বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে সম্প্রতি একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একজন কলেজছাত্র ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে অশালীন ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করার পর তাকে একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ভিডিওর জন্য আলাদা কোনো মামলা করা হয়নি, বরং তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটিকে সরলভাবে ‘গালিগালাজ করার কারণে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার’ বলা পুরোপুরি সঠিক হবে না। কিন্তু এখানেই একটি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, একটি নাগরিকের অশালীন বা অবমাননাকর বক্তব্য এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে রাষ্ট্রীয় আইনের সীমারেখা কোথায়?
প্রশ্নটি শুধু একজন ছাত্রের নয়। প্রশ্নটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চরিত্র নিয়ে। প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্রের কাছে কোন বক্তব্য সমালোচনা, কোনটি অপমান, কোনটি মানহানি, কোনটি হয়রানি, কোনটি হুমকি, কোনটি ঘৃণামূলক বক্তব্য, কোনটি সহিংসতায় উসকানি এবং কোন পর্যায়ে সেটিকে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করা যায়? আরও বড় প্রশ্ন, আইন কি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে, নাকি ক্ষমতার ব্যক্তি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে আইনের একটি আলাদা সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়?
এই প্রশ্নগুলোকে আবেগ দিয়ে নয়, আইন, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে দেখা প্রয়োজন।
প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। গালিগালাজ, মানহানি, হুমকি, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সহিংসতায় উসকানি এবং সন্ত্রাসবাদ এক জিনিস নয়।
কেউ কাউকে গালি দিলে সেটি অশালীন, অসম্মানজনক এবং সামাজিকভাবে নিন্দনীয় হতে পারে। কোনো বক্তব্য মিথ্যা হলে তা মানহানির প্রশ্ন তুলতে পারে। কাউকে নির্দিষ্টভাবে ক্ষতি করার হুমকি দিলে সেটি অপরাধ হতে পারে। কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দিলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। কিন্তু এসবের কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্ত্রাসবাদ হয়ে যায় না।
সন্ত্রাসবাদ সাধারণত এমন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে গুরুতর সহিংসতা, জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি, রাষ্ট্র বা জনগণকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বাধ্য করা, কিংবা রাজনৈতিক বা আদর্শিক উদ্দেশ্যে সহিংস কর্মকাণ্ডের উপাদান থাকে। তাই শুধু ভাষার অশালীনতা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি শক্তিশালী আইনি সেতু থাকা প্রয়োজন। সেই সেতুটি না থাকলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে মতপ্রকাশ দমনের হাতিয়ার বানানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। অবশ্যই এই স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি এবং অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট কারণে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “যুক্তিসঙ্গত”। রাষ্ট্র কোনো বক্তব্য অপছন্দ করলেই সেটিকে অপরাধ বানাতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে দেখাতে হয়, নিষেধাজ্ঞাটি কেন প্রয়োজন, কেন সেটি আনুপাতিক এবং কেন অপেক্ষাকৃত কম কঠোর কোনো ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশ ২০০০ সালে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি, ICCPR-এ যোগ দিয়েছে। এই চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির General Comment No. 34 আরও স্পষ্ট করে বলেছে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং জনসাধারণের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিরোধিতার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি সহনশীল হতে হবে। শুধু কোনো জনব্যক্তিকে অপমান করা হয়েছে বলেই শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। মানহানির আইনও এমনভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়, যাতে মানুষের বৈধ সমালোচনা করার অধিকার ভয় পেয়ে যায়।
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক নীতি আছে। যে ব্যক্তি যত বেশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী, তাকে তত বেশি জনসমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা রাখতে হবে।
কারণ একজন প্রধানমন্ত্রী শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি কেন্দ্র। তার সিদ্ধান্ত মানুষের জীবন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চাকরি, কর এবং ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে। তাই তাকে নিয়ে সাধারণ নাগরিকের সমালোচনার পরিসর একজন ব্যক্তিগত নাগরিকের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বড় হওয়া উচিত।
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে প্রধানমন্ত্রীকে গালি দেওয়া ভালো বা গ্রহণযোগ্য। বরং উল্টোটা সত্য। গালিগালাজের সংস্কৃতি সমাজকে নষ্ট করে। কিন্তু সামাজিকভাবে নিন্দনীয় আচরণ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুতর অপরাধ এক বিষয় নয়।
এই পার্থক্যটিই একটি সভ্য গণতন্ত্রের পরীক্ষার জায়গা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে Supreme Court-এর Hustler Magazine v. Falwell মামলায় আদালত এমনকি আপত্তিকর ও কষ্টদায়ক রাজনৈতিক ব্যঙ্গের ক্ষেত্রেও জনপরিসরের বিতর্কে বিস্তৃত সাংবিধানিক সুরক্ষার কথা বলেছে। আদালতের যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, শুধু বক্তব্যটি ‘আপত্তিকর’ বা ‘অশালীন’ মনে হয়েছে বলেই রাজনৈতিক বিতর্কের ওপর ফৌজদারি বা দেওয়ানি দায় চাপানো যায় না। জনপরিসরের বিতর্কে স্বাধীনতার জন্য একটি “breathing space” প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
অবৈধ বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়া ছাড়তে হাইকমিশনের নির্দেশ
ইউরোপের মানবাধিকার আদালতও বিভিন্ন মামলায় একই ধরনের নীতি অনুসরণ করেছে। ফ্রান্সে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে অপমানের অভিযোগে দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে European Court of Human Rights মতপ্রকাশের স্বাধীনতার লঙ্ঘন দেখেছে। স্পেনের ক্ষেত্রে তৎকালীন রাজাকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করার কারণে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে দণ্ড দেওয়ার ঘটনাতেও আদালত Article 10 লঙ্ঘন হয়েছে বলে রায় দিয়েছে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেছে।
অর্থাৎ ইউরোপের মানবাধিকার কাঠামোও বলছে, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত অহংকার এক জিনিস নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপের সব দেশে অপমানজনক বক্তব্যের কোনো আইন নেই। জার্মানির মতো দেশে “insult” অপরাধ হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে বিশেষ বিধানও রয়েছে। ফ্রান্সেও সরকারি দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে “outrage” করার বিরুদ্ধে আইন আছে। ভারতের আইনে মানহানির বিধান রয়েছে, যদিও সেখানে সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সত্য বক্তব্য ও সৎ উদ্দেশ্যে মতামতের জন্য ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইন থাকা এবং আইনকে যেভাবে প্রয়োগ করা হয়, এই দুটো এক জিনিস নয়। আইন একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। কিন্তু সেই একই আইন যদি ক্ষমতাবানকে সমালোচনা থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি মর্যাদা রক্ষার আইন থেকে ক্ষমতা রক্ষার আইনে পরিণত হতে পারে।
তুরস্কের অভিজ্ঞতা এই ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ। সেখানে রাষ্ট্রপতিকে অপমানের অভিযোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। Council of Europe-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের শেষ নাগাদ Article 299-এর অধীনে এক লাখ ষাট হাজারেরও বেশি মানুষ তদন্তের আওতায় এসেছিল এবং ৩৮ হাজারের বেশি মানুষের বিচার হয়েছিল।
থাইল্যান্ডেও রাজপরিবারকে অপমানের অভিযোগে কঠোর ফৌজদারি আইনের প্রয়োগ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্বে একটি বিপরীত প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের আগস্টে ইন্দোনেশিয়ার সাংবিধানিক আদালত সরকার, প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীদের অপমানকে অপরাধ হিসেবে দেখার কিছু বিধান বাতিল করে। আদালতের যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে মানুষের মতো ‘অপমানিত’ হওয়ার অনুভূতির অধিকারী হিসেবে দেখা যায় না এবং এ ধরনের বিধান মতপ্রকাশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। কারণ রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান, আর প্রধানমন্ত্রী একজন মানুষ। রাষ্ট্রকে সমালোচনা করা মানে রাষ্ট্র ধ্বংস করা নয়। সরকারকে সমালোচনা করা মানে দেশবিরোধিতা নয়। প্রধানমন্ত্রীকে সমালোচনা করা মানে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়। আর কাউকে গালি দেওয়া, যতই নিন্দনীয় হোক, নিজে থেকেই সন্ত্রাসবাদ নয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু একটি ভিডিও বা একজন ছাত্রের মামলা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর পেছনে আরও বড় একটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে ডিজিটাল বক্তব্যকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার ও মামলা নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। ২০২৫ সালে Cyber Security Ordinance কার্যকর হয়ে আগের Cyber Security Act বাতিল হলেও, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল সংসদে Cyber Security Act 2026 পাস হয়েছে এবং সেটিই বর্তমান আইনি কাঠামোর অংশ। নতুন আইনে আগের কিছু বিতর্কিত speech-related বিধান বাদ দেওয়া হলেও, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
এখানেই একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি প্রশ্ন আসে। সরকার বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের আচরণ কি বদলেছে? যদি একটি সরকার বিরোধী দলের নেতা, সাংবাদিক বা সাধারণ নাগরিককে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘অপমানজনক’ বা ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যের অভিযোগে কঠোর আইনে গ্রেফতার করে, আর অন্য সরকার ক্ষমতায় এসে একই পদ্ধতি ব্যবহার করে, তাহলে পরিবর্তনটি কোথায়?
শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলালেই কি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায়? বাংলাদেশে অতীতেও রাজনৈতিক বিরোধী, সাংবাদিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী ও নিরাপত্তা আইন ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
তাই আজ যদি আমরা বলি, ‘ওকে গালি দিয়েছে, তাই শাস্তি হোক’, কাল একই যুক্তিতে আমাদের নিজের পছন্দের মানুষকে কেউ গালি দিলে আমরা কী বলব? গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা হলো, আমরা যে স্বাধীনতা নিজের জন্য চাই, সেই স্বাধীনতা আমাদের অপছন্দের মানুষের জন্যও মেনে নিতে পারি কি না।
এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গালি এবং হুমকির মধ্যে পার্থক্য। ধরা যাক, কেউ একজন প্রধানমন্ত্রীকে অশালীন ভাষায় গালি দিলো। এটি নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। কিন্তু যদি কেউ বলে, ‘আমি তোমাকে হত্যা করব’, ‘তোমার বাড়িতে হামলা করব’, অথবা অন্যদের সংগঠিত করে সহিংসতার আহ্বান জানায়, তখন বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বাস্তব ক্ষতির হুমকি, সহিংসতার উদ্দেশ্য এবং জননিরাপত্তার প্রশ্ন যুক্ত হয়।
আবার কেউ যদি কোনো ধর্মীয়, জাতিগত বা সামাজিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেয়, তখন সেটিও আলাদা আইনি শ্রেণিতে পড়ে। ICCPR-এর Article 20-তেও এমন ঘৃণার প্রচার নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে, যখন তা বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানির পর্যায়ে যায়।
অর্থাৎ একটি সভ্য আইনি কাঠামোকে বলতে হবে: অশালীনতা এক জিনিস, হুমকি আরেক জিনিস, সহিংসতায় উসকানি আরও গুরুতর, আর সন্ত্রাসবাদ তারও ভিন্ন একটি শ্রেণি। এই শ্রেণিগুলোকে এক করে ফেললে আইন তার নির্ভুলতা হারায়।
আর আইন যখন নির্ভুলতা হারায়, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে সাধারণ নাগরিক। কারণ ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে আইনজীবী থাকে, রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকে, সংবাদমাধ্যমে প্রবেশাধিকার থাকে। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে থাকে শুধু তার কণ্ঠস্বর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করেছে। এখন একজন সাধারণ মানুষও প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কোনো রাজনৈতিক দলের নেতার সমালোচনা করতে পারে। এর ফলে অবশ্যই দায়িত্বহীনতা, গালিগালাজ, অপপ্রচার, মিথ্যা তথ্য এবং সাইবার হয়রানিও বেড়েছে।
তাই সমাধান ‘সবকিছু বৈধ’ অথবা ‘সবকিছু অপরাধ’ কোনোটিই নয়। সমাধান হলো সুনির্দিষ্ট সীমারেখা। বাংলাদেশের জন্য প্রথম প্রয়োজন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে প্রকৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা। কোনো বক্তব্যকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নেওয়ার আগে স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে, সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয় উপাদান কোথায়। শুধু রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি কর্মকর্তাকে অপমান করা সেই উপাদান হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, জনব্যক্তি এবং ব্যক্তিগত নাগরিকের মধ্যে আইনি পার্থক্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা অন্য জননির্বাচিত ব্যক্তিকে তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সাধারণ নাগরিকের চেয়ে বেশি সমালোচনা সহ্য করতে হবে। এটি তাদের বিরুদ্ধে অন্যায় নয়, বরং গণতান্ত্রিক দায়িত্বের অংশ।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের মর্যাদা এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তির ব্যক্তিগত মর্যাদাকে এক করা যাবে না। একজন প্রধানমন্ত্রী অপমানিত বোধ করতে পারেন, কিন্তু তার ব্যক্তিগত অনুভূতিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে উন্নীত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
চতুর্থত, গালিগালাজ ও মানহানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা থাকলে তার প্রকৃতি ও সীমা পরিষ্কার হতে হবে। কোন বক্তব্য মতামত, কোনটি মিথ্যা তথ্য, কোনটি মানহানি, কোনটি হুমকি, কোনটি হয়রানি এবং কোনটি সহিংসতায় উসকানি, এগুলোর স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, গ্রেফতারকে শাস্তির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। অভিযোগের তদন্ত এবং গ্রেফতার দুটি আলাদা বিষয়। কোনো বক্তব্যের কারণে কারও বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি অভিযোগে গ্রেপ্তার প্রয়োজন হবে না। বিশেষ করে যখন অভিযোগটি মূলত বক্তব্যের প্রকৃতি নিয়ে, তখন জামিন, নোটিশ, তদন্ত এবং অন্যান্য কম কঠোর ব্যবস্থা আগে বিবেচনা করা উচিত।
ষষ্ঠত, একই আইন ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী উভয়ের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজ যে আইন দিয়ে আপনি আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিচ্ছেন, আগামীকাল সেই একই আইন আপনার বিরুদ্ধেও ব্যবহার হতে পারে।
সুতরাং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ নীতি হলো: ‘আইন এমন হতে হবে, যাতে সরকার বদলালেও নীতিটি বদলাতে না হয়।’
সপ্তমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য এমন একটি স্বাধীন ও বহুপক্ষীয় পর্যালোচনা কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে গুরুতর মতপ্রকাশ-সংক্রান্ত মামলায় আইন প্রয়োগের আগে বক্তব্যটির প্রকৃতি, সম্ভাব্য ক্ষতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আনুপাতিকতা পর্যালোচনা করা হবে। এর উদ্দেশ্য আইন প্রয়োগ বন্ধ করা নয়, বরং আইন প্রয়োগকে আরও নির্ভুল করা।
অষ্টমত, সমাজকেও তার দায়িত্ব নিতে হবে। কেউ প্রধানমন্ত্রীকে গালি দিলে আমরা তার ভাষার নিন্দা করব। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করব, গালির জবাব কি সন্ত্রাসবিরোধী মামলা হতে হবে?
কেউ বিরোধী দলের নেতাকে গালি দিলে আমরা যেমন নিন্দা করব, ক্ষমতাসীন নেতাকে গালি দিলেও একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করব।
কারণ গালির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান যদি ব্যক্তিভেদে বদলে যায়, তাহলে আমরা গালির বিরুদ্ধে নই, আমরা শুধু আমাদের পছন্দের মানুষকে গালি দেওয়া পছন্দ করি না। আর এখানেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সংকট।
আমরা প্রায়ই ব্যক্তি বদলাই, কিন্তু নীতি বদলাই না। সরকার বদলাই, কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাই না। রাজনৈতিক দল বদলাই, কিন্তু রাষ্ট্রের হাতে একই ধরনের অস্পষ্ট ও শক্তিশালী আইন রেখে দিই।
ফলে বিরোধী দল ক্ষমতায় গেলে যে আইনকে অন্যায় বলে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই আইনই ব্যবহার করে। আজ যে গ্রেপ্তারকে আমরা অন্যায় বলছি, কাল একই ধরনের গ্রেপ্তারের সময় আমরা নীরব হয়ে যাই, কারণ এবার ভুক্তভোগী আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।
এভাবে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হয় না। গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় তখন, যখন আমরা এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করি যেখানে ক্ষমতার মানুষও আইনের নিচে এবং সাধারণ মানুষও আইনের সুরক্ষার ভেতরে।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একজন ছাত্রকে গালি দেওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার নাগরিকের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবে? আমরা কি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে মানুষ ভয়ে কথা বলবে?
নাকি এমন একটি দেশ চাই, যেখানে মানুষ দায়িত্বশীলভাবে কথা বলবে, কিন্তু সরকারের ভুলের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসও রাখবে? দুটির মধ্যে পার্থক্য বিশাল। ভয় মানুষকে নীরব করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচার তৈরি করতে পারে না।
আইন মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারে, কিন্তু মানুষের ক্ষোভের কারণ দূর করতে পারে না। আর গালির জবাবে শুধু শাস্তি দিলে গালি হয়তো কমতে পারে, কিন্তু যে ক্ষোভ থেকে গালি এসেছে, সেই ক্ষোভ যদি বাস্তব হয়, তা থেকে যাবে।
তাই রাষ্ট্রের কাজ শুধু ‘কে কী বলেছে’ তা দেখা নয়, কেন বলেছে, কী উদ্দেশ্যে বলেছে, কী ক্ষতি করেছে এবং আইন প্রয়োগের মাত্রা কতটা প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক, সেটিও দেখা। বাংলাদেশের জন্য একটি সহজ নীতিই হয়তো সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
সন্ত্রাসের উপাদান ছাড়া কোনো বক্তব্যকে সন্ত্রাসবাদ বানানো যাবে না। আরেকটি নীতি তার সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার কারণে কোনো ব্যক্তি সাধারণ নাগরিকের চেয়ে বিশেষ ধরনের আইনি নিরাপত্তা পাবেন না। বরং গণতান্ত্রিক যুক্তি হবে উল্টো, ক্ষমতা যত বেশি, জনসমালোচনার সহনশীলতাও তত বেশি।
এখানে আবারও বলা প্রয়োজন, এর অর্থ গালিগালাজকে বৈধতা দেওয়া নয়। একটি সুস্থ সমাজে মতের বিরোধিতা হবে, তীব্র সমালোচনা হবে, ব্যঙ্গ হবে, প্রতিবাদ হবে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান ও অশালীনতা যতটা সম্ভব পরিহার করা উচিত। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকেও বুঝতে হবে, মানুষের মুখ বন্ধ করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় আইন নয়, আস্থা।
যে সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে, তাকে গালির ভয় করতে হয় না। যে নেতা নিজের কাজের জবাব দিতে প্রস্তুত থাকেন, তাকে প্রতিটি কটূ মন্তব্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করতে হয় না। আর যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করে, সেই রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ বারবার বৈষম্য, অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। প্রতিবারই মানুষ জীবন দিয়েছে একটি ন্যায্য রাষ্ট্রের আশায়। সেই রাষ্ট্র যদি শুধু সরকার পরিবর্তনের রাষ্ট্র হয়, কিন্তু ক্ষমতার আচরণ একই থাকে, তাহলে পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমাদের তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে ক্ষমতাবানকে গালি দিলে ‘লাল বাতি’ জ্বলে উঠবে, কিন্তু ক্ষমতাবান যখন নাগরিককে অপমান, হয়রানি বা অন্যায়ভাবে দমন করবে তখন রাষ্ট্র নীরব থাকবে?
নাকি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে একই লাল বাতি সবার জন্য জ্বলে? যেখানে হুমকি দিলে ব্যবস্থা হবে, সহিংসতায় উসকানি দিলে ব্যবস্থা হবে, সন্ত্রাস করলে ব্যবস্থা হবে, মানহানি হলে আইন অনুযায়ী প্রতিকার থাকবে, কিন্তু সরকারের সমালোচনা বা রাজনৈতিক বক্তব্যকে সন্ত্রাসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হবে না।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি গালির নয়। প্রশ্নটি ক্ষমতার সীমারেখার। প্রশ্নটি আইনের নিরপেক্ষতার। প্রশ্নটি নাগরিকের স্বাধীনতার। সবচেয়ে বড় কথা, প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্র কি নাগরিককে ভয় করবে, নাকি নাগরিক রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করবে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্তর হওয়া উচিত একটাই।
রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে আইনের কারণে, নাগরিকের মুখ বন্ধ করার কারণে নয়। আর বাংলাদেশের জন্য সেই নীতির সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রূপ হতে পারে। ‘সন্ত্রাসের উপাদান ছাড়া সন্ত্রাসের মামলা নয়, ক্ষমতার কারণে বিশেষ সুরক্ষা নয়, এবং একই আইন সবার জন্য।’
রহমান মৃধাগবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com
এমআরএম
বিজ্ঞাপন