বিজ্ঞাপন
অভিলাষ মাহমুদ
বাংলা সাহিত্যের বিশাল আকাশে যে কজন তারা নিজেদের আপন আলোয় স্থায়ীভাবে জাগিয়ে রেখেছেন, তাদের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অন্যতম। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে কয়েকজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের পুরোভাগে। একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক হিসেবে তার পদচারণা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও সদর্প। সময়ের সীমান্ত পেরিয়ে তিনি যেভাবে পাঠকের মনে স্থান করে নিয়েছেন, তা সত্যিই বিরল। তাঁর সৃষ্টিশীলতা আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে এনে দিয়েছিল এক নতুন গতি ও দ্যোতনা।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। তাঁর পৈতৃক নিবাস বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার পূর্ব মাইজপাড়া গ্রামে। তবে তাঁর জন্ম হয়েছিল মামার বাড়ি আমগ্রামে। শৈশবের এক বিশাল অংশ তিনি জন্মভ‚মির মাটির গন্ধ মেখে কাটিয়েছিলেন। পরবর্তীতে পারিবারিক কারণে তাঁকে কলকাতায় চলে যেতে হয়। স্থান পরিবর্তন হলেও তাঁর অন্তরে বাংলাদেশ এবং জন্মভূমির স্মৃতি সর্বদা সজীব ছিল। কলকাতার জীবন, সেখানকার রাজপথ, কফি হাউসের আড্ডা এবং দেশভাগের বেদনা তাঁর পরবর্তী সাহিত্যকর্মে নানাভাবে উঠে এসেছে। এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া তাঁকে আজীবন তাড়িত করেছে, যার প্রভাব তাঁর প্রতিটি রচনায় স্পষ্ট।
আরও পড়ুন
মামুন রশীদের কবিতায় শিল্পের কারুকার্য অন্বেষণ
পড়াশোনা ও জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়েই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যযাত্রার সূচনা। তরুণ বয়সেই তিনি বন্ধুদের সঙ্গে মিলে প্রকাশ করেন ঐতিহ্যবাহী কাব্যপত্রিকা কৃত্তিবাস। এই কৃত্তিবাস পত্রিকা তৎকালীন বাংলা কবিতার ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ উত্তর যুগে বাংলা কবিতাকে আধুনিক রূপ দেওয়া, প্রচলিত গণ্ডি ভেঙে নতুন শব্দ চয়ন এবং আবেগের উন্মুক্ত প্রকাশে কৃত্তিবাস গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কেবল কবিতা লেখেননি, কবিতাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক ধরণের বিদ্রোহ ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে আমি কি রকম ভাবে বেঁচে আছি, হঠাৎ নীরার জন্য ইত্যাদি আজও আবালবৃদ্ধবনিতার হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। তাঁর কাল্পনিক চরিত্র নীরা যেন আধুনিক কবিতার এক শাশ্বত প্রেমিকা রূপ লাভ করেছে।
তবে কেবল কবিতাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি সুনীল। কথা সাহিত্যেও তিনি সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর রচিত উপন্যাসগুলো বাংলা কথাসাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। সেই সময়, প্রথম আলো, পূর্ব-পশ্চিমের মতো কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাসগুলোতে তিনি ইতিহাসের পটভূমিকে দারুণভাবে জীবন্ত করে তুলেছেন। উনিশ ও বিশ শতকের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, তৎকালীন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জীবন এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প তিনি এত চমৎকারভাবে বুনেছেন যা পাঠককে সোজা সেই অতীতে নিয়ে যায়। বিশেষ করে পূর্ব-পশ্চিম উপন্যাসে দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং দুই বাংলার মানুষের মানসিক টানাপোড়েন যেভাবে উঠে এসেছে, তা ইতিহাস ও সাহিত্যের এক অনন্য দলিল।
কিশোর ও তরুণ পাঠকদের কাছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন তাঁর সৃষ্ট অ্যাডভেঞ্চারধর্মী চরিত্র কাকাবাবুর জন্য। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্তে¡ও কাকাবাবু অর্থাৎ রাজা রায়চৌধুরী এবং তাঁর ভাগ্নে সন্তুর নানা রোমাঞ্চকর অভিযান তরুণদের মনে অদম্য সাহস ও কৌতূহল জাগিয়ে তুলতো। মিসরীয় মূর্তি, সবুজ দ্বীপের রাজা কিংবা সন্তু ও কাকাবাবুর পাহাড়ি অ্যাডভেঞ্চারগুলো বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সৃষ্টি করেছিলেন নীললোহিত নামের এক ছদ্মনাম ও মুক্তমনা চরিত্র। নীললোহিত ছিল এক ভবঘুরে, প্রেমিক এবং খাঁটি সাধারণ মানুষ, যে জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে ভালোবেসে ঘুরে বেড়াত। নীললোহিতের বয়ানে লেখা গল্পগুলো পাঠকদের এক অন্যরকম মানসিক শান্তি ও ভাবনার খোরাক জোগাত।
আরও পড়ুন
মিথ্যে দিগন্তের সবুজ মাঠ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দীর্ঘ সময় ধরে আনন্দবাজার পত্রিকা এবং দেশ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাহিত্য একাডেমি সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি তরুণ লেখকদের অনুপ্রেরণা দেওয়া এবং প্রবীণ ও নবীনদের মধ্যে একটি সংযোগ সেতু তৈরিতে সারাজীবন কাজ করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সাহিত্য মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে এবং সমাজকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর এই মহান সাহিত্যিক আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু শারীরিক মৃত্যু কখনো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কালজয়ী স্রষ্টাকে মুছে ফেলতে পারে না। তাঁর স্মৃতি আজও জড়িয়ে আছে তাঁর কবিতার ছন্দে, উপন্যাসের পাতায় এবং পাঠকের আবেগঘন অন্তরে। যখনই কোনো তরুণ প্রেমে পড়ে বা বিরহে কাতর হয়, যখনই কোনো পাঠক ইতিহাসের গলিপথে হাঁটে কিংবা কোনো কিশোর অ্যাডভেঞ্চারের স্বপ্ন দেখে, তখনই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পুনর্জন্ম নেন। তিনি বেঁচে আছেন এবং থাকবেন বাংলা ভাষার প্রতিটি অক্ষরে, কোটি মানুষের হৃদয়ে এবং আমাদের নস্টালজিয়ার অংশ হয়ে।
লেখক: কবি , গণমাধ্যম কর্মী ও গাল্পিক
কেএসকে
বিজ্ঞাপন