বিজ্ঞাপন
ট্যাক্স টোকেন হারিয়ে গেছে। ডুপ্লিকেট কপি পেতে প্রথমে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি), এরপর ট্রাফিক বিভাগের কার্যালয়ে ছুটতে হয়েছে। সেখান থেকে কাগজ নিয়ে যেতে হয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে। সেখানে মাত্র ২৩ টাকা ফি জমা দিতেও দাঁড়াতে হয়েছে প্রায় ১০০ জনের পেছনে। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত হাতে এসেছে ডুপ্লিকেট ট্যাক্স টোকেন।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে একটি হারানো কাগজের ডুপ্লিকেট পেতে এমন ভোগান্তির শিকার হয়েছেন রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান (ছদ্মনাম)। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে মিরপুরের বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি।
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে সাদেকুর রহমানের প্রশ্ন—বিআরটিএতে মোটরযানের তথ্য সংরক্ষিত থাকার পরও একটি হারানো ট্যাক্স টোকেনের ডুপ্লিকেট পেতে কেন একজন নাগরিককে একাধিক দপ্তরে ছুটতে হবে? আর মাত্র ২৩ টাকা ফি জমা দিতে কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হবে?
জিডি থেকে ট্রাফিক অফিস
সাদেকুর রহমান জানান, ২০১৮ সালে তিনি ইয়ামাহা ১৫০ সিসির একটি মোটরসাইকেল কেনেন। সে সময় গাড়ির ব্লু-বুক ও ১০ বছরের ট্যাক্স টোকেনসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রের টাকা পরিশোধ করেন। সম্প্রতি অফিসে যাওয়ার পথে ট্যাক্স টোকেনের কাগজটি হারিয়ে ফেলেন তিনি।
ভেবেছিলেন ডিজিটাল প্রযুক্তির এই সময়ে হারানো ট্যাক্স টোকেনের ডুপ্লিকেট কপি পাওয়া সহজ হবে। কিন্তু বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন তাকে প্রথমে থানায় জিডি এবং পরে ট্রাফিক অফিস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজ নিয়ে বিআরটিএতে যেতে হবে।
আরও পড়ুন
বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশা চালালেও দিতে হবে কর!
গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জিডি করতে নিউমার্কেট থানায় যান তিনি। কম্পিউটারে কম্পোজ করা আবেদনপত্রের প্রিন্টও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান অনলাইনে জিডি করতে হবে। তবে থানার কম্পিউটারে সে মুহূর্তে জিডি করা সম্ভব নয় জানিয়ে নীলক্ষেতের একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে জিডি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নীলক্ষেতে গেলে কম্পিউটারের দোকানি জানান, জিডির আবেদন কম্পোজ ও প্রিন্ট করতে ২০০ টাকা দিতে হবে। ফরম পূরণ করতে গিয়েও বিপাকে পড়েন তিনি। ১০ বছর আগে ট্যাক্স টোকেনের টাকা কোন ব্যাংকে পরিশোধ করেছিলেন সেটিও জানতে চাওয়া হয়। বহু কষ্টে ব্যাংকের নাম খুঁজে বের করে তা উল্লেখ করেন তিনি।
জিডির কপি প্রিন্ট করে আবার থানায় গেলে তাকে জানানো হয় থানায় প্রিন্ট দেওয়ার মতো কাগজ নেই। ফলে আবার নীলক্ষেতের ফটোকপির দোকান থেকে প্রিন্ট নিয়ে আসতে বলা হয়। পরে জিডির কপিতে স্বাক্ষর করে তাকে একটি কপি দেওয়া হয়।
এরপর জিডির কপি নিয়ে লালবাগ ট্রাফিক ডিভিশন কার্যালয়ে যান সাদেকুর রহমান। সেখানে জিডির কপি দেখে ‘কোনো মামলা/সমস্যা নেই’ এমন উল্লেখ করে দেওয়া হয়। সেই কাগজ নিয়েই মঙ্গলবার সকালে মিরপুরের বিআরটিএ কার্যালয়ে যান তিনি।
২৩ টাকার ফি, আড়াই ঘণ্টার অপেক্ষা
বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে ডুপ্লিকেট ট্যাক্স টোকেনের জন্য এনআরবি ব্যাংকে ২৩ টাকা ফি দিতে বলা হয়। অনেকগুলো কাউন্টার থাকলেও বেশ কয়েকটি বন্ধ দেখা যায়। ফলে সীমিত সংখ্যক কাউন্টারে মাত্র ২৩ টাকা জমা দিতে তাকে প্রায় ১০০ জনের পেছনে লাইনে দাঁড়াতে হয়। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর টাকা পরিশোধের কাগজ নিয়ে বিআরটিএর কয়েকজন কর্মকর্তার কক্ষ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়। সবশেষে হাতে আসে ডুপ্লিকেট ট্যাক্স টোকেন।
আরও পড়ুন
স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক মামলা দেবে এআই ক্যামেরা, যেসব ভুল করবেন না
তবে একই দিনে আরও একটি অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে তাকে। বিআরটিএর সিস্টেম-উৎপাদিত রসিদে দেখা যায়, ‘Contribution to Financial Assistance Fund’ খাতে মূল ১ হাজার টাকা এবং ১৫০ টাকা ভ্যাটসহ মোট ১ হাজার ১৫০ টাকা নেওয়া হয়েছে। রসিদে এর মেয়াদ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ২ সেপ্টেম্বর ২০৩৬ পর্যন্ত এবং‘Fine/Additional’ হিসেবে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, এই ১ হাজার ১৫০ টাকা ডুপ্লিকেট ট্যাক্স টোকেনের ২৩ টাকার ফি নয়, এটি আলাদা আর্থিক সহায়তা তহবিলের অর্থ। ইতোপূর্বে হারানো ট্রাক্স টোকেন সংগ্রহ করেছেন এমন কয়েকজন জানান, এই ১ হাজার ১৫০ টাকা সম্ভবত ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিআরটিএর তহবিলে দিতে হয়।
কী আছে সরকারি নিয়মে?
বিআরটিএর প্রকাশিত সিটিজেন চার্টারে ট্যাক্স টোকেন নবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজ হিসেবে পূর্বে ইস্যু করা ট্যাক্স টোকেন সার্টিফিকেটের মূল কপি উল্লেখ রয়েছে। সেখানে অনলাইনে নির্ধারিত ফি পরিশোধের সুবিধার কথাও বলা হয়েছে। বিআরটিএর সিটিজেন চার্টারে ট্যাক্স টোকেন-সংক্রান্ত সেবার জন্য অনলাইন পেমেন্টের সুবিধার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে প্রকাশিত এসব তথ্যে হারানো ট্যাক্স টোকেনের ডুপ্লিকেট পেতে জিডি কিংবা পুলিশের ‘কোনো মামলা নেই’ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক এমন স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে নাগরিককে বাস্তবে এসব ধাপ পার হতে হলেও এর সরকারি ভিত্তি কী সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
সাদেকুর রহমান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে হারানো একটি ট্যাক্স টোকেনের জন্য এত ভোগান্তি মেনে নিতে কষ্ট হয়। গাড়ি কেনার সময় বিআরটিএতে প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট থাকে। তাই জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে মালিকের পরিচয় শনাক্ত করে সংরক্ষিত তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে ডুপ্লিকেট ট্যাক্স টোকেন দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আরও পড়ুন
মিরপুর বিআরটিএতে দালালবিরোধী অভিযান, আটক ৮
তিনি বলেন, থানায় অনলাইনে জিডি করতে হলে কম্পিউটার কেন অচল থাকবে কিংবা প্রিন্টারের কাগজ কেন থাকবে না সেটিও জানা দরকার। একইভাবে মোটরসাইকেলের মালিক কোনো অপরাধ করেছেন কি না তা যাচাইয়ের জন্য তাকেই কেন ট্রাফিক কার্যালয়ে ছুটতে হবে?
তার মতে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এক ক্লিকেই বিভিন্ন থানা ও বিআরটিএর তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে একজন নাগরিককে একই তথ্য নিয়ে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছুটতে হবে না।
প্রশ্ন হলো—ডিজিটাল সেবার যুগে হারানো একটি ট্যাক্স টোকেনের ডুপ্লিকেট পেতে নাগরিককে কেন জিডি, ট্রাফিক অফিস ও বিআরটিএসহ একাধিক ধাপ পেরোতে হবে? আর মাত্র ২৩ টাকার একটি সেবা নিতে কেন তাকে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হবে?
এমইউ/এমকেআর
বিজ্ঞাপন