বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা। প্রতিবেদনে খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। সারের সংকটে যদি চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে নতুন করে দরিদ্র হবে ১৪ লাখ মানুষ।
এমনিতেই ডিজেলের ঘাটতিতে সেচসংকট ও বন্যার কারণে বোরোর উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমনের উৎপাদনে যাতে কোনোভাবে ব্যাঘাত না ঘটে, তার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বাস্তবে সেটা যে হয়নি, সার নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তা, ভোগান্তি, বিক্ষোভ ও ডিলারদের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাপ্রবাহই তার বড় প্রমাণ। আমনের সঙ্গে রবি মৌসুমের ফসল নিয়েও কৃষকেরা শঙ্কায় পড়েছেন।
কৃষির ওপর নির্ভরশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও গ্যাসসংকটের কারণে বাংলাদেশ সার আমদানিনির্ভর দেশ। ফলে যুদ্ধ, মহামারিসহ যেকোনো বৈশ্বিক সংকটেই সারের সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে দেশের অর্থনীতি ও কৃষির ওপর তার প্রভাব পড়ে।
সরকারের তরফ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে যে দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক এলাকায় কৃষকেরা তাঁদের প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও ডিলাররা একজন কৃষকের কাছে এক বস্তার বেশি সার বিক্রি করছেন না। এ পরিস্থিতিতে সারসংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দ্য ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশে জুলাই-সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে সারের চাহিদা থাকে ১৩ দশমিক ২১ লাখ টন। গত পরশু পর্যন্ত সরকারি গুদামে মজুত ছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার টন সার। এর বাইরেও ডিলারদের কাছে ২ থেকে ২ দশমিক ৫ লাখ টন সার মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি সারের মজুত থাকার পরও কেন কৃষকেরা প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না? কেন তাঁদের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে হচ্ছে?
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর পর রৌমারীতেও পরিবেশকের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি সরেজমিনে রৌমারীতে সার বিতরণে প্রশাসন, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার চিত্র দেখেছেন। কৃষকের প্রকৃত সংখ্যা বিবেচনায় না নিয়েই ইউনিয়নভিত্তিক সারের বরাদ্দ ঠিক করা হয়েছে। আবার পরিবেশকেরা প্রতিদিন বিক্রয়কেন্দ্র না খোলায় সারের জন্য কৃষকদের দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য হচ্ছে, রবি মৌসুমের ফসলের জন্য কৃষকেরা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত সার কিনছেন বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ভাষ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মানুষ তখনই আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা শুরু করে, যখন চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি থাকে। আমরা মনে করি, সার নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা মূলত অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা। পরিবেশকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়া গেলেও খোলাবাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অনেকেই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এ রকম বাস্তবতায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামেই সার কিনতে হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থেই সরকারকে সারের ওপর ভর্তুকি দিতে হয়। অব্যবস্থাপনার কারণে সেই সার যদি কৃষকের কাছে ঠিকমতো না পৌঁছায়, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে বিতরণকৃত সার যেন কৃষকের কাছে পৌঁছায়। এ জন্য সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। অসাধু পরিবেশকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>