রাত তখন ১১টা। ল্যাপটপ বন্ধ করতে গিয়েই ইমনের মনে পড়ল, কাল সকালের ফ্লাইটের জন্য এখনো পার্কিং স্পট বুক করা হয়নি। সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে আবার খুঁজতে ইচ্ছা করছিল না—একটার পর একটা ওয়েবসাইট খোলা, দাম তুলনা করা, ফরম পূরণ করা, তারপর পেমেন্ট। ওহ্! বিরক্ত হয়ে ব্রাউজারের পাশে থাকা এআই সাইড প্যানেলে শুধু লিখল, ‘কাল সকালের জন্য বিমানবন্দরের কাছে একটা পার্কিং স্পট বুক করে দাও।’ ব্যস, এটুকুই। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই কনফার্মেশন চলে এল ই–মেইলে। তারিখ, সময় ও স্লট নম্বর—সব ঠিকঠাক। ইমন নিজেও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারল না, কে আসলে কাজটা করল। সে নিজে, নাকি ল্যাপটপের ভেতরে বসে থাকা একটা অদৃশ্য ‘কর্মী’?
এটাই ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—এজেন্টিক এআই বা স্বয়ংক্রিয় কার্যসম্পাদনকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এজেন্ট। এত দিন আমরা চ্যাটবটকে প্রশ্ন করতাম, সে উত্তর দিত—ব্যস, এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল সম্পর্ক। কিন্তু এজেন্ট একেবারে আলাদা। সে শুধু বলে না, সে করেও। ওয়েবসাইটে ঢোকে, ফরম পূরণ করে, একাধিক পেজ ঘুরে দাম তুলনা করে, বুকিং কনফার্ম করে, এমনকি প্রয়োজনে আপনার অনুমতি নিয়ে আপনার ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকাও খরচ করে ফেলে। গুগল ক্রোম ব্রাউজারে সম্প্রতি যোগ হওয়া ‘অটো–ব্রাউজ’ সুবিধার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। জেমিনাই–৩ মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সুবিধা এখন ডেস্কটপ ও অ্যান্ড্রয়েড—দুই জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু গুগল নয়, ওপেনএআইয়ের অ্যাটলাস, পারপ্লেক্সিটির কমেট—সবাই একই দৌড়ে নেমেছে, ব্রাউজারকে বানিয়ে ফেলছে ‘কাজ করে দেওয়া’ এক সহকারীতে।
কীভাবে কাজ করছে এই প্রযুক্তি
চ্যাটবট ও এজেন্টের পার্থক্য মূলত ধৈর্য ও স্বাধীনতায়। চ্যাটবট একটা প্রশ্নের একটা উত্তর দিয়েই থেমে যায়, পরের পদক্ষেপটা আপনাকেই নিতে হয়। এজেন্ট এখানে অন্য রকম। সে একটা লক্ষ্য ধরে এগিয়ে যায়, একের পর এক ধাপ নিজে থেকেই ঠিক করে, দরকার হলে আরেকটা ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখে, তথ্য যাচাই করে আবার ফিরে আসে, ফলাফল বিশ্লেষণ করে। ফ্লাইট খোঁজা, পুরোনো কেনা জিনিস আবার অর্ডার করা, একাধিক তারিখে হোটেলের দাম মিলিয়ে দেখা, এমনকি ক্যালেন্ডার–জিমেইল–ম্যাপস একসঙ্গে মিলিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা—এসব কাজ এখন কয়েক সেকেন্ডেই সেরে ফেলছে এআই, যেখানে মানুষের লাগত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
ব্যাপারটা অনেকটা এমন, যেন আপনার একজন ব্যক্তিগত সহকারী আছে, যে কখনো ক্লান্ত হয় না, কখনো ছুটি চায় না, কখনো বেতন চায় না! শুনতে দারুণ লাগছে, তাই না?
কিন্তু ঝুঁকিটা ঠিক কোথায়
কিন্তু সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে বিপদ। এজেন্ট যখন নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তখন ভুল সিদ্ধান্তও নিজে থেকেই নিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে। ভুল আকারে পণ্য অর্ডার, ভুল তারিখে বুকিং, এমনকি স্পর্শকাতর তথ্য অজান্তেই কোনো অপরিচিত সাইটে জমা করে দেওয়া। যেসব সাইট নকল বা প্রতারণামূলক, এজেন্ট সব সময় সেটা ধরতে পারে না। কারণ, সে–ও তো শেখে প্যাটার্ন দেখে, মানুষের মতো সন্দেহ করার অভ্যাস তার নেই।
আর সবচেয়ে বড় কথা, ‘মানুষের অনুমতি’ নেওয়ার ধাপটা যদি দুর্বল হয়, তাহলে টাকা খরচের সিদ্ধান্তও চলে যেতে পারে হাতের বাইরে। ভাবুন তো, একটা এজেন্ট যদি ভুল বোঝে যে আপনি ‘সবচেয়ে সস্তা টিকিট’ বলতে কী বুঝিয়েছেন, আর নিজে থেকেই একটা ভুল ফ্লাইট বুক করে ফেলে—টাকা ফেরত পাওয়া কি অতটাই সহজ হবে? প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা তাই বারবার সতর্ক করছেন, স্বয়ংক্রিয়তা যত বাড়বে, মানুষের তদারকির প্রয়োজনও ততই বাড়বে, কমবে না।
তাহলে ব্যবহার করবেন কীভাবে
১. প্রথমে ছোট ও কম ঝুঁকির কাজ দিয়ে শুরু করুন, যেমন দাম তুলনা বা তথ্য খোঁজা, সরাসরি টাকা লেনদেন কোনোভাবেই নয়।
২. প্রতিটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এজেন্ট কী করতে যাচ্ছে, তা নিজে একবার চোখ বুলিয়ে দেখুন—‘কনফার্ম’ করার আগে দুই সেকেন্ড থামুন, ভাবুন, তারপর এগিয়ে যান।
৩. অ্যাকাউন্টের অনুমতি বা পারমিশন নিয়মিত চেক করুন, কোন সাইটে এজেন্ট ঢুকতে পারছে, সেটা সীমিত রাখুন।
৪. স্পর্শকাতর তথ্য বা পেমেন্ট–সংক্রান্ত কাজে এজেন্টকে পুরোপুরি স্বাধীনতা না দিয়ে ‘অনুমোদন চেয়ে নেওয়ার’ মোডেই রাখুন।
তো, ফিরে আসি গল্পে। পরদিন সকালে ইমন যখন পার্কিংয়ে গাড়ি রাখল, ঠিক সেই জায়গাতেই জায়গা খালি পেল যেটা এআই বলেছিল। ভালো লাগলেও একটা প্রশ্ন মনে খচখচ করছিল। আজ পার্কিং। কাল হয়তো টিকিট। পরশু হয়তো পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনা। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাসটাই কি তাহলে আস্তে আস্তে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে?
আসলে প্রশ্নটা এজেন্টের নয়। প্রশ্নটা হলো, আমরা কতটুকু নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখছি, আর কতটুকু ছেড়ে দিচ্ছি একটা অদৃশ্য কোডের হাতে। এজেন্টিক এআই সহকারী হয়ে থাকবে, নাকি একসময় নিজেই চালকের আসনে বসে পড়বে—সেই সীমারেখা আসলে আমরাই টেনে দিচ্ছি, প্রতিদিন, প্রতিটা ‘অনুমতি দিন’ বাটনে চাপ দিয়ে।
লেখক: টেক ব্লগার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও কপিরাইটার
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>