জাতীয়

ইসলামে স্বাস্থ্যসেবার মূলনীতি ও আধুনিক স্বাস্থ্যবিধি

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের যাবতীয় কাজ দুই ভাগে বিভক্ত—তাশরিয়িয়াত ও তাকবিনিয়াত। তাশরিয়িয়াত হলো বিধিবিধান–সংক্রান্ত বিষয়াবলি। যেমন ইমান, নামাজ, জাকাত, হজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত এবং বিয়েশাদি, হুদুদ, কিসাস ও উত্তরাধিকার ইত্যাদি।

শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান আল্লাহ–তাআলা নবীজি (সা.)-কে দান করেছেন। এতে আর বৃদ্ধির কোনো সুযোগ বা সম্ভাবনা নেই। তাকবিনিয়াত হলো প্রাকৃতিক বিষয়াবলি। যেমন কৃষি ও চিকিৎসা ইত্যাদি। এসব বিষয়ে মানুষের জ্ঞান পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকবে। কোরআন মাজিদে রয়েছে, ‘আল্লাহ এমন কিছু সৃষ্টি করবেন, যা তোমরা জানো না।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৮) 

প্রিয় নবীজি (সা.) তাশরিয়িয়াত বিষয়ে যা যা নির্দেশ দিয়েছেন, তা মান্য করা শরিয়তের বিধান তথা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব ইত্যাদি। তিনি তাকবিনিয়াত বা প্রাকৃতিক বিষয়ে যা যা বলেছেন, তা বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা সাপেক্ষে যৌক্তিকভাবে গ্রহণ করা যাবে। যেমন মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখলেন, সাহাবায়ে কিরাম খেজুরগাছের কৃত্রিম পরাগায়ন করছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তা নিষেধ করলেন। ফলে সে বছর খেজুরের উৎপাদন অনেক কম হলো। তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘তোমরা তোমাদের নিজেদের মতো খেজুরগাছের কৃত্রিম পরাগায়ন করো, কারণ দুনিয়াবি বিষয়ে তোমরা আমার চেয়ে ভালো জানো।’ (মুসলিম: ২৩৬১, ইবনে মাজাহ: ২৪৭০, মুসনাদে আহমাদ: ১৩৯৮) 

‘নবীজি (সা.) ওহুদের যুদ্ধে আহত হলে হজরত ফাতিমা (রা.) তাঁকে ছাই দিয়ে পট্টি (ব্যান্ডেজ) করে দিয়েছিলেন।’ (বুখারি: ২৯১১, ৩০৩৭, ৪০৭৫; মুসলিম: ১৭৯০)। এটি ছিল তৎকালীন প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থা; শরিয়তের বিধান নয়। অনুরূপভাবে শিঙা লাগানো বা হিজামা (কাপিং) করাও প্রাচীনকালের প্রচলিত একটি চিকিৎসাপদ্ধতি। এটি শরিয়তের বিধান নয়। সুতরাং বর্তমান সময়ে ছাই দিয়ে পট্টি (ব্যান্ডেজ) করা বা শিঙা লাগানো (হিজামা করা) সুন্নত বা ইবাদত নয়; বরং এর বিকল্প হিসেবে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি। (বুখারি: ৫৬৮০) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্বাস্থ্যসচেতন ছিলেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হলো পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। প্রধান ইবাদত সালাত বা নামাজের জন্য পবিত্রতা প্রথম ও প্রধান শর্ত। আমরা নামাজের জন্য মসজিদগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি রাখি। যেহেতু আমরা বাড়িতে বা ঘরেও নামাজ আদায় করে থাকি, তাই আমাদের ঘরদোরও পরিষ্কার ও পবিত্র রাখি। সর্বোপরি পুরো দুনিয়াটা আখেরি নবীর উম্মতের জন্য বৃহৎ মসজিদরূপে পরিগণিত। তাই আমরা আমাদের আঙিনা, আশপাশ, রাস্তাঘাট ও পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখি। অজু করতে হলে পানির পবিত্রতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হয়। নোংরা ও অপবিত্র পানি দিয়ে অজু শুদ্ধ হয় না। তাই পানি দূষণমুক্ত রাখতে হবে। 

অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা মহান আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি। তবে একটি রোগ আছে, যার কোনো প্রতিষেধক নেই; তা হলো বার্ধক্য।’ (আবুদাউদ) 

অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করা ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ–তাআলা রোগ দেন, রোগের প্রতিষেধকও নাজিল করেন। প্রতিটি রোগের চিকিৎসা রয়েছে।’ (জাদুল মাআদ)। সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা বা ভ্যাকসিন অন্যতম কার্যকর একটি পদ্ধতি। বিশ্বের আলেম-ওলামারা টিকা গ্রহণে সম্মতি ও উৎসাহব্যঞ্জক পরামর্শ দিয়েছেন। দেশের বিশিষ্ট আলেমরা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে স্বাস্থ্যবিধি মানার ও টিকা নেওয়ার পরামর্শ ও উপদেশ দিচ্ছেন। সৌদি সরকার হজ গমনেচ্ছুদের জন্য টিকা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে। 

মাকাসিদুশ শরিয়াহ তথা ইসলামি শরিয়াহর মৌলিক উদ্দেশ্যাবলি পাঁচটি—জীবন সুরক্ষা, সম্পদ সুরক্ষা, জ্ঞান সুরক্ষা, বংশগতি সুরক্ষা ও ধর্ম সুরক্ষা। প্রিয় নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমার শরীরেরও হক বা পাওনা রয়েছে তোমার ওপর।’ (মুসলিম ও তিরমিজি)

শরীরের হক হলো স্বাস্থ্য সুরক্ষা। এ জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা। আমরা নিজেদের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে, দেশ-জাতি ও জনগণের স্বার্থে ইবাদত ও কর্তব্য হিসেবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলব।

অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী 

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

smusmangonee@gmail.com

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>