বিজ্ঞাপন
পিরোজপুরে মহামারী আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গু। বরিশাল বিভাগের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের শীর্ষে অবস্থান করছে এই জেলা। গত আট মাসে জেলার সদর হাসপাতালসহ সাতটি উপজেলায় ২ হাজার ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪০ জন।
কিছুদিন আগে বরিশাল বিভাগের মধ্যে পিরোজপুর জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এই জেলা।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ২৭ জন, নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬ জন, নেছারাবাদে ২৭ জন, কাউখালীতে সাতজন, ভান্ডারিয়ায় ১৯ জন এবং মঠবাড়িয়ায় তিনজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ইন্দুরকানি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই। পিরোজপুরে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৯৩৬ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৯৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের সীমিত জায়গার কারণে ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি অবস্থান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। তারা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কক্ষের দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের অনেকেই মশারি ব্যবহার করছেন না। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে নার্সদের নির্দেশনায় দ্রুত মশারি টানিয়ে দেন কয়েকজন রোগী। এ বিষয়ে হাসপাতালের এক নার্স জানান, রোগীদের বারবার মশারি ব্যবহারের জন্য বলা হলেও অনেকেই তা খুলে রাখেন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া এক রোগীর বাবা মো. মারুফ হাওলাদার বলেন, ‘আমার মেয়েকে গত রবিবার নিয়ে আসছি পিরোজপুর সদর হাসপাতালে, এখানে পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারছি ডেঙ্গু হইছে। চিকিৎসা সেবা আলহামদুলিল্লাহ ভালোই পাইছি। বর্তমানে রোগী সুস্থ আছে। তবে হাসপাতালে রোগী অনেক বেশি। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা রুমের ব্যবস্থা করলে ভালো হতো।’
পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রুমনা বেগম বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের যে মশা কামড় দিয়েছে, সেটা যদি আমাকে কামড়ায় তাহলে আমিও ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হতে পারি। আমি এসেছি পেটে ব্যথা নিয়ে, পরে দেখা যাবে ডেঙ্গু নিয়ে বাসায় ফিরতে হবে। এখানে সেবা ভালোই পেয়েছি, এখন মোটামুটি সুস্থ। তবে একই জায়গায় অনেক রোগী। ডেঙ্গুর জন্য আলাদা কক্ষ, হাম রোগীর জন্য আলাদা কক্ষ এবং সাধারণ রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ থাকলে ভালো হতো।’
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, ‘সাংবাদিকরা আসার পর মশারিগুলো টানানো হয়েছে। এতক্ষণ মশারি টানানো ছিল না। দেখলে বোঝাই যায় না কে ডেঙ্গু রোগী আর কে সাধারণ রোগী। ডেঙ্গু রোগীকে যে মশা কামড় দিয়েছে, সেই মশা যদি আমাদের রোগীকে কামড়ায় তাহলে আমাদের রোগীরও ডেঙ্গু হতে পারে। পাশে যে ভবন হয়েছে, সেখানে সাধারণ ও ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা জায়গার ব্যবস্থা করা হোক। সারা দেশের মধ্যে পিরোজপুরের ডেঙ্গুর অবস্থা সব থেকে খারাপ, এটা আমাদের জন্য দুঃসংবাদ।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে, পাশাপাশি অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীরাও একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এতে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. সুরঞ্জিত কুমার সাহা জানান, বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেশি এবং প্রত্যেকদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অনেক নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। পিরোজপুরের পার্শ্ববর্তী জেলা বাগেরহাটের বাদাল সহ বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।
সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জেলা হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়েছে। রোগীদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ মেডিকেল টিমও গঠন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত কাজ করছি। যারা ডেঙ্গু রোগী হিসেবে ভর্তি হচ্ছেন, তাদের ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। এছাড়াও নিয়মিত মশারি ব্যবহারের পাশাপাশি ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।’
পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘পিরোজপুরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পুকুর, ডোবা ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, বৃক্ষরোপণসহ ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’
পর্যাপ্ত সচেতনতা এবং কর্তৃপক্ষের সঠিক নজরদারি না থাকলে ডেঙ্গু আক্রান্তের ভয়াবহতা আরও বেশি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মো. তরিকুল ইসলাম/কেজে/জেআইএম
বিজ্ঞাপন