বিজ্ঞাপন
বয়স মাত্র ১৪ বছর, প্রেমিক ১৮ বছর বয়সী। বাড়িতে প্রেমের কথা জানাজানি হয়ে গেলে দুজনে পালিয়ে যান। টিনএজ বয়সে যা হয়! নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে কিশোরী রেজিনা কে. ওয়াল্টার্স তার প্রেমিক রিকি লি জোনসের সঙ্গে পালিয়ে যান। দুজনের সেই যাত্রার শেষ কোথায় হবে, তা তারা কেউই জানতেন না।
দিনটা ১৯৯০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি টেক্সাসের পাসাডেনা থেকে দুজন অজানা এক নতুন পথের দিকে ছুটতে শুরু করেন। তাদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয় একজন ট্রাক ড্রাইভারের। দুটো ছেলে-মেয়েকে রাস্তায় লিফট চাইতে দেখেন। খুব বিনয়ের সঙ্গে তিনি তাদের তুলে নেন ট্রাকে। শোনেন তাদের বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার গল্প।
কিন্তু তখনো রেজিনা-রিকি কেউই টের পাননি তাদের দুজনের সেই যাত্রার শেষ কোথায় হবে, তাদের সঙ্গে কি হতে চলেছে সামনে। রেজিনা-রিকি অজান্তেই আমেরিকার অন্যতম ভয়ংকর ট্রাকচালক সিরিয়াল কিলারের ফাঁদে পা দিয়েছেন।
আমেরিকার অন্যতম ভয়ংকর ট্রাকচালক সিরিয়াল কিলার হিসেবে পরিচিত রবার্ট বেন রোডস। আদালতের নথিতে রেজিনাকে ওই দিন শেষবার জীবিত দেখা যাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এতক্ষণে বুঝেই গেছেন রেজিনা-রিকির ভাগ্যে কি ঘটেছিল। কিন্তু আসুন আরেকটু পেছনের সময়ের গল্প জেনে নেওয়া যাক-
রোডস তখন দূরপাল্লার ট্রাকচালক। মহাসড়কের এক শহর থেকে অন্য শহরে পণ্য নিয়ে ছুটে বেড়ানোই ছিল তার কাজ। বাইরে থেকে সাধারণ একজন ট্রাকচালক মনে হলেও তার ট্রাকের ভেতরেই ছিল অন্ধকার এক গোপন জগৎ। তদন্তকারীরা পরে জানতে পারেন, ট্রাকের ঘুমানোর অংশে সে এমন সরঞ্জাম রেখেছিল, যা মানুষকে আটকে রাখা ও নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা যেত। এই মোবাইল বন্দিশালাই তাকে ভুক্তভোগীদের এক অঙ্গরাজ্য থেকে অন্য অঙ্গরাজ্যে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিত।
রেজিনা ও রিকির নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের পরিবার জানত না, তারা কোথায় গেছে। রেজিনার ক্ষেত্রে তদন্তকারীদের হাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র আসে পরে রোডসের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া কিছু ছবি থেকে। আদালতের নথি অনুযায়ী, তদন্তকারীরা রোডসের বাড়িতে নারীদের পোশাক, বাঁধার কাজে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং বেশ কিছু ছবি পান। সেই ছবিগুলোর মধ্যে রেজিনাকেও শনাক্ত করা হয়। আরও কিছু ছবিতে তাকে রোডসের ট্রাক এবং পরে যে শস্যাগারে তার মরদেহ পাওয়া যায়, তার সামনে দেখা যায়।
রেজিনাকে শেষ পর্যন্ত ইলিনয়ের বন্ড কাউন্টির একটি শস্যাগারে পাওয়া যায়। ১৯৯০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর একজন কৃষক তার মরদেহ আবিষ্কার করেন। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, মরদেহটি তখন মারাত্মকভাবে পচে গিয়েছিল এবং তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল বলে মনে করেন তদন্তকারীরা।
এই মামলার সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রমাণগুলোর একটি ছিল রোডসের তোলা ছবিগুলো। ছবিগুলো দেখে তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, রেজিনাকে একেবারে অল্প সময়ের জন্য আটকে রাখা হয়নি। তার চেহারা ও চুলের পরিবর্তন থেকেও বন্দিত্বের সময়কাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সেই ছবিটি ছিল রেজিনাকে হত্যা করার আগ মুহূর্তের তোলা। যেটা হত্যাকারী নিজেই তুলেছিলেন। ছবিতে দেখা যায় রেজিনার মুখে কড়া মেকাপের আস্তরণ, লাল লিপস্টিক, ছোট চুল। কালো বডিকোন পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে হাই হিল পরা। কিন্তু রেজিনার চোখে ভয়-আতঙ্ক স্পষ্ট। ধারণা করা হয় হত্যার আগে রেজিনাকে এভাবে সাজতে রোডস নিজেই বাধ্য করেছিল। তারপর তার কিছু ছবি তোলেন তারপর হত্যা করেন রেজিনাকে। এখানে স্পষ্ট যে রোডস কতটা বিকৃত মস্তিষ্কের একজন মানুষ ছিলেন।
রেজিনার সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া রিকি লি জোনসের ভাগ্যও ভয়াবহ ছিল। বহু বছর ধরে তার পরিণতি নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। পরবর্তী তদন্তে তার হত্যার সঙ্গেও রোডসের যোগসূত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন রেকর্ড অনুযায়ী, রিকির মরদেহ ১৯৯১ সালে মিসিসিপির লামার কাউন্টিতে পাওয়া যায়। তবে রিকির ভাগ্য এতোটাও সুপ্রসন্ন ছিল না। সেই মরদেহটি যে রিকির ছিল তা নিশ্চিত হয় ২০০৮ সালে। মৃত্যুর ১৮ বছর পর রিকির ভয়ংকর মৃত্যুর কথা জানতে পারে বিশ্ব।
সিরিয়াল কিলার রোডস নিজেই পরবর্তী সময়ে রিকির হত্যার কথাও স্বীকার করেন বলে তদন্তসংক্রান্ত রেকর্ডে উল্লেখ রয়েছে। তবে রেজিনার মামলার মতো রিকির হত্যার বিষয়ে আদালতের প্রাথমিক নথিতে সব তথ্য একসঙ্গে পাওয়া যায় না।
রোডসের ধরা পড়ার ঘটনাটিও ছিল প্রায় আকস্মিক। ১৯৯০ সালের ১ এপ্রিল ভোরে অ্যারিজোনার ক্যাসা গ্র্যান্ডের কাছে ইন্টারস্টেট-১০ মহাসড়কের পাশে তার ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন অ্যারিজোনা হাইওয়ে প্যাট্রোলের কর্মকর্তা মাইক মিলার।
ট্রাকটির হ্যাজার্ড লাইট জ্বলছিল। তাই সেটি পরীক্ষা করতে এগিয়ে যান তিনি। কাছে গিয়ে ট্রাকের ঘুমানোর অংশে এক নারীকে দেখতে পান। তিনি হাতকড়া ও শিকলে আটক ছিলেন এবং সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। রোডস তখন ঘটনাটি অন্যভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেও পুলিশ তাকে আটক করে।
এই গ্রেপ্তারই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রোডসের বিরুদ্ধে অপহরণ, যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। পরে তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া ছবি ও অন্যান্য প্রমাণ তদন্তকারীদের রেজিনা ওয়াল্টার্সের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার দিকে নিয়ে যায়। এমনকি রেজিনার একটি নোটবুকও তার ট্রাকে পাওয়া গিয়েছিল বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ আছে।
রেজিনা ও রিকির ঘটনা একমাত্র ঘটনা ছিল না। রোডসের সঙ্গে প্যাট্রিসিয়া ক্যান্ডেস ওয়ালশ এবং তার স্বামী ডগলাস জিসকোভস্কির হত্যারও যোগসূত্র পাওয়া যায়। ২০১২ সালে রোডস টেক্সাসে ওই দুজনের হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং মৃত্যুদণ্ড এড়ানোর বিনিময়ে অতিরিক্ত দুটি যাবজ্জীবন সাজা পান।
রোডসের দীর্ঘ ট্রাক-রুট, নিখোঁজ নারীদের ঘটনা এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ধারণা করেন, তার প্রকৃত শিকারের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। কিন্তু সন্দেহ এবং প্রমাণ এক বিষয় নয়। তাই বহু সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার নাম জড়ালেও সেগুলোর সবকটিকে আদালতে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে রোডস আমেরিকায় পরিচিতি পান ভয়ংকর ‘ট্রাক স্টপ কিলার’ নামে।
কিন্তু প্রশ্ন হতে পারে রোডস কীভাবে একজন সিরিয়াল কিলার হয়ে উঠলেন, আর কেন? রোডসের অপরাধের ক্ষেত্রে তার পেশাটিই তাকে একটি ভয়ংকর সুবিধা দিয়েছিল বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। একজন দূরপাল্লার ট্রাকচালক হিসেবে সে নিয়মিত অঙ্গরাজ্য বদল করত। ফলে কোনো ভুক্তভোগী এক জায়গা থেকে নিখোঁজ হলে অন্য জায়গায় তার সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে যেত। তদন্তকারীদের জন্যও বিভিন্ন এলাকার পুলিশের মধ্যে তথ্য মিলিয়ে দেখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
এই কারণেই রোডসকে ‘ট্রাক স্টপ কিলার’ নামে ডাকা হয়। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি দূরপাল্লার ট্রাকচালকদের পেশার সঙ্গে অপরাধকে এক করে দেখা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যক ট্রাকচালক সম্পূর্ণ আইন মেনে কাজ করেন। রোডসের ঘটনা ছিল একজন নির্দিষ্ট অপরাধীর ভয়ংকর কর্মকাণ্ডের উদাহরণ।
শেষ পর্যন্ত রেজিনা ওয়াল্টার্স হত্যার মামলায় রোডস ১৯৯২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম-ডিগ্রি হত্যার দায় স্বীকার করেন। প্রসিকিউশন তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল, কিন্তু সমঝোতার মাধ্যমে তিনি দোষ স্বীকার করেন এবং তাকে স্বাভাবিক জীবনের জন্য কারাদণ্ড। অর্থাৎ প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। ইলিনয়ের আপিল আদালতের নথিতেও এই তথ্য স্পষ্টভাবে রয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও হত্যার দায় স্বীকার করায় তার সাজা আরও বাড়ে। তিনি জীবনের বাকি সময় কারাগারেই কাটাবেন।
সূত্র: মিডিয়াম, অল দ্য ইন্টেরেস্টিং, সিবিসি
কেএসকে
বিজ্ঞাপন