বিজ্ঞাপন
জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধি না মেনে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পয়েন্ট অব অর্ডারের নাম দিয়ে প্রতিনিয়ত নিয়মবহির্ভূত বক্তব্য দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে সংসদ সদস্যদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০১ ধারা পড়ে শুনান তিনি।
স্পিকার জানান, যে কোনো বিষয়ে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার নাম পয়েন্ট অব অর্ডার নয়। সংসদের চলমান বিষয়, শৃঙ্খলা রক্ষা ও কার্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গেই এটি সম্পর্কিত হতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে মাগরিবের নামাজের শেষে শুরু হওয়া অধিবেশনে তিনজন সংসদ সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিলে স্পিকার কার্যপ্রণালী বিধি স্মরণ করিয়ে দেন।
অধিবেশনে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তার নির্বাচনী এলাকার সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। এলাকাটিতে এক ব্যক্তি নিজেকে ইমাম মাহদী দাবি করার পর তীব্র সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এমপি কামরুজ্জামানের বলেন, আমার বাড়ি মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে, যেখানে মীরকাদিম একটি পৌরসভা। গত দুই দিন ধরে সেখানে একটা বিরাট ফিতনা তৈরি হয়েছে- একজন নিজেকে ইমাম মাহদী দাবি করেছে। এর ফলে দুটি কারণে পরিস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, গতকাল রাত থেকেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আলেম-ওলামা এমনকি নারীরাও ঘর থেকে বেরিয়ে তার বাড়ি ঘেরাও বা আক্রমণ করতে যাচ্ছেন, যা একটা চরম অশান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন
সংসদে প্রধানমন্ত্রী / লংমার্চে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা গেলে আমরাই আগে আয়োজন করতাম
দ্বিতীয়ত, ওই ব্যক্তি জুলাই যুদ্ধে শহীদ সারিকের বাবা। শহীদ সারিকের পরিবারকে বিভিন্ন সময় অনুদান দেওয়ার কারণে এবং তার পাশে থাকার জন্য আমাকে কবরস্থানে গিয়ে দোয়া করতে হয়েছে। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভণ্ড ও ভুয়া ইমাম মাহদীর সঙ্গে আমার সেই আগের ছবিগুলো শেয়ার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমি তাকে চিনি কেবলই শহীদ সারিকের বাবা হিসেবে, ইমাম মাহদী হিসেবে নয়। এরকম একটা ফিতনার সঙ্গে যখন আমাকে জড়িয়ে সামাজিক মিডিয়ায় নানা কথা প্রচার করা হচ্ছে, তখন আপনার মাধ্যমে আমি মুন্সিগঞ্জবাসী, পুরো আলেম সমাজ ও সাধারণ মুসলমানদের জানাতে চাই- এ ধরনের ভণ্ড, প্রতারক ও ভুয়া লোকের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী দল কিংবা আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। একজন শহীদের বাবা হিসেবেই আমি কেবল তার পাশে গিয়েছিলাম।
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, মাননীয় স্পিকার, কয়েকদিন আগে জাতীয় সংসদে জ্বালানি সংকট নিয়ে যে আলোচনা হয়েছিল, সেখানে আমি থার্ড (৩য়) এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিষয়ে কথা বলেছিলাম। সেই বিষয়ে আজ ‘দৈনিক ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।
রিপোর্টে দেখা যায়, আমাদের একই এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করার জন্য আরেকটি কোম্পানি এক লাখ ৯০ হাজার ডলারের কোটেশন দিয়েছিল। কিন্তু চুক্তিটি যাদের দেওয়া হয়েছে, তাদের দরপত্র ছিল ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলারের। অভিযোগ উঠেছে, এর সঙ্গে সরকারের একজন প্রভাবশালী সদস্যের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তিনি বলেন, সেদিন আমার প্রশ্নের উত্তর জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এড়িয়ে গিয়েছিলেন। আমি এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে স্পষ্ট বিবৃতি ও ব্যাখ্যা আশা করছি।
আরও পড়ুন
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন কোরআন-সুন্নাহবিরোধী: সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা
এরপরই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমি বারবার এই সংসদে বলে আসছি যে, পয়েন্ট অব অর্ডার বা বৈধতার প্রশ্নের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্ত রয়েছে। ইচ্ছা করলেই হুট করে দাঁড়িয়ে সংসদে যে কোনো বক্তব্য দেওয়া যায় না। আমি এতবার বলার পরও আপনারা যতগুলো পয়েন্ট অব অর্ডার তুলেছেন, তার ৯৯ শতাংশই নিয়মমাফিক ছিল না। তাই আজ বাধ্য হয়ে আমি কার্যপ্রণালী বিধির ৩০১ নম্বর ধারাটি আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি, যাতে ভবিষ্যতে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলার সময় আপনারা সতর্ক থাকেন।
স্পিকার বলেন, কার্যপ্রণালী বিধির ৩০১ ধারার উপধারা ১, ২ এবং ৩-এ স্পষ্ট বলা আছে- কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট সময়ে সংসদের বিবেচনাধীন কোনো বিষয়েই পয়েন্ট অব অর্ডার বা বৈধতার প্রশ্ন তোলা যাবে। অর্থাৎ যে বিষয়ে আলোচনা চলছে, কেবল সেটি নিয়েই কথা বলা যাবে। তবে শর্ত থাকে যে, আপনার প্রশ্নটি যদি সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা বা সংসদ পরিচালনার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে স্পিকার এক কার্যসূচি শেষ হওয়া এবং অন্য কার্যসূচি শুরুর মধ্যবর্তী সময়ে কথা বলার অনুমতি দিতে পারেন।
কাজেই পয়েন্ট অব অর্ডার হতে হলে তা সংসদের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। কিন্তু আজ যে পয়েন্ট অব অর্ডারগুলো তোলা হলো, তার একটিও এই বিধির মধ্যে পড়ে না।
আরেকটি বিষয়, আপনারা প্রায়ই আইন প্রণয়নের সময় হুট করে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে যান। যখন কোনো প্রস্তাব ভোটে দেওয়া হয়, সেই মুহূর্তে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলা যাবে না। আজও দেখলাম, প্রস্তাব ভোটে দেওয়ার সময় আপনারা দাঁড়িয়ে গেলেন।
স্পিকার আরও বলেন, আপনারা এই দেশের নেতা ও নীতি-নির্ধারক। অনুগ্রহ করে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০১ ধারার উপধারাগুলো পড়ে আসবেন। তাহলে আপনারা সঠিকভাবে পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন করতে পারবেন। আমি আবারও বলছি, চলমান বিষয় এবং সংসদের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই কেবল পয়েন্ট অব অর্ডার ব্যবহার করুন, যেন সংসদ দক্ষতার সঙ্গে চলতে পারে। সংসদের একদম শেষ মুহূর্তে এসে এভাবে সময় নষ্ট করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
এমওএস/কেএসআর
বিজ্ঞাপন