বিজ্ঞাপন
মাত্র ৩৮ বছর বয়সে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে আফ্রিকার অন্যতম আলোচিত নেতা হয়ে উঠেছেন ইব্রাহিম ট্রাওরে। সমর্থকদের কাছে তিনি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্তি এবং আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক। তবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তার নেতৃত্বকে ঘিরে বাড়ছে নানা প্রশ্নও।
বুরকিনা ফাসোয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংকোচন এবং গণতন্ত্রে ফেরার অনিশ্চয়তা এখন ট্রাওরের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাওরে কেন এত জনপ্রিয়?
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতা দখল করেন ইব্রাহিম ট্রাওরে। ক্ষমতায় এসেই তিনি ফরাসি সেনাদের দেশ ছাড়তে বলেন।
আরও পড়ুন
ইব্রাহিম ট্রাওরে কেন আলাদা: বুরকিনা ফাসোর তরুণ নেতার গল্প
এরপর রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করেন এ সামরিক নেতা। স্থানীয় শিল্প, কৃষি ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন। তার বক্তৃতায় প্রায়ই উঠে আসে বুরকিনা ফাসোর সাবেক বিপ্লবী নেতা টমাস সানকারার নাম।
সমর্থকদের দাবি, ট্রাওরে দেশের মর্যাদা ফিরিয়ে এনেছেন এবং বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে যে অসন্তোষ রয়েছে, ট্রাওরে সেই মনোভাবকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পেরেছেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি কি বদলেছে?
ট্রাওরে ক্ষমতায় এসেছিলেন নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। বুরকিনা ফাসো প্রায় এক দশক ধরে আল-কায়েদা ও আইএস-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় বিপর্যস্ত।
সরকারের দাবি, সামরিক অভিযান জোরদার হওয়ায় বেশ কয়েকটি এলাকা আবারও সরকারের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
তবে স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। দেশজুড়ে হামলা অব্যাহত রয়েছে। ২০ লাখের বেশি মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত। মানবিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে লাখো মানুষের।
আরও পড়ুন
ইকোয়াস থেকে সাহেল এক্সিট / ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলো বুরকিনা ফাসো
এ ছাড়া সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সাংবাদিক ও মানবিক সংস্থার প্রবেশ সীমিত হওয়ায় সরকারি দাবির স্বাধীন যাচাইও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইব্রাহিম ট্রাওরে/ ছবি: এক্স@CapitaineIb226
গণতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক
সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় এ বছরের এপ্রিলে ট্রাওরে দেশবাসীকে ‘গণতন্ত্র ভুলে যেতে’ বললে। তার ভাষ্য, বুরকিনা ফাসো এখন গণতান্ত্রিক নয়, বরং একটি ‘বিপ্লবী’ পর্যায়ে রয়েছে।
এর আগে সামরিক সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। বিলুপ্ত করা হয় রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে বেসামরিক শাসনে ফেরার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের ওপর বিধিনিষেধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।
ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গেও বাড়ছে টানাপোড়েন
সম্প্রতি ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন প্রণয়নের পর কয়েকজন সুন্নি আলেমকে গ্রেফতার করেছে বুরকিনা ফাসো প্রশাসন। এরপর ট্রাওরে ধর্মীয় উগ্রবাদ মোকাবিলায় নতুন লড়াই শুরুর ঘোষণা দেন।
আরও পড়ুন
বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ট্রাওরেকে হত্যার ষড়যন্ত্র নস্যাৎ
সমালোচকদের মতে, এতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যদিও সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জনপ্রিয়তা আর বাস্তবতার ফারাক
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাওরের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সার্বভৌমত্ব ও আত্মনির্ভরশীলতার বার্তাকে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করা। তিনি খুব অল্প সময়ে আফ্রিকার অন্যতম পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
তবে তার সরকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর।
রাজধানী ওয়াগাদুগুর এক যুবনেতার কথায়, ‘পশ্চিমা বিশ্বের সামনে মাথা নত না করা একজন নেতাকে দেখে আমরা গর্বিত। কিন্তু শুধু গর্ব দিয়ে পরিবার চলে না, গ্রামও নিরাপদ হয় না। আমরা চাই, ক্যাপ্টেন ট্রাওরে শুধু শক্তির প্রতীক নন, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারেরও প্রতীক হয়ে উঠুন।’
সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/
বিজ্ঞাপন