বিজ্ঞাপন
সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের পদে নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন বিধিমালার খসড়ায় গ্রেডভেদে মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অসদুপায় ঠেকাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের সুযোগ বাড়তে পারে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের পরীক্ষার মানবণ্টনসংক্রান্ত বিশেষ বিধিমালা, ২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমান বিধান অনুযায়ী, কারিগরি পদ ছাড়া প্রশাসনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় ৭০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৩০ শতাংশ নম্বর রয়েছে। প্রশাসনে এ স্তরে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৩ লাখ ২৪ হাজার ৩৪৩টি।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় ১১-২০তম গ্রেডের পদগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—১১-১২তম, ১৩-১৬তম এবং ১৭-২০তম গ্রেড।
১১-১২তম গ্রেডে মোট ১৫০ নম্বরের পরীক্ষায় লিখিত থাকবে ১০০ এবং মৌখিক ৫০ নম্বর। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ২৫ নম্বর করে থাকবে।
১৩-১৬তম গ্রেডে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ এবং মৌখিকে ৪০ নম্বর রাখা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ১৫ নম্বর করে থাকবে।
১৭-২০তম গ্রেডে মোট ৫০ নম্বরের পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক—দুই পরীক্ষায়ই ২৫ নম্বর করে রাখা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলায় ১০, ইংরেজিতে ৫, গণিতে ৫ এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বা সাধারণ জ্ঞানে ৫ নম্বর থাকবে।
কারিগরি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত প্রস্তাব করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীকে ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও পাস করতে হবে। এরপর লিখিত ও ব্যবহারিক—দুই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। মৌখিকে উত্তীর্ণ না হলে নিয়োগের জন্য বিবেচিত হবেন না।
তবে প্রস্তাবিত বিধিমালা শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, আনসার ব্যাটালিয়ন, কোস্ট গার্ড, র্যাবসহ অন্যান্য বাহিনী এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আওতাভুক্ত পদে প্রযোজ্য হবে না।
নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কারণ হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় কিছু পরীক্ষার্থী প্রক্সি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মতো অসদুপায় অবলম্বন করে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর নিয়োগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
তবে এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হলে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সরকারি চাকরির নিয়োগে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়বে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে অনেক সময় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হয়। তাঁর মতে, মৌখিকের নম্বর বেশি হলে দুর্নীতির সুযোগও বাড়বে এবং এতে অদক্ষ প্রার্থীরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন।
এদিকে, বিসিএসের ক্ষেত্রেও এর আগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা’দত হুসাইনের সময়ে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়। পরে তা আবার ২০০ নম্বরে উন্নীত করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়, যা বর্তমানে কার্যকর রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগেও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০ থেকে কমিয়ে ১০ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন