দেয়, অন্যদিকে সেই original journalism-এর বিরুদ্ধে একটি IP claim এলেই যদি কনটেন্ট আগে সরিয়ে পরে যাচাই করা হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের সুরক্ষা কোথায়? ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। The Dissent-কে দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (BLAST) আইন বিশেষজ্ঞ মনীষা বিশ্বাস কপিরাইট ব্যবস্থার অপব্যবহারকে অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন। কনটেন্ট অপসারণ ও strike ব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি কনটেন্ট সরানোর আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি। এই বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। অন্যের ভিডিও, ছবি, সংগীত বা সৃজনশীল কাজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কপিরাইট আইন মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে নিজেদের সাংবাদিকতার মালিকানা প্রমাণের প্রস্তুতিও রাখতে হবে। Raw footage, original file, metadata, ধারণের সময়, প্রতিবেদকের পরিচয় এবং প্রথম প্রকাশের তথ্য সংরক্ষণ এখন শুধু newsroom archive-এর বিষয় নয়; একটি IP dispute-এ এগুলো হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। কিন্তু পুরো দায় সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্ল্যাটফর্মগুলোর reporting architecture এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত স্বত্বাধিকারী দ্রুত নিজের অধিকার রক্ষা করতে পারেন, আবার একটি অভিযোগের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন বৈধ সংবাদ, সমালোচনা কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য সহজেই মানুষের চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিতে না পারে। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের নিজস্বভাবে ধারণ করা সাক্ষাৎকার বা মাঠপর্যায়ের ফুটেজের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিষ্ঠান কপিরাইট বা IP দাবি করলে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার পাশাপাশি মানবিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে। অভিযোগকারী ঠিক কোন original work-এর মালিক এবং অভিযুক্ত সংবাদে তার কোন অংশটি বেআইনিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে ছাপাখানা বন্ধ করা কিংবা ওয়েবসাইটে তালা দেওয়াই একমাত্র পথ নয়। সংবাদমাধ্যমের Facebook Page থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন সরিয়ে দেওয়া, বারবার strike তৈরি করা, অ্যাকাউন্ট ঝুঁকিতে ফেলা কিংবা distribution সংকুচিত হয়ে যাওয়াও শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছানোর পথকে সংকুচিত করতে পারে। বিকাশ ও ভিশনকে ঘিরে বিডি২৪লাইভের অভিজ্ঞতা এবং অন্য সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের সামনে আসা ঘটনাগুলো তাই একটি বড় প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—মেধাস্বত্ব রক্ষার জন্য তৈরি প্রযুক্তিই কি অপব্যবহারের মাধ্যমে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল অস্ত্র’ হয়ে উঠতে পারে? প্রকৃত কপিরাইট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন—এ নিয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, কপিরাইট অভিযোগ যেন কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অস্বস্তিকর সংবাদ, গ্রাহকের অভিযোগ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা জনস্বার্থের বক্তব্য সরিয়ে দেওয়ার শর্টকাটে পরিণত না হয়। কপিরাইট সৃষ্টিশীলতার ঢাল হিসেবেই থাকুক—সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের ‘ডিজিটাল অস্ত্র’ হয়ে নয়।
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>