বিজ্ঞাপন
বাজারে নিজ জেলার সবজির আকাল
জেলায় সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে ধান
পারিবারিক চাহিদা পূরণে অন্য সবজি চাষ
মৌলভীবাজারে চাহিদার তুলনায় দুই লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন বেশি হচ্ছে বলে দাবি কৃষি অধিদপ্তরের। তবে বাজারের চিত্র ভিন্ন। স্থানীয় বাজারগুলোতে ‘উদ্বৃত্ত’ খাদ্যশস্যের কোনো প্রভাব নেই। বাজার দখলে রয়েছে অন্যান্য জেলার শস্যে। এ অবস্থায় কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলায় উৎপাদন করা শাকসবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় তেমন জিনিসপত্র বাজারে দেখা যায় না। বিশেষ করে শীত মৌসুমের শাক-সবজি ছাড়া সারাবছর জেলার বাইরে উৎপাদন করা খাদ্যশস্যের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। এতে করে খাদ্যশস্যের চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জেলার সাতটি উপজেলার প্রায় চার লাখ পরিবারকে।
প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজারে উঁচু থেকে নিচু জমিতে সারাবছর বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ হচ্ছে। জেলায় ধানের উৎপাদন ভালো হয়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধান ছাড়া অন্যান্য ফসল মোটেও জেলাবাসীর চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের কাগজে-কলমে উৎপাদন বেশি দেখানো হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সারাবছর বাজারে দেখা যায়, বেশিরভাগ সবজি অন্যান্য জেলা থেকে এনে বিক্রি করা হচ্ছে।
‘আমাদের জেলার বেশিরভাগ মানুষেরা সারাবছর বাইরের সবজির ওপর নির্ভরশীল। এখানে স্থানীয় সবজি খুবই কম পাওয়া যায়। কৃষকরা যে শস্য উৎপাদন করেন তা তাদের নিজেদের খাওয়ার জন্য করেন। কিছু কৃষক আছেন যারা বাণিজ্যিক চিন্তা করে কয়েকটি ফসল উৎপাদন করেন। তাও আবার শীত মৌসুমে। আমরা বাইরের সবজি বেশি বিক্রি করি’—সবজি ব্যবসায়ী
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, দুই হাজার ৭৯৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় মোট ফসিল জমি দুই লাখ ৩৬ হাজার ৯০৫ হেক্টর। এসব জমির মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ এক লাখ ৪১ হাজার হেক্টর, নিট ফসলি জমি এক লাখ ২৮ হাজার হেক্টর, এক ফসলি জমি ৪২ হাজার হেক্টর, দুই ফসলি জমি ৬৩ হাজার হেক্টর, তিন ফসলি জমি ২১ হাজার ৮৬৪ হেক্টর ও চার ফসিল জমি ৭২০ হেক্টর। শ্রমিক সংকট ও অপ্রতুল সেচ ব্যবস্থার মধ্যেও জেলার প্রধান ফসল হচ্ছে ধান।
আরও পড়ুন
তামাক চাষ কেন জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘অশনিসংকেত’
তথ্যমতে, ধানের পাশাপাশি কমলা, মাল্টা, লেবু, আনারস, কাঁঠাল, আলু, গ্রীষ্মকালীন টমেটো, গ্রাফটেড টমেটো, কচুসহ শাকসবজি, সরিষা, সূর্যমুখী ও ভুট্টার আবাদ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র পরিবার সবচেয়ে বেশি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এসব পরিবার ধানচাষ বেশি করলেও অন্যান্য ফসল কম চাষ করছে। জেলায় দুই লাখ ৬০ হাজার ৯০৭টি কৃষক পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ভূমিহীন পরিবার ৫৫ হাজার ৪৭০টি, প্রান্তিক পরিবার এক লাখ ২ হাজার ৯৯৮টি, মাঝারি পরিবার ২৯ হাজার ৭৫৯টি ও বড় পরিবার সাত হাজার ৭১১টি। এসব পরিবার বছরজুড়ে আমন, আউশ, বোরো, সবজি, ফল, সরিষা, আলু, টমেটোসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করছে। তবে ধান ছাড়া অন্যান্য ফসল বিক্রির উদ্দেশ্যে কম চাষ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
সার নিয়ে ‘তুলকালাম’, সরকার বলছে ‘সংকট নেই’
জেলায় বর্তমানে আবাদকৃত জমির মধ্যে বোরো ৬২ হাজার ১৪০ হেক্টর, আউশ ৩৮ হাজার ৫৩০ হেক্টর, আমন ৯৮ হাজার ৩৫ হেক্টর, ভুট্টা ২৮০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি চার হাজার ১০৯ হেক্টর, শীতকালীন সবজি ১২ হাজার ২৫০ হেক্টর, মুখিকচু এক হাজার ১৫০ হেক্টর, শীতকালীন টমেটো এক হাজার ২২১ ও গ্রীষ্মকালীন টমেটো ২১ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়।
এসব জমি থেকে মোট উৎপাদিত খাদ্য শস্যের পরিমাণ ছয় লাখ ৩০ হাজার ৬১২ মেট্রিক টন। জেলার ২১ লাখ মানুষের জন্য মোট খাদ্যশস্যের চাহিদা চার লাখ ১৫ হাজার ৫৫৩ মেট্রিক টন। ফলে খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত থাকছে দুই লাখ ১৪ হাজার ৬৫৯ মেট্রিক টন। তবে বাস্তবে জেলার চাহিদা পূরণ হচ্ছে কি-না তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে ত্বীন ফলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা কেমন?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলায় উৎপাদন হয় এমন সবজি সারাবছর পাওয়া যায় না বললেই চলে। বিশেষ করে সবধরনের সবজি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমদানি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। শীত মৌসুমে জেলায় উৎপাদিত টমেটোসহ কিছু শাকসবজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তবে ফলের মৌসুমে জেলায় উৎপাদিত কাঁঠাল ও আনারস পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষিতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ চাষে খরচ বেড়েছে। আগের তুলনায় রোগবালাইও বেশি। প্রচুর কীটনাশক দিতে হয়। ফলে ফসল চাষ করে লাভ থাকছে না। এজন্য পারিবারিক চাহিদা পূরণ হয় এমন ফসল চাষ করছেন কৃষকরা।
আনোয়ার খান ও মিজান আহমেদ দুজনই পেশায় কৃষক। তাদের ভাষ্য, ‘আমরা আউশ ও আমন ধান চাষ করি। তবে কখনো বন্যা আবার কখনো খরায় নিয়ে যায় (ফসলের ক্ষতি হয়)। এক একর জমি চাষ করতে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। ধান বিক্রির সময় কম দামে বিক্রি করতে হয়। আবার চাল বেশি দামে কিনে খেতে হয়। শীতকালে কিছু সবজি চাষ করা গেলেও বছরের বাকি সময় চাষ করা কঠিন। আমরা কৃষক হয়ে সবজি কিনে খেতে হচ্ছে। কারণ আমরা আবহাওয়া অনুযায়ী বীজ পাচ্ছি না।’
আরও পড়ুন
কৃষকদের কাজে আসছে না মিনি হিমাগার
সবজি ব্যবসায়ী হেলাল মিয়া বলেন, ‘আমাদের জেলার বেশিরভাগ মানুষেরা সারাবছর বাইরের সবজির ওপর নির্ভরশীল। এখানে স্থানীয় সবজি খুবই কম পাওয়া যায়। কৃষকরা যে শস্য উৎপাদন করেন তা তাদের নিজেদের খাওয়ার জন্য করেন। কিছু কৃষক আছেন যারা বাণিজ্যিক চিন্তা করে কয়েকটি ফসল উৎপাদন করেন। তাও আবার শীত মৌসুমে। আমরা বাইরের সবজি বেশি বিক্রি করি।’
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগের চেয়ে ফসল উৎপাদন অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ধান উৎপাদন ভালো হয়। অন্যান্য ফসল উৎপাদন সময়ের সঙ্গে বাড়ছে। গবেষণা ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন হচ্ছে। অঞ্চলভিত্তিক নতুন জাত আবিষ্কারের জন্য ব্যাপক কাজ চলছে।’
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হচ্ছে তবুও বাজারে কেন পাওয়া যাচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের কৃষকরা অধিক মূল্য পাওয়ার আসায় উৎপাদনকৃত শাকসবজি থেকে শুরু করে বেশিরভাগ পণ্য বাইরে রপ্তানি করছেন। এজন্য বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। বাস্তবে ফল-ফসল থেকে শুরু করে কোনো কিছুর অভাব নেই আমাদের।’
এসআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন