আল্পস পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মঁ ব্লাঁ। এই পর্বত ঘিরে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটা দৌড়ের আয়োজন করে আলট্রা-ট্রেইল দ্যু মঁ ব্লাঁ (ইউটিএমবি)। ফ্রান্সের শামোনি থেকে শুরু হয়ে ইতালি ও সুইজারল্যান্ড ছুঁয়ে আবার শামোনিতে এসে শেষ হয় এই দৌড়। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই আলট্রাম্যারাথনই সফলভাবে শেষ করেছেন পার্থ সাহা। বাংলাদেশি এই দৌড়বিদের কাছ থেকে সেই অভিজ্ঞতাই শুনলেন সজীব মিয়া
নির্ঘুম দ্বিতীয় রাত শেষে সকাল হলো। সূর্য উঠেছে। পরপর দুটি দীর্ঘ চড়াই শেষ করলাম। রেসের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার শেষ। সামনে দৌড়ের চেকপয়েন্ট ভ্যালোরসিন। ঠান্ডা-জ্বর, ক্লান্তি আর ঘুমে চেকপয়েন্টের তিন-চার কিলোমিটার আগে থেকে আর পা চলছিল না। অগত্যা পাহাড়ের ধারে বসে পড়লাম।
বসার সঙ্গে সঙ্গেই বিভ্রমের মতো হলো। পরের প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা কী করেছি, অনেকটাই মনে নেই। খালি মনে আছে, আমার পেছন দিয়ে একের পর এক দৌড়বিদ চলে যাচ্ছিলেন। দৌড়াতে দৌড়াতে যাঁদের সঙ্গে চোখের পরিচয় হয়েছিল, যাঁদের আগে পেছনে ফেলেছিলাম, তাঁরা এখন আমাকে দেখে থামছিলেন। আমি অসুস্থ কি না, জিজ্ঞেস করছিলেন কেউ। কেউ তাঁদের সঙ্গে যেতে বলছিলেন।
আমি কখনো বলছিলাম, ‘আমার রেস শেষ।’ কখনো বলছিলাম, ‘বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি।’
এভাবে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত লাগছিল। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। একসময় দৌড়ের পোল দুটো নিয়ে নিচে জঙ্গলের ঢালে ফেলে দিয়ে এলাম। তারপর জঙ্গলের ভেতরে সাপের মতো কিছু একটা দেখে সেটি খুঁজতে লাগলাম। পরে আবার উঠে এসে দুই হাতের ওপর কপাল রেখে বসে পড়লাম। হয়তো এক মিনিটের মতো ঘুমিয়েও পড়েছিলাম।

জাগতেই হঠাৎ মাথাটা আবার কাজ করতে শুরু করল। বেলা সোয়া ১১টার মধ্যে ভ্যালোরসিন পৌঁছাতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই। সংশয় কাটিয়ে নামতে শুরু করলাম। কীভাবে শেষ করলাম, জানি না। শুধু জানি, সময়সীমার মাত্র ছয় মিনিট আগে পৌঁছালাম।
চেকপয়েন্টে কোনোরকমে পানির বোতল ভরলাম। স্বেচ্ছাসেবকেরা তখন চেকপয়েন্ট বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একজন বললেন, ‘কিছু খাবার আছে, তুমি নাও।’
একটা কলা নিলাম। এক কামড় দিয়ে ফেলে দিলাম। পরের চেকপয়েন্টের দিকে ছুটলাম।
দৌড়াতে দৌড়াতে মনে হচ্ছিল, গত কয়েক মাসের প্রতিমুহূর্ত সঙ্গে নিয়ে আসছি। সমতলের মানুষ আমরা। পর্বতে অভ্যস্ত নই। এর মধ্যে আলট্রাম্যারাথনের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ! ক্লান্ত শরীরে তখন শুধু ভাবছিলাম, কী দরকার ছিল এসবের।

কলেজে পড়ার সময় থেকেই সাইক্লিং করতাম। এরপর ম্যারাথনে আগ্রহ। ২০১৮ সালে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করার পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পে চাকরি করি। বাসার কাছেই মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন। সকালে সেখানে অনুশীলন করতাম।
ভারতের লাদাখ ম্যারাথন দিয়ে শুরু।
ধীরে ধীরে আলট্রাম্যারাথনের দিকে ঝোঁক বাড়ে। অংশ নিই লাদাখ সিল্ক রুট আলট্রা, খারদুংলা লা চ্যালেঞ্জ ও দার্জিলিংয়ের বুদ্ধা ট্রেইল আলট্রায়।
এরপর শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ইউটিএমবির যোগ্যতা অর্জনের প্রস্তুতি। এ জন্য ২০২৪ সাল থেকে ইউটিএমবি আয়োজিত ও স্বীকৃত অতি দীর্ঘ দূরত্বের বিভিন্ন দৌড়ে অংশ নিই। একে একে দৌড়াই নেপালের ১০০ কিলোমিটার ফিশটেইল আলট্রা, থাইল্যান্ডের চিয়াং দাও ইউটিএমবি ওয়ার্ল্ড সিরিজ এশিয়া মেজর, নেপালের মঞ্জুশ্রী ট্রেইল রেস ও জাপানের কাগা স্পা ট্রেইলে।
যোগ্যতা অর্জন করলেই হয় না। এত আবেদনকারী থাকে যে ইউটিএমবি ফাইনালের জন্য লটারি হয়। এবার সেখানেও নাম ওঠে। এরপরই শুরু হলো মূল চ্যালেঞ্জ—অংশগ্রহণ ও যাতায়াতের খরচ জোগাড়।
প্রকল্পের চাকরি ছেড়ে কয়েক বছর ধরে নিজের আগ্রহের কাজটিকেই পেশা করে নিয়েছি। স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং ট্রেইনার হিসেবে কাজ করি। যা আয়, তা দিয়ে নিজের চলে যায়। কিন্তু ইউরোপের এত বড় একটি দৌড়ের আয়োজনে অংশ নিতে যাওয়া সহজ নয়। এবার শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় ইউটিএমবির নিবন্ধন সম্পন্ন করি। এরপর আমার পাশে দাঁড়ায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক।
এতেও বাধা ফুরায় না। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের সুপারিশপত্র থাকার পরও প্রথমবার ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলো। অনিশ্চয়তা নিয়ে দ্বিতীয়বার আবেদন করি। শেষ পর্যন্ত ভিসা পেলাম।
এত ধকল সামলে দৌড় শুরুর মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে মঁ ব্লাঁ ভিলেজে পৌঁছাই। নতুন আবহাওয়া কিংবা উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পেলাম না।
২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় স্টার্টিং লাইনে গিয়ে দাঁড়াই। তখনো হালকা বৃষ্টি। প্রচণ্ড ঠান্ডা। সামনে আড়াই হাজারের বেশি রানার। চারপাশে হাজার হাজার দর্শক ও সমর্থকের গর্জন। সেই বিশাল ভিড়ের মধ্যে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।

দুই দিন দুই রাত দৌড়াচ্ছি। রাতভর মাথায় লাইট নিয়ে দৌড়ানো, ঠান্ডা আর অতি উচ্চতায় পথ পাড়ি দেওয়া সহজ নয়।
সূর্য তখন মাথার ওপর। প্রচণ্ড রোদে শরীরের ব্যথাগুলো আরও বেশি টের পাচ্ছিলাম। তারপরও কোনোভাবে সামনে এগোচ্ছিলাম। জানতাম, এই অংশ পার হয়ে চেকপয়েন্টে পৌঁছাতে পারলে ফিনিশ লাইন আর মাত্র সাত কিলোমিটার।
কোনোরকমে চেকপয়েন্টে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে মাথা ঘুরছিল। মনে হচ্ছিল, পড়ে যাব।
চিকিৎসাসহায়তা চাইলাম। তাঁরা রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা, অক্সিজেনের মাত্রা ও রক্তের শর্করা মাপলেন। দেখা গেল, রক্তে শর্করা কমে গেছে। তাঁরা আমাকে বললেন, খেয়ে নিতে পারলে ফিনিশ পর্যন্ত যেতে পারব।
হালকা কিছু খেলাম। তারপর আবার দৌড় শুরু করলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর ধীরে ধীরে শরীর আবার আগের ছন্দে ফিরতে শুরু করল। স্বাভাবিক হলো পায়ের গতি।
দূর থেকে দেখতে পেলাম শামোনির ফিনিশ লাইন। লাল-সবুজ পতাকাটা বের করে নিলাম। দুই হাতে কোথা থেকে যেন আবার শক্তি ফিরে এল। পতাকাটা উঁচিয়ে ধরলাম। মনের ভেতর বেজে উঠল ‘আমার সোনার বাংলা’। ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে ৪৫ ঘণ্টা ২২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>