বিজ্ঞাপন
বিশ্বরাজনীতির দাবা অথবা তাস খেলায় অনেক ঘুঁটি আছে। হরমুজ প্রণালি তেমনই এক ভূরাজনৈতিক ঘুঁটি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা মাত্র কয়েক দশমিক কিলোমিটার প্রশস্ত এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবাহিত হয়। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আবারও হরমুজকে কেন্দ্র করে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখানে কে কাকে সামরিকভাবে চাপে ফেলছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এখন ভাবনা হচ্ছে, বিশ্ববাণিজ্যের এই শ্বাসনালী কত দিন সংকুচিত থাকবে এবং তার মূল্য কে দেবে?
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর সংঘাত দ্রুত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এরই মধ্যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। গত ১৪ আগস্ট রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ মার্কিনিরা হরমুজ এলাকায় নিজেদের টেরিটরি বা ভূখণ্ড ঘোষণা দিয়েছে। সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬ তারিখে এসে জানা গেল, হরমুজের জলসীমায় ইরানি মাইনের আঘাতে দুটি জাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং তার একটি সৌদি আরবের। এ ছাড়া ইরানের মূল তেল সংরক্ষণাগারে মার্কিন হামলা জোরদার হয়েছে।
এ যেন তাসের খেলায় হরতন ও টেক্কার লড়াই। এখানে হরতন হলো তেল, গ্যাস ও বাণিজ্যের অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য শক্তি; আর টেক্কা হলো হরমুজের নিয়ন্ত্রণ। যে পক্ষ এই টেক্কা নিজের হাতে রাখতে পারে, সে সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের বিরাট ক্ষমতাও অর্জন করে।
হরমুজের গুরুত্ব বুঝতে একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ দিয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ। একই বছরে ১১০ বিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি এলএনজিও এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই জ্বালানির সিংহভাগই এশিয়ামুখী। ২০২৫ সালে হরমুজ দিয়ে যাওয়া তেল ও তেলজাত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এশিয়ার বাজারে গেছে। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এ প্রবাহের সবচেয়ে বড় গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ হরমুজে সংকট মানে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়। এর অভিঘাত এশিয়ার শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ, উৎপাদন ও ভোক্তা বাজারে পৌঁছানো অবশ্যম্ভাবী।
গ্যাসের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। কাতারের প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রায় ৯৬ শতাংশ এলএনজি রপ্তানি হরমুজের ওপর নির্ভরশীল। আইইএ বলছে, এ প্রবাহের বিকল্প পথ সীমিত বা অনেক ক্ষেত্রে কার্যত নেই।
পাশাপাশি এই ভয়ংকর যুদ্ধের আসল টেক্কা কোথায়, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি নিঃসন্দেহে ইরানের তুলনায় বহুগুণ বেশি। সমুদ্র, আকাশ, গোয়েন্দা সক্ষমতা, প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের সুবিধা রয়েছে। কিন্তু ইরানের হাতে রয়েছে ভূগোল। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূগোল অনেক সময় বিমানবাহী রণতরীর চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত এই উপাখ্যানে হরতন কার হাতে আর টেক্কা কার হাতে, সেটি হয়তো সামরিক ইতিহাসের বিষয় হয়ে থাকবে। কিন্তু হরমুজ দীর্ঘদিন অচল থাকলে সেই টেক্কা জয়ের বিল দেবে বিশ্বের সাধারণ মানুষ—জ্বালানির বাড়তি দাম, খাদ্যের বাড়তি মূল্য, পরিবহনের বাড়তি ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মাধ্যমে।
ইরান হরমুজের উত্তর উপকূলে অবস্থান করছে। জলপথের সংকীর্ণতা, উপসাগরের ভৌগোলিক বিন্যাস এবং উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থার কারণে ইরানের পক্ষে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা সম্ভব। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে পারলেও প্রতিটি তেলবাহী ট্যাংকারকে নিরাপদে পার করানোর নিশ্চয়তা দেওয়া সহজ নয়। এখানেই ইরানের হাতে টেক্কা বিরাজমান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্কা হলো নিষেধাজ্ঞা, নৌ-অবরোধ, সামরিক শক্তি এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব। আগস্টের মাঝামাঝি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন এবং দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র জলপথটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখছে। ইরান এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে হরমুজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌম অধিকারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
কিন্তু সামরিক ভাষায় নিয়ন্ত্রণ আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ চলাচল এক কথা নয়। কোনো জলপথে যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি থাকলেই সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বীমা কোম্পানি ঝুঁকি দেখলে প্রিমিয়াম বাড়ায়, জাহাজমালিক ঝুঁকি দেখলে যাত্রা স্থগিত করেন, আর ব্যাংক ঝুঁকি দেখলে অর্থায়ন ব্যয়বহুল করে। ফলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া না হলেও বাজারে তার অভিঘাত শুরু হয়ে যায়। হরমুজ দিয়ে সরবরাহ কমলে বাজারে ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়াতে পারে। আগস্টের মাঝামাঝি হরমুজে উত্তেজনা বাড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এখানে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। বাজার শুধু বর্তমান সরবরাহ দেখে না, ভবিষ্যৎ সরবরাহের আশঙ্কাও মূল্যায়ন করে। আজ ১০ লাখ ব্যারেল তেল কম সরবরাহ হলে যতটা দাম বাড়তে পারে, আগামী এক মাস ১০ মিলিয়ন ব্যারেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে তার চেয়েও বেশি প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
এর সঙ্গে যোগ হয় জাহাজভাড়া ও যুদ্ধঝুঁকি বীমা। একটি ট্যাংকার যদি হরমুজে প্রবেশ করতে না চায়, তাকে দীর্ঘ পথ ঘুরতে হতে পারে। এতে সময়, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে। সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত আমদানিকারক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে একটি গোলা ছোড়া হলে তার আর্থিক বিস্ফোরণ ঘটে বহু হাজার কিলোমিটার দূরে।
আছে, কিন্তু তা হরমুজের পূর্ণ বিকল্প নয়। সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ এবং ইরাক-তুরস্কের পাইপলাইনসহ কয়েকটি বিকল্প ব্যবস্থায় তেল সরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আইইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে হরমুজ দিয়ে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস তরল ও পরিশোধিত পণ্যের প্রবাহ নেমে এসেছিল প্রায় ৩.৮ মিলিয়ন ব্যারেল সমতুল্য দৈনিক হারে, যেখানে যুদ্ধের আগে তা ছিল ২০ মিলিয়নের বেশি; একই সময়ে বিকল্প রুট দিয়ে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছিল।
কিন্তু পাইপলাইন বা বিকল্প বন্দর দিয়ে সীমিত পরিমাণ তেল সরানো গেলেও কাতার ও আমিরাতের বিপুল এলএনজি রপ্তানির পূর্ণ বিকল্প নেই। এ কারণেই হরমুজের সংকট তেলবাজারের পাশাপাশি গ্যাসবাজারকেও নাড়া দেয়। এখানে আরেকটি শিক্ষা রয়েছে। একটি সরু জলপথে সংঘাত শুরু হলে তার অভিঘাত বিদ্যুৎকেন্দ্র, পোশাক কারখানা, সার কারখানা, পরিবহনব্যবস্থা এমনকি আমাদের দেশের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে!
হরমুজ সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ভুক্তভোগী হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এশিয়া। কারণ হরমুজ দিয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাসের সিংহভাগ এশিয়ায় যায়। আইইএ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হরমুজ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের ৮৪ শতাংশ এবং এলএনজির ৮৩ শতাংশ এশিয়ার বাজারে গিয়েছিল। এ কারণেই হরমুজের প্রশ্নে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোর কূটনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি দেশ সামরিক পক্ষ নেওয়ার বদলে সরবরাহপথ খোলা রাখার কূটনীতিতে জোর দেবে, এটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধের পক্ষ নয়, কিন্তু বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্নও নয়। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ব্যয়, শিল্পের কাঁচামাল, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
হরমুজ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আমাদের প্রধান ধাক্কা এসেছে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ে। পোশাকশিল্পসহ রপ্তানিমুখী খাতের উৎপাদন ব্যয়ও আরও বাড়তে পারে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বীমা ও ফ্রেইট ব্যয় বাড়ায় তা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।
তাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি নেওয়া। জ্বালানি আমদানির উৎস ও রুট বৈচিত্র্যপূর্ণ করা, কৌশলগত মজুত শক্তিশালী করা, বিদ্যুৎ ও পরিবহনে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানো জরুরি।
হরমুজকে কেন্দ্র করে বর্তমানে যে টানাপোড়েন চলছে, সেখানে আলোচনার পথ খোলা রাখাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু শর্তের অমিল ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে অগ্রগতি আটকে আছে। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ইরান ও ওমান হরমুজের নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও বৃহত্তর মার্কিন-ইরান সমঝোতার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বও কম নয়। জাতিসংঘ, উপসাগরীয় দেশগুলো, চীন, ভারত, ইউরোপ—সবার স্বার্থেই হরমুজকে যুদ্ধের স্থায়ী মঞ্চে পরিণত হতে না দেওয়া দরকার। কারণ হরমুজের ওপর কোনো একক শক্তির স্থায়ী মালিকানা প্রতিষ্ঠার ধারণা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে আরও জটিল করবে। হরমুজ কোনো দেশের রাজনৈতিক তাস হতে পারে না। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা।
শেষ পর্যন্ত এই উপাখ্যানে হরতন কার হাতে আর টেক্কা কার হাতে, সেটি হয়তো সামরিক ইতিহাসের বিষয় হয়ে থাকবে। কিন্তু হরমুজ দীর্ঘদিন অচল থাকলে সেই টেক্কা জয়ের বিল দেবে বিশ্বের সাধারণ মানুষ—জ্বালানির বাড়তি দাম, খাদ্যের বাড়তি মূল্য, পরিবহনের বাড়তি ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মাধ্যমে।
তাই হরমুজের হরতন-টেক্কার খেলায় সবচেয়ে বড় বিজয়ী হওয়া উচিত বৈশ্বিক প্রয়োজনে নিরাপদ নৌচলাচল, আন্তর্জাতিক আইন এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার দাবিদারদের। কারণ বিশ্ববাণিজ্যের শ্বাসনালীকে যুদ্ধের অস্ত্র বানানো যত সহজ, তাকে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনা তত কঠিন।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।
fakrul@ru.ac.bd
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন