জাতীয়

উৎসব কি এখন বাণিজ্য, নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
জিয়াউদ্দিন লিটন একসময় উৎসব মানে ছিল মানুষ। এখন উৎসব মানে মানুষ, বাজার, ব্র্যান্ড, বিজ্ঞাপন, ক্যামেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব মিলিয়ে এক বিশাল আয়োজন। আগে উৎসবের কেন্দ্র ছিল উঠান; এখন তার একটি বড় অংশ শপিংমল। আগে উৎসবের স্মৃতি থাকত মানুষের মনে; এখন তার একটি বড় অংশ থাকে মোবাইলের গ্যালারিতে। আগে মানুষ উৎসব করত; এখন অনেক সময় উৎসব একই সঙ্গে একটি ‘ইভেন্ট’, একটি ‘কনটেন্ট’ এবং একটি ‘মার্কেট’। তবে এই পরিবর্তনকে কেবল অবক্ষয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ উৎসবের সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক নতুন নয়। হাট-মেলা, কারুশিল্প, মিষ্টি, পোশাক, পিঠা, বই—সবই বহুদিন ধরে উৎসবের অর্থনীতির অংশ। সমস্যা বাণিজ্য থাকা নয়; সমস্যা তখনই; যখন বাণিজ্য উৎসবের অর্থ নির্ধারণ করতে শুরু করে। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্নটি জরুরি হয়ে ওঠে—উৎসব আছে, কিন্তু সংস্কৃতি কোথায়? বাংলার উৎসবের শেকড় খুঁজলে আমরা অর্থনীতির আগে পাই জীবনকে। কৃষি, ঋতু, নদী, মাটি, ধর্ম, লোকবিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক—এসবের ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে উৎসবের সামাজিক কাঠামো। নবান্ন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দ ছিল কৃষিজীবনের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রকাশ। নতুন অন্ন শুধু নিজের ঘরে থাকবে না—প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের ঘরেও যাবে। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত ছিল ভাগাভাগির নৈতিকতা। পহেলা বৈশাখের ক্ষেত্রেও দেখা যায় একই সামাজিক প্রবণতা। বাংলা সন ও পহেলা বৈশাখের ইতিহাস নিয়ে নানা মত থাকলেও ইউনেস্কার বাংলাদেশ বিষয়ক ঐতিহ্য-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ আছে, বাংলা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মুঘল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থার সম্পর্ক ছিল এবং গ্রামীণ জীবনে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। একই নথিতে পহেলা বৈশাখের গ্রামীণ মেলা, খাদ্য, খেলনা, কারুশিল্প ও সামাজিক সমাগমের বিবরণও আছে। অর্থাৎ উৎসবের শুরুতেই অর্থনীতি ছিল। কিন্তু সেই অর্থনীতি ছিল জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত—মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আজকের প্রশ্ন হলো, সেই সম্পর্কটি কোথায় বদলে গেল? পহেলা বৈশাখ এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর একটি। এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনেস্কার বর্ণনা অনুযায়ী, মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের উদ্যোগে; এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল জনসংহতি, অশুভের বিরুদ্ধে প্রতীকী অবস্থান এবং নতুন ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা নিজেই দেখায়, সংস্কৃতি কখনো স্থির কোনো জাদুঘর-নির্ভর বস্তু নয়। সময়ের প্রয়োজন থেকে নতুন সাংস্কৃতিক রূপ জন্ম নিতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের আরেকটি রূপও দৃশ্যমান হয়েছে—বৈশাখী পোশাক, বিশেষ খাবার, রেস্তোরাঁর মেন্যু, করপোরেট ক্যাম্পেইন, অনলাইন অফার, ব্র্যান্ডেড আয়োজন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতি, নাকি পুঁজিবাদী সংস্কৃতি? গবেষণাটি শহর ও গ্রাম এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির বৈশাখ উদ্‌যাপন তুলনা করে উৎসবটির মধ্যে জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদী সংস্কৃতির টানাপোড়েন বিশ্লেষণ করেছে। এখানে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। বৈশাখী পোশাক বিক্রি হচ্ছে—এটি খারাপ নয়। বরং এতে তাঁতি, কারিগর, ডিজাইনার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হতে পারেন। কিন্তু যখন বৈশাখের সাংস্কৃতিক পরিচয়টি ‘লাল-সাদা কালেকশন’-এ সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সংস্কৃতিকে ধারণ করছি, নাকি সংস্কৃতির একটি বাজারযোগ্য চিহ্ন কিনছি? মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যেও বাজার আছে কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ইউনেস্কোর নথিতে মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী ও শিল্পকর্মের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথাও উঠে আসে। অর্থাৎ সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য বাজার কখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। তাহলে বাণিজ্যিকীকরণ সব সময় সংস্কৃতির শত্রু নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাজার কি সংস্কৃতিকে বাঁচাচ্ছে, নাকি সংস্কৃতির জায়গা দখল করছে? একজন পটুয়া যদি তার আঁকা ছবি বিক্রি করে সংসার চালান, সেখানে বাজার সংস্কৃতির সহায়ক। একজন তাঁতি যদি বৈশাখে তার শাড়ির ন্যায্যদাম পান, সেটিও সাংস্কৃতিক অর্থনীতির সুস্থ রূপ। কিন্তু কোনো লোকঐতিহ্যের অর্থ, ইতিহাস ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কেবল তার নকশা, রং বা প্রতীককে পণ্যে পরিণত করা হলে সেখানে সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি হয়। অর্থাৎ বাণিজ্য নয়, বাণিজ্যের আধিপত্যই মূল সমস্যা। আরও পড়ুন ভিডিও ভাইরালে তোলপাড় / হাসপাতালে বাবার স্বাক্ষর নেওয়া কাগজটি আইনগত দলিল নয় নবান্নের প্রসঙ্গে এই প্রশ্ন আরও তীব্র। নতুন ধানকে কেন্দ্র করে যে উৎসব, তার কেন্দ্রে থাকার কথা কৃষকের। অথচ শহুরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমরা অনেক সময় নবান্নকে দেখি পিঠা, আল্পনা, লোকগান ও মঞ্চসজ্জার মধ্যে; কৃষকের জীবন, উৎপাদন ব্যয়, ফসলের ন্যায্যমূল্য কিংবা জলবায়ু ও কৃষির অনিশ্চয়তা থাকে আড়ালে। এখানে তৈরি হয় এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ। আমরা নবান্নের খাবারটিকে রাখি, নবান্নের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলি। কৃষকের উৎপাদিত ধান শহরের বাজারে আসে। সেই ধান থেকে তৈরি হয় চাল, পিঠা, পায়েস। কিন্তু উৎসবের ভোগের সঙ্গে উৎপাদকের জীবন কতটা যুক্ত থাকে? একটি সংস্কৃতি তখনই জীবন্ত, যখন তার প্রতীক এবং তার মানুষ—দুটিই দৃশ্যমান থাকে। নবান্নকে যদি কেবল ‘গ্রামীণ নস্টালজিয়া’ বানিয়ে ফেলি, তবে সেটি আর জীবন্ত কৃষিসংস্কৃতি থাকে না; হয়ে যায় শহুরে প্রদর্শনীর একটি থিম। বাংলাদেশে ঈদ উৎসবের সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক সবচেয়ে স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ঈদকে ঘিরে ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা লেনদেনের একটি আনুমানিক হিসাব প্রকাশ করা হয়েছিল। পোশাক, জুয়েলারি, খাদ্যসহ নানা খাতে ঈদকেন্দ্রিক ভোগব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সাময়িক গতি সৃষ্টি করে বলে অর্থনীতিবিদদের মতও সেখানে তুলে ধরা হয়। এই বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শুধু ‘ভোগবাদ’ বলে বাতিল করা যাবে না। কারণ ঈদের বাজারে যুক্ত থাকেন—দর্জি, তাঁতি, পোশাকশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, রেস্তোরাঁকর্মী, কৃষক, মিষ্টি প্রস্তুতকারক, অনলাইন উদ্যোক্তা—অসংখ্য মানুষ। অর্থাৎ উৎসবের অর্থনীতি অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এখানেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসে—ঈদের আনন্দ কি ক্রমে ক্রয়ক্ষমতার প্রদর্শনে পরিণত হচ্ছে? একটি পরিবারের ঈদের পোশাক কত দামি, কোথায় কেনাকাটা হয়েছে, কোন ব্র্যান্ড, কোন রেস্তোরাঁ—এসব যখন সামাজিক মর্যাদার চিহ্ন হয়ে ওঠে; তখন উৎসবের সাম্যের দর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য তো নতুন পোশাকে যতটা নয়; অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারার মধ্যে। আবার যদি আমরা পূজার উৎসবের দিকে দৃষ্টি দেই, তাহলে দেখতে পাই দুর্গাপূজা বা অন্যান্য পূজার ক্ষেত্রেও অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ। মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা, আলোকসজ্জা, পোশাক, খাবার, পরিবহন, শিল্পী ও কারিগরের শ্রম—সবকিছু মিলে একটি বিশাল অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি হয়। এখানেও বাজারকে বাদ দেওয়া অসম্ভব। কিন্তু যখন আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা, ব্যয়ের প্রতিযোগিতা, থিমের প্রতিযোগিতা এবং দর্শনার্থী আকর্ষণের প্রতিযোগিতা মূল সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে ছাপিয়ে যায়; তখন উৎসবের চরিত্র বদলাতে থাকে। প্রশ্নটি তাই—উৎসব কত বড় হলো, নাকি উৎসব কত মানুষকে একত্র করল? দুটির উত্তর ভিন্ন ভিন্ন। বইমেলাতেও দেখা যায় দুটি চিত্র; পাঠের সংস্কৃতি বনাম বইয়ের বাজার। অমর একুশে বইমেলা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। বইমেলায় বাণিজ্য থাকবেই। প্রকাশক বই বিক্রি করবেন, লেখক পাঠকের কাছে পৌঁছাবেন, পাঠক বই কিনবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বইমেলার মূল্য কেবল বিক্রির পরিমাণ দিয়ে মাপা যায় না। বাংলা একাডেমি ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলার বই বিক্রির হিসাবও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ বইমেলা নিঃসন্দেহে একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। কিন্তু একটি বইমেলার সবচেয়ে বড় সাফল্য কি বিক্রি হওয়া বইয়ের সংখ্যা? নাকি মেলা শেষে কতজন মানুষ আরও বেশি বই পড়তে শুরু করলেন? এখানেই আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যায়নের দুর্বলতা। আমরা অনেক সময় জিজ্ঞেস করি—‘কত বই বিক্রি হলো?’ কিন্তু জিজ্ঞেস করি না—কত মানুষ বই পড়লেন? বইমেলার ভিড় বাড়া ভালো; কিন্তু পাঠকের সংখ্যা বাড়া আরও ভালো। উৎসব এখন কনটেন্ট ও বাণিজ্যিকীকরণের সবচেয়ে নতুন ও শক্তিশালী বাহন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে প্রায় ৭৭.৭ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং প্রায় ৬০ মিলিয়ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ছিল বলে ডাটারিপোর্টালের হিসাবে দেখা যায়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৭৭ শতাংশ অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছিলেন। এই বাস্তবতা উৎসবের ভাষা বদলে দিয়েছে। এখন উৎসব শুধু উদ্‌যাপন নয়; উৎসব হলো ছবি, ভিডিও, রিল, স্টোরি, পোস্ট। ফলে উৎসবের অভিজ্ঞতার একটি অংশ হয়ে উঠেছে দৃশ্যমানতা। আমি কী পরেছি? কোথায় গিয়েছি? কী খেয়েছি? কার সঙ্গে ছবি তুলেছি? কোন মেলায় গিয়েছি? অর্থাৎ উৎসবের অভিজ্ঞতা কখনো কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে সামাজিক প্রদর্শনে রূপান্তরিত হয়। এখানে প্রযুক্তিকে দোষ দেওয়া সহজ, কিন্তু যথার্থ নয়। প্রযুক্তি নিজে সংস্কৃতির শত্রু নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া লোকগান, আঞ্চলিক খাবার, কারুশিল্প, আঞ্চলিক ভাষা ও লোকঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারে। সমস্যা তখনই; যখন সংস্কৃতি কনটেন্টের চেয়ে বেশি কিছু নয়—এই ধারণা তৈরি হয়। বাণিজ্যিক উৎসবের আরেকটি বড় সমস্যা শ্রেণিগত। একজন মানুষের কাছে বৈশাখ মানে একটি নতুন পোশাক। অন্যজনের কাছে পাঁচটি পোশাক, রেস্তোরাঁ, ভ্রমণ ও অনুষ্ঠান। একজনের ঈদ মানে পরিবারের জন্য সামান্য কেনাকাটা। অন্যজনের ঈদ মানে ব্র্যান্ডেড পোশাক, দামি রেস্তোরাঁ, উপহার ও বিনোদন। একই উৎসব, কিন্তু ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এখানে উৎসব যদি সামাজিক সংহতির বদলে ভোগক্ষমতার প্রদর্শন হয়ে ওঠে, তবে উৎসবের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরও পড়ুন ভাইরাল গল্প ‘কবরের ঠিকানা’, কী লিখেছেন সোহেল আর রানা উৎসবের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল—অল্পের মানুষও আনন্দ করতে পারে। বাজারের সবচেয়ে বড় প্রলোভন—আরও বেশি না কিনলে আপনার আনন্দ অসম্পূর্ণ। এই দুই দর্শনের সংঘাতই আজকের উৎসব-সংস্কৃতির অন্যতম বড় প্রশ্ন। তবে আমরা অবশ্যই বাণিজ্যবিহীন একটি উৎসব চাই না। এটি বাস্তবসম্মতও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনীতি থাকবে। শিল্পী পারিশ্রমিক পাবেন। কারিগর পণ্য বিক্রি করবেন। প্রকাশক বই বিক্রি করবেন। তাঁতি কাপড় তৈরি করবেন। রেস্তোরাঁ উৎসবের খাবার পরিবেশন করবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উৎসবকে কেন্দ্র করে আয় করবেন। বরং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দায়বদ্ধ উৎসবের অর্থনীতি। বাজার থাকবে, কিন্তু বাজার সংস্কৃতিকে গ্রাস করবে না। বিজ্ঞাপন থাকবে, কিন্তু বিজ্ঞাপন উৎসবের ভাষা নির্ধারণ করবে না। ব্র্যান্ড থাকবে, কিন্তু ব্র্যান্ডের চেয়ে শিল্পী ও কারিগর দৃশ্যমান হবেন। উৎসবের পণ্য বিক্রি হবে, কিন্তু সেই পণ্যের পেছনের মানুষটির গল্পও বলা হবে। আমরা যদি সত্যিই বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষা করতে চাই, তাহলে শুধু উৎসবের দিনে বাঙালি হলেই হবে না। বৈশাখে শাড়ি-পাঞ্জাবি পরলাম—এতেই বাঙালিত্ব সম্পূর্ণ নয়। বছরের বাকি দিন বাংলা বই পড়ি কি না, লোকসংগীত শুনি কি না, স্থানীয় কারুশিল্পকে সমর্থন করি কি না, বাংলা ভাষার শুদ্ধ ও সৃজনশীল ব্যবহার করি কি না, আমাদের লোকঐতিহ্যের ইতিহাস জানি কি না—সেই প্রশ্নও জরুরি। একদিনের উৎসব দিয়ে একটি জাতির সংস্কৃতি টিকে থাকে না। সংস্কৃতি বেঁচে থাকে প্রতিদিনের আচরণে। উৎসব সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান মুহূর্ত মাত্র। অবশ্যই আমাদের সম্মিলিতভাবে কয়েকটি বিষয়ের ওপরে নজর রাখতে হবে: প্রথমত, উৎসবের অর্থনীতিকে সংস্কৃতিবিরোধী না ভেবে সংস্কৃতিবান্ধব অর্থনীতিতে রূপ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, লোকশিল্পী, তাঁতি, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসবের বাজারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত, উৎসবের আয়োজনের সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস, লোকসংগীত, লোকখাদ্য, কারুশিল্প ও মৌখিক ঐতিহ্যের সংযোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবকে শুধু অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পঞ্চমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উৎসবের ‘দেখানো’ নয়, উৎসবের ইতিহাস ও অর্থ নিয়েও কনটেন্ট তৈরি হওয়া দরকার। সবচেয়ে বড় কথা—উৎসবের সাফল্য পরিমাপের মানদণ্ড বদলাতে হবে। কত টাকা খরচ হলো—তার পাশাপাশি জিজ্ঞেস করতে হবে, কতজন শিল্পী উপকৃত হলেন? কতজন কারিগর ন্যায্যমূল্য পেলেন? কতজন নতুন মানুষ লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হলো? কতজন পাঠে ফিরল? কতজন দরিদ্র মানুষ আনন্দের অংশীদার হলো? তখন উৎসবের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না; সহযোগী হবে। শেষ কথা হলো—আমরা কখনোই উৎসবকে বাজারের হাতে পুরোপুরি তুলে দেবো না। উৎসবের বিরুদ্ধে বাজার নয়। বাজারের বিরুদ্ধেও উৎসব নয়। প্রয়োজন তাদের মধ্যে একটি সুস্থ সম্পর্ক। কারণ সংস্কৃতি কখনো অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। কিন্তু সংস্কৃতির ওপর অর্থনীতির একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হলে উৎসব তার আত্মা হারাতে পারে। আজ আমাদের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— আমরা কি উৎসব উদ্‌যাপন করছি, নাকি উৎসবের পণ্য কিনছি? আমরা কি বৈশাখকে ধারণ করছি, নাকি বৈশাখী পোশাক পরছি? আমরা কি নবান্নকে অনুভব করছি, নাকি নবান্নের পিঠা খাচ্ছি? আমরা কি ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছি, নাকি নিজেদের সামর্থ প্রদর্শন করছি? আমরা কি বইমেলায় বইয়ের কাছে যাচ্ছি, নাকি বইমেলার ছবির কাছে? প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু সংস্কৃতির প্রশ্ন সব সময় আরামদায়ক হয় না। উৎসবের আলো যত উজ্জ্বল হচ্ছে, তার ছায়াগুলোও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাই আমাদের উৎসবকে বাতিল করলে চলবে না; বরং উৎসবের ভেতরে সংস্কৃতিকে আবার দৃশ্যমান করতে হবে। মনে রাখতে হবে— বাজার উৎসবকে বড় করতে পারে, কিন্তু মানুষই উৎসবকে অর্থ দেয়। ব্র্যান্ড উৎসবের পোশাক বানাতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি তার আত্মা তৈরি করে। মঞ্চ উৎসবকে দৃশ্যমান করতে পারে, কিন্তু মানুষের মিলনই তাকে প্রাণ দেয়। আর শেষ পর্যন্ত—উৎসবের সবচেয়ে বড় পণ্য আনন্দ নয়; উৎসবের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। সেই মানুষটিকে যদি আমরা হারিয়ে ফেলি; তবে আলো থাকবে, মেলা থাকবে, গান থাকবে, বিজ্ঞাপন থাকবে, ছবি থাকবে—সবই থাকবে। শুধু উৎসবটি আর থাকবে না। থাকবে তার একটি সুন্দর, চকচকে, বাজারজাত সংস্করণ। শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে—মানুষকে বাদ দিয়ে উৎসব হতে পারে—আয়োজন হয়তো হয়। কিন্তু সংস্কৃতি হয় না। লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কবি ও প্রাবন্ধিক। এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>