সংসারে টানাপোড়েন থেকে কিছু একটা করার চেষ্টা। মনস্থির করলেন কাঠের ঘানিতে খাঁটি শর্ষের তেল উৎপাদন করবেন। সংকল্প ছিল তেল রাখবেন ভেজালমুক্ত। কেটে গেছে ৪৫ বছর। সেই প্রতিজ্ঞায় এখনো অনড় প্রত্যন্ত গ্রামের এক ‘সরল মানুষ’ মো. লস্কর আলী (৭১)। ঘানির তেলে তাঁর সংসারে এসেছে সচ্ছলতা, নিজেও পেয়েছেন সম্মাননা।
লস্কর আলীর বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণতলা গ্রামে। জেলা সদর থেকে গ্রামটির দূরত্ব ১৯ কিলোমিটার। একেবারে সীমান্তঘেঁষা। সবুজ–শ্যামল গ্রামের মানুষ খাঁটি শর্ষের তেলের জন্য লস্কর আলীকে যেমন চেনেন, তেমনি তাঁর এই ভেজালমুক্ত তেলের খবর জানেন শহরের মানুষও।
বহুদিন ধরে গ্রাম–শহরে লস্কর আলী খাঁটি শর্ষের তেল বিক্রি করেন। লস্কর আলীর জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ঘানি ঘরে। বয়স হয়েছে, ২৯ বছরের দফাদারের চাকরি ছেড়েছেন। তবে ঘানিতে তেল উৎপাদনের কাজ ছাড়েননি। একমাত্র ছেলে হেলাল মিয়া (৩২) এখন তাঁর সঙ্গে সময় দেন। বাপ–ছেলে মিলেই জারি রেখেছেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের ঘোড়ার ঘানিতে খাঁটি শর্ষের তেল ভাঙানোর ব্যবসা।
লস্কর আলীর বাপ–দাদার পেশা মূলত কৃষি। স্বাধীনতার পরপর নরসিংদী থেকে তাঁরা সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় এসে বসতি গড়েন। তখন লস্কর আলীর বয়স ১৪ বছর। ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন। কনে একই গ্রামের ফুলজান বিবি। ফুলজানদের বাড়িতে ঘানিতে শর্ষের তেল ভাঙানোর কাজ হতো। ঘোড়া নয়, গরু দিয়ে টানা হতো ঘানি। কখনো মানুষেরাও ঘানি টানতেন।
বিয়ের বছরই সংসারে অভাব দেখা দেয়। কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না লস্কর আলী। টানাপোড়েনের টানে অনেকটা দিশাহারা তিনি। স্বামীর এই হতাশা দেখে একদিন ফুলজান বিবি পরামর্শ দেন ঘানিতে তেল ভাঙানোর কাজ শুরু করার। কিন্তু লস্কর তো এই কাজ জানেন না। তবে ফুলজান বিবি পারেন। এরপর দুজনে মিলে শুরু করেন।
ওই সময় গ্রামের আরও কিছু জায়গায় এভাবে শর্ষের তেল ভাঙানো হতো। তবে তেলে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ ছিল কারও কারও বিরুদ্ধে। তাই ফুলজান বিবির এক কথা, তাঁরা তেলে ভেজাল দেবেন না। ব্যবসায়ে সততা ধরে রাখবেন। এরপর স্বামী–স্ত্রী মিলে কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন।
শর্ষের আবাদ, কাটা–মাড়াই, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করা—সবই স্বামী–স্ত্রী দুজনে মিলে করেন। ঘানি ঘরে দিনরাত পরিশ্রম করেন লস্কর আলী ও ফুলজান বিবি। বাজার ঘুরে ঘুরে তেল বিক্রি করতেন লস্কর আলী। এভাবে চলতে থাকে। এখনো চলছে। এখন অবশ্য বাজারে যেতে হয় না। অনেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যান। আবার জেলা সদরে যাঁরা নিয়মিত ক্রেতা, তাঁদের তেল নিজেই পৌঁছে দেন লস্কর আলী।

গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় লস্কর আলীর বাড়িতে। ১৫ আগস্ট বিকেলে ওই বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটি গাছগাছালিতে ভরা। ৭৫ শতকের বাড়ির চারপাশ ঘিরে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, জাম্বুরা, কামরাঙাসহ কত ফলের গাছ। উঠানের পূর্ব দিকে আধা পাকা বসতঘর। পশ্চিমে ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থের বাঁশের খুঁটির ওপর টিনের চালার আরেকটি ঘর। এটিই ঘানি ঘর।
ঘরের ভেতর কাঠের ঘানি কাঁধে নিয়ে একটি ঘোড়া ঘুরছিল। কাঠের তক্তার ওপর বসে ছিলেন লস্কর আলীর ছেলে হেলাল মিয়া। ঘোড়ার চোখ বিশেষভাবে ঢেকে দেওয়া। ঘুরছে সেটি। মাঝখানে গাছের গুঁড়ির গর্তে শর্ষে দেওয়া আছে। ঘানি ঘুরতে থাকায় এখানে চাপ সৃষ্টি হয়ে নিচ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা শর্ষের তেল পড়ছে।
সাদা পাঞ্জাবি গায়ে দিতে দিতে মূল ঘর থেকে এগিয়ে আসেন লস্কর আলী। ঘানিতে দেওয়া শর্ষে নাড়তে নাড়তে বলেন, ‘সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আর বেশি সময় থাকব না। সন্ধ্যার আগেই আমরা কাজ শেষ করি।’ তিনি জানালেন, দুই বেলা ঘানিতে তেল ভাঙান তাঁরা। দুবারে ১০ কেজি শর্ষে দিয়ে ছয় কেজি তেল হয়। সকাল ৭টা থেকে ১০টা এবং বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। এই তেল পরে ছেঁকে পরিষ্কার করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়। প্রতি কেজি তেল বিক্রি করেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
লস্কর আলী জানালেন, নিজে কিছু জমিতে শর্ষের আবাদ করেন। আবার বিভিন্ন এলাকা থেকেও শর্ষে কিনে আনেন তিনি। বছরে তিনি তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার শর্ষে কিনে রাখেন। সুনামগঞ্জের ছাতক ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থেকে শর্ষে কিনে আনেন। এখন প্রতি কেজি শর্ষে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় কিনতে হয়। এই শর্ষে তিনি সারা বছর ঘানিতে ভাঙান। লস্কর আলী বলছিলেন, ‘এইটাতে পুঁজি, পরিশ্রম আর ধৈর্য লাগে। কঠিন কাম। ঘানিতে ঘোড়ার সঙ্গে একটা মানুষকে তিন ঘণ্টা সময় দিতে হয়।’
ঘানির তেলের ব্যবসায়ে ভর করে এক সময় সংসারে সচ্ছলতা আসে। এরপর ঘর করেছেন। জমিজমা কিনেছেন। চার মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছেন। পাশাপাশি কৃষিকাজও করেন লস্কর আলী। দীর্ঘ ২৯ বছর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) দফাদার হিসেবে কাজ করেছেন। গত বছর এই কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন।
তবে উন্নতির পেছনে ঘানিতে ভাঙানো খাঁটি শর্ষের তেলের ব্যবসা বলে জানান লস্কর আলী। এখনো মাসে সব খরচ বাদে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। জমির যা ধান পান, সেগুলো বিক্রি করে শর্ষে কিনেন। এ ছাড়া আবাদ করেন বাদাম ও আলু।
এসবের পেছনে যিনি মূল প্রেরণা ছিলেন, সেই ফুলজান বিবি মারা যান ২০১৯ সালে। আলাপে লস্কর আলী জানান, তাঁর কোনো দুঃখ নেই। জীবনে কারও কোনো ক্ষতি করেননি। কাউকে ঠকাননি। তবে ফুলজান বিবিকে খুব মনে পড়ে। ‘মানুষটায় (ফুলজান বিবি) কইত, কাউরে ঠকাইতাম না। আমরা তেলও ভেজাল দিতাম না। সত্যে বরকত আছে। এই কথাটা আমার মনও এখনো গাঁথি আছে...’, কথাগুলো বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন লস্কর আলী।
কথা বলার ফাঁকেই আসেন গ্রামের বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস (৪৫)। তিনি বলেন, ‘এলাকার সবাই লস্কর চাচার খাঁটি শর্ষের তেলের কথা জানে। আমরাও মাঝেমধ্যে কিনে নিই। সহজ–সরল মানুষ। তাঁর ভেতরে কোনো প্যাঁচ নেই।’ গ্রামের আরেক বাসিন্দা আবদুস সালাম বলছিলেন, ইচ্ছা করলে এই শর্ষের সঙ্গে তিল মেশানো যায়। এটি বোঝা যাবে না। কিন্তু এটি তিনি কখনোই করেননি।
বাড়ির সামনের কাঁচা সড়কের উত্তর পাশে মোহাম্মদ মুসা মিয়ার (৫০) মুদিদোকান। বাড়ি থেকে বের হয়ে দোকানে ঢুকে জানতে চাই লস্কর আলীর ঘানিতে ভাঙানো তেল নেওয়া যায় কি না। মুসা মিয়া বলেন, ‘চোখ বুইজ্জা নিতা পারইন। ই–বেটার (লস্কর আলী) তেলে কোনো দুই নম্বরি নাই। টাউনের মাইনষেও নেয়।’
সুনামগঞ্জ শিল্প বণিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ জুয়েল মিয়া জানান, তিনি বেশ কয়েক বছর ধরেই লস্কর আলীর কাছ থেকে শর্ষের তেল নেন। শহরে তাঁর নিয়মিত গ্রাহক আছেন।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সমাজ উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখায় বিভিন্ন খাতে ছয় উদ্যোক্তাকে সম্মাননা জানানো হয়। এর মধ্যে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পদ্ধতিতে খাঁটি শর্ষের তেল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে অবদানের জন্য সম্মাননা পান লস্কর আলী।
অনুষ্ঠানে লস্কর আলীর হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননার অর্থ তুলে দেওয়া হয়। সম্মাননা হাতে নিয়ে কথা বলার সময় ব্যবসায়ে সততার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা হিসেবে স্ত্রী ফুলজান বিবিকে স্মরণ করেন তিনি।
ওই অনুষ্ঠানে তৎকালীন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা জেরিন বলেন, জীবনে সফলতা কোনো এক দিনের অর্জন নয়। দীর্ঘদিনের সততা, নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমেই আসে। গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে লস্কর আলী নিজ কর্মক্ষেত্রে যে দায়িত্বশীলতা ও সততার পরিচয় দিচ্ছেন, সেটি সমাজে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এবং নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>