বিজ্ঞাপন
একজন মানুষের একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থাকা এখন আর খুব অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কারো ফেসবুকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি আলাদা পেশাগত প্রোফাইল, ইনস্টাগ্রামে ব্যক্তিগত ও ক্রিয়েটর অ্যাকাউন্ট, আবার কোথাও শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জন্য ছোট একটি ‘প্রাইভেট’ অ্যাকাউন্ট। প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন এমন করেন? এর পেছনে কি শুধুই প্রয়োজন, নাকি কাজ করে মনস্তত্ত্বও?
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর একক কোনো কারণ নেই। মানুষের সামাজিক পরিচয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, আত্মপ্রকাশের ধরন, সম্পর্কের পরিসর এবং নিজের সম্পর্কে অন্যের ধারণা নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা সবকিছুই এতে ভূমিকা রাখতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর গবেষণা-ভিত্তিক আলোচনাতেও সোশ্যাল মিডিয়াকে আত্মপরিচয় তৈরি ও নিজের ভাবমূর্তি উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে।
একেক অ্যাকাউন্টে একেক পরিচয়
একজন মানুষ কর্মক্ষেত্রে যেমন আচরণ করেন, বন্ধুদের সঙ্গে হয়তো তেমন থাকেন না। আবার পরিবারের সদস্যদের সামনে যে ব্যক্তিত্ব দেখা যায়, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে সেটি আরও আলাদা হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক অ্যাকাউন্ট সেই আলাদা সামাজিক পরিসরগুলোকে পৃথক রাখার সুযোগ দেয়।
আরও পড়ুন
চ্যাটজিপিটি-জেমিনির লিমিট শেষ? ফ্রিতে ব্যবহারের কৌশল জানুন
একটি অ্যাকাউন্টে থাকতে পারে পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও সহকর্মীরা। অন্যটিতে শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। কোথাও আবার ব্যক্তির কাজ, ব্যবসা বা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডই প্রধান বিষয়। অর্থাৎ একাধিক অ্যাকাউন্ট অনেক সময় ‘একাধিক মানুষ হয়ে ওঠা’ নয়, বরং জীবনের বিভিন্ন সামাজিক ভূমিকাকে আলাদা রাখার কৌশল।
মনোবিজ্ঞানে এটিকে নিজের পরিচয় ও আত্মপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ হিসেবে দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া নিজের পরিচয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিজেকে অন্যের সামনে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্যও হতে পারে
অনেকেই চান না, জীবনের প্রতিটি বিষয় পরিবারের সদস্য, সহকর্মী কিংবা পরিচিত সবাই দেখুক। তাই আলাদা অ্যাকাউন্টে আলাদা দর্শক বেছে নেওয়া হয়। কেউ হয়তো একটি অ্যাকাউন্টে নিজের পেশাগত পরিচয় তুলে ধরছেন, অন্যটিতে ব্যক্তিগত ছবি ও দৈনন্দিন জীবনের গল্প শেয়ার করছেন। আবার কেউ এমন একটি অ্যাকাউন্ট রাখেন, যেখানে কেবল হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ যুক্ত থাকেন। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত পরিসরের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেন।
‘নিজের মতো থাকার’ জায়গা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো স্বাচ্ছন্দ্য। মূল অ্যাকাউন্টে অনেক সময় মানুষ ভাবেন ‘কে কী ভাববে?’ ফলে নিজের মতামত, রসবোধ, শখ কিংবা ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশে দ্বিধা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু ছোট ও পরিচিত মানুষের একটি আলাদা অ্যাকাউন্টে সেই চাপ তুলনামূলক কম হতে পারে। এমনকি কিছু মানুষের জন্য এটি নিজের এমন একটি দিক প্রকাশের জায়গা হতে পারে, যা বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে প্রকাশ করতে স্বস্তি বোধ করেন না। গবেষণায় এমন উদাহরণও পাওয়া গেছে যেখানে একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মানুষ ভিন্ন সামাজিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন।
লাইক, স্বীকৃতি ও আত্মবিশ্বাস
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের একটি নির্দিষ্ট ছবি তৈরি করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পছন্দের ছবি, অর্জন, ভ্রমণ কিংবা সৃজনশীল কাজ আলাদা প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরে মানুষ নির্দিষ্ট একটি দর্শকের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পেতে পারেন।
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সেলফ-প্রেজেন্টেশন’ বা আত্ম-উপস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করছেন।ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে মানুষ নিজের পছন্দের তথ্য বেছে নিয়ে উপস্থাপন করেন, যা নিজের সম্পর্কে কাঙ্ক্ষিত ধারণাকে শক্তিশালী করতে পারে।
তবে এখানেই সতর্কতার জায়গা আছে। একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকা মানেই আত্মমুগ্ধতা, মিথ্যা পরিচয় বা মানসিক সমস্যার লক্ষণ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কারণ একই আচরণের পেছনে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
আরও পড়ুন
ভুলে সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করে ফেললে, যা করবেন
মনোবিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণত শুধু ‘কতগুলো অ্যাকাউন্ট আছে’ তা দেখে কোনো ব্যক্তির মানসিক অবস্থা বিচার করেন না। বরং জানতে চান কেন অ্যাকাউন্টগুলো রাখা হচ্ছে, সেগুলো ব্যবহারের পর ব্যক্তি কেমন অনুভব করছেন এবং এর ফলে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, কাজ বা দৈনন্দিন জীবনে কোনো সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না।
যদি কেউ গোপনীয়তা, কাজ বা আলাদা সামাজিক পরিসরের জন্য একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন এবং এতে তার জীবনে সমস্যা না হয়, তাহলে সেটিকে অস্বাভাবিক আচরণ বলার কারণ নেই। কিন্তু যদি নিজের বিভিন্ন অনলাইন পরিচয় সামলাতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা বাস্তব সম্পর্কের সমস্যা তৈরি হয়, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ে গবেষণাতেও জোর দেওয়া হয় যে শুধু ব্যবহারের পরিমাণ নয়, ব্যবহারের ধরন ও ব্যক্তির অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।
একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট মানুষের ‘দ্বৈত জীবন’-এর প্রমাণ নয়। বরং এটি হতে পারে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন আলাদা রাখা, গোপনীয়তা রক্ষা, নিজের বিভিন্ন আগ্রহ প্রকাশ কিংবা ভিন্ন সামাজিক পরিসরে স্বাচ্ছন্দ্য খোঁজার একটি আধুনিক পদ্ধতি। প্রযুক্তি মানুষকে নিজের পরিচয় প্রকাশের আরও বেশি জায়গা দিয়েছে আর সেই জায়গাগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই মনোবিজ্ঞানের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: রিচার্স গেট, কিংস ইউনিভার্সিটি ব্রিস্টোল
কেএসকে
বিজ্ঞাপন