ব্রেকিং নিউজ
সারাদেশ

নাট-বোল্ট-স্ক্রুর চোরাচালান বাড়ছে, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

b
bd24live অনলাইন ডেস্ক
4 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
দেশে নির্মাণ, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস ও প্রকৌশল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে নাট, বোল্ট, স্ক্রুসহ বিভিন্ন ধরনের ফাসেনারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একসময় এসব পণ্যের বাজার প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আকিজ, আরএফএল, মেঘনা, ওয়ালটন, সুপার স্টার, বিএসআরএমসহ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানও দেশে ফাসেনার উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির এই সময়ে খাতটির সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা নাট, বোল্ট ও স্ক্রু। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রকৃত এইচএস কোড (পণ্যের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস নম্বর) পরিবর্তন, আমদানি মূল্য কম দেখানো, পণ্যের ভুল বা মিথ্যা ঘোষণা এবং সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ফাসেনার দেশের বাজারে ঢুকছে। এর ফলে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ শুল্ক-কর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বৈধভাবে শুল্ক পরিশোধ করে আমদানি করা ব্যবসায়ী এবং দেশীয় উৎপাদক-উভয় পক্ষই অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সূত্রে জানা গেছে, কতিপয় অসাধু চক্র প্রকৃত এইচএস কোড পরিবর্তন, কম মূল্য প্রদর্শন বা মিথ্যা ঘোষণায় ফাসেনার আমদানি করছে। সম্প্রতি ইউনিস্টার টেক্সটাইলের সেকেন্ডহ্যান্ড পাওয়ার লুমের চালানে ঘোষণার আড়ালে বিভিন্ন পণ্য আমদানির ঘটনায় প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং এম এ টেক্সটাইলের মেশিনারিজের আড়ালে ইলেকট্রিক স্কুটি, নাট-বল্টু ও সি-সল্ট আমদানির ঘটনায় ৯১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এইচএস কোড ৭৩১৮.১৯.০০ এর বিপরীতে ফাসেনার অর্থাৎ নাট-বোল্ট-স্ক্রু আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে ফাসেনার আমদানির উপর ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি, ২০ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ এআইটি এবং ৭.৫ শতাংশ এটি আরোপ করা হয়েছে। আমদানিকৃত প্রতি কেজি স্ক্রুর ন্যূনতম ক্রয়মূল্য ২ থেকে ২.৫ মার্কিন ডলার। রাজধানীর নবাবপুরে ফাসেনারের পাইকারি বাজার সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, চীন থেকে আমদানিকৃত নাট-বোল্ট-স্ক্রুতে বাজার সয়লাব এবং প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৭০-১৮০ টাকায়। অথচ বৈধভাবে শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে আমদানি করা প্রতি কেজি ফাসেনারের বিক্রয়মূল্য হবে ৩’শ টাকারও বেশি। এই উচ্চ কর ফাঁকি দেওয়ার কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোটি কোটি টাকার আমদানি শুল্ক এবং ভ্যাট (VAT) থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এক বিরাট ক্ষতি। বৈধ আমদানিকারক তো বটেই, স্থানীয় উৎপাদকও দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাজারে এখন এই অসম প্রতিযোগিতাই দেশীয় ফাসেনার শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। বাজার ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ফাসেনার আমদানিতে মূলত তিন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রথমত, প্রকৃত পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের অন্য এইচএস কোডে পণ্য ঘোষণা করা। দ্বিতীয়ত, আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে শুল্কায়ন মূল্য কমানো। তৃতীয়ত, স্থলসীমান্তসহ বিভিন্ন পথে শুল্ক না দিয়েই পণ্য দেশে প্রবেশ করানো। এর বাইরে এক ধরনের ফাসেনারকে অন্য ধরনের পণ্য হিসেবে ঘোষণা করার অভিযোগও রয়েছে। দেশে ফাসেনার উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপনে জমি, ভবন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডাই-মোল্ড, কাঁচামাল, বিদ্যুৎ ও গ্যাস, দক্ষ জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। দেশীয় কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এসব খাতে বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান নাট, বোল্ট, স্ক্রু ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। কিন্তু উৎপাদকদের অভিযোগ, কর ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা পণ্য বাজারে অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি হওয়ায় দেশীয় কারখানার উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ পাচ্ছে না। তাঁদের আশঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। এতে শুধু ফাসেনার শিল্প নয়, দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে। ফাসেনার উৎপাদনের সঙ্গে শুধু বড় কারখানার কর্মীরা যুক্ত নন। কাঁচামাল সরবরাহ, ডাই-মোল্ড তৈরি, মেশিনিং, হিট ট্রিটমেন্ট, সারফেস ফিনিশিং, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিপণন ও খুচরা বিক্রিসহ একটি দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থা এ শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয় উৎপাদন সংকুচিত হলে এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও পড়বে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাত ও সংশ্লিষ্ট লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কার্যক্রমের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা যুক্ত। তাঁদের মতে, অবৈধ আমদানির কারণে কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নতুন দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগও সংকুচিত হবে। ফাসেনার দেখতে ছোট পণ্য হলেও ভবন, সেতু, শিল্পযন্ত্র, যানবাহন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও বিভিন্ন প্রকৌশল কাঠামোয় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি নাট বা বোল্টের মান নির্ধারিত মানের নিচে হলে পুরো যন্ত্র বা কাঠামোর নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দেশীয় উৎপাদকদের অভিযোগ, চোরাই বা অনিয়মিত পথে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় উৎপাদক, গ্রেড, উপাদানের মান, টেনসাইল স্ট্রেংথ কিংবা অন্যান্য কারিগরি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। ফলে অবৈধ আমদানি শুধু রাজস্ব বা শিল্পনীতির বিষয় নয়; নিম্নমানের পণ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হলে তা জননিরাপত্তার প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। স্থানীয় উৎপাদক ও বৈধ আমদানিকারকদের দাবি, সমস্যার সমাধানে শুধু সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করলেই হবে না। আমদানি পর্যায়ে পণ্যের এইচএস কোড, ঘোষিত মূল্য, পরিমাণ, ওজন এবং প্রকৃত পণ্যের সঙ্গে ঘোষণার সামঞ্জস্যও কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে সন্দেহজনক চালানে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা, একই ধরনের পণ্যের ঘোষিত মূল্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য আছে কি না তা যাচাই, আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ এবং বারবার ভুল ঘোষণা দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ আমদানিকারক হিসেবে নজরদারিতে আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে স্থল ও সমুদ্রবন্দরে কাস্টমসের নজরদারি বাড়ানো, সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধ, মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় জরিমানার পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে যখন আমদানিবিকল্প শিল্প গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে রপ্তানিমুখী করার কথা বলা হচ্ছে, তখন শুল্ক ফাঁকি দিয়ে একই পণ্য আমদানির সুযোগ থেকে গেলে স্থানীয় বিনিয়োগ সুরক্ষিত হবে না। তাঁদের বক্তব্য, বৈধ আমদানি বন্ধ করা সমাধান নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত একই বাজারে দেশীয় উৎপাদক, বৈধ আমদানিকারক ও বিদেশি পণ্যের জন্য সমান ও আইনসম্মত প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>