জাতীয়

এআই–যুগে টিকে থাকতে কী করবেন, পড়ুন কম্পিউটারবিজ্ঞানীর পরামর্শ

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad

২০১৬ সালে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কম্পিউটারবিজ্ঞানীর স্বীকৃতি পেয়েছিলেন মাইকেল আরউইন জর্ডান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটারবিজ্ঞান এবং পরিসংখ্যান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই গত মে মাসে সমাবর্তন বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। পড়ুন নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।

২০২৬ সালের গ্র্যাজুয়েটরা, তোমাদের শুভেচ্ছা। একই সঙ্গে সমবেদনা। এমন এক জটিল সময়ে তোমরা বড় হচ্ছ, যে সময় বদলে যাচ্ছে দ্রুত। এই মুহূর্তে ভবিষ্যদ্বাণী করা যেমন কঠিন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়াও বেশ শক্ত।

এক বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদের একটা গল্প আছে। জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তিনি দ্বিধায় পড়েছিলেন—পূর্ব উপকূলে থাকবেন, নাকি পশ্চিম উপকূলে চলে যাবেন! সে সময় এক সহকর্মী তাঁকে বললেন, ‘তুমি তো পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ! তুমি তো জানোই যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সম্ভাব্য সব পরিণতি বিবেচনা করে সেটাই বেছে নেওয়া, যেটার উপযোগিতা সর্বোচ্চ।’

পরিসংখ্যানবিদ বললেন, ‘তুমি বুঝতে পারছ না। এটা বাস্তব জীবন।’

এআই নিয়ে বাড়াবাড়ি

অনেক দিন আগে, কালের অতলে হারিয়ে যাওয়া আমার নিজের সমাবর্তনের কথা বলি। সমাবর্তনের বিশেষ টুপি আর গাউন পরে বসে ছিলাম। এমন সময় পাশে এমন একজনকে আবিষ্কার করলাম, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের চার বছরেও যাঁর সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি। আমরা আলাপ শুরু করলাম। একটা সময় মনে হলো, কত পুরোনো আমাদের বন্ধুত্ব! একদিকে সমাবর্তনের বোরিং বক্তৃতা চলছিল, আর আমরা আমাদের আশা, ভয়, অভিজ্ঞতা আর পরিবার নিয়ে কথা বলছিলাম। তারপর আবার যে যার পথে চলে গেলাম। সাধারণত বিচ্ছেদের সময় যে দুঃখবোধ থাকে, তার কিছুই সেখানে ছিল না। পরিস্থিতি আর পরিবেশটা যদি ঠিকঠাক হয়, তাহলে দুজন মানুষের সংযোগ অপ্রত্যাশিতভাবেই কতটা গভীর হতে পারে, সেদিন বুঝেছিলাম।

আজ আমি এই সংযোগ নিয়েই কথা বলব।

কেউ কেউ বলেন, এআই এমন এক নতুন যুগ নিয়ে আসবে, যা আমাদের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলো সমাধান করে দেবে। আবার আরেক দলের দাবি, এটা মানবজাতিকে ক্রীতদাস বানিয়ে ফেলবে। এসব শুনে বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক।

এআই প্রযুক্তি নিয়ে কথা বলার সাধারণ নিয়ম হলো—প্রথমে সায়েন্স ফিকশনের মতো অবাক করা কিছু অগ্রগতির কথা তুলে ধরা, তারপর দুশ্চিন্তার বিষয়গুলোতে আসা। তবে আজ আমি ক্রমটা উল্টে দিতে চাই।

এআই নিয়ে ভয়

প্রথমত, এটা স্পষ্ট যে আগামী দশকের মধ্যে বহু চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অথবা এমনভাবে বদলে যাবে, যা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। এর মধ্যে কম্পিউটার প্রোগ্রামারের চাকরিও আছে! অথচ এক দশক আগেও আমরা এটাকে সবচেয়ে নিরাপদ চাকরি মনে করতাম।

দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে একদম আমূল বদলে ফেলা প্রয়োজন। সদ্য গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কথাটা হয়তো তোমাদের জন্য বেশ উদ্বেগের। তবে আশা করি তোমরা এত দিনে বুঝে ফেলেছ, শিক্ষা এমন কোনো বিষয় নয় যা একবার শেষ করলেই চুকেবুকে যায়।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সময়ে শুরুর দিকে বৈষম্য বেশ প্রকট হবে। আমরা এখন যে বৈষম্য দেখছি, সম্পদের বৈষম্য তার চেয়েও বাড়বে। সুযোগের বৈষম্য তৈরি হবে।

চতুর্থত, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া লেখা ও ছবির বিস্তার বর্তমানে আমাদের সমাজকে ব্যাহত করছে। ভবিষ্যতেও এটা চলতে থাকবে।

সবশেষে, এই সমস্যাগুলোর কারণে সারা বিশ্বেই গণতন্ত্র, এমনকি এর অস্তিত্বই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। শ্রমবাজারের তোলপাড়, বৈষম্য ও ভুল তথ্যের ওপর ভর করেই গণতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনগুলো ডালপালা মেলবে।

বাস্তবতার এই অস্বস্তিকর তালিকা দেখে মনে হতেই পারে—এত প্রযুক্তির দরকারই বা কি? আমি ১৯৬০-এর দশকে বড় হয়েছি। তাই এই ধরনের প্রতিক্রিয়া আমার মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই আসে। তবে আমি বলব, প্রযুক্তির অগ্রগতি আদতে আমাদের প্রয়োজন।

ভুয়া জীবনের অভিনয়

একজন মানুষ যখন সত্যিকার কোনো মেলবন্ধন বা সংযোগ ঘটাতে চায়, তখন এআইয়ের সরবরাহ করা সাবলীল টেক্সট ছাড়াও আরও কিছুর প্রয়োজন হয়। আমাদের সবচেয়ে গভীর আবেগগুলোর জন্ম হয় আজীবন অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে। ছোট ছোট সাফল্য ও ব্যর্থতার পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতা, দারুণ কোনো মুহূর্ত, অথবা তীব্র কষ্টের এক ভান্ডার থেকে।

জেনারেটিভ এআই সিস্টেমগুলো এখন গান লিখছে, উপন্যাস লিখছে। এই কাজগুলো কি শোনার বা পড়ার যোগ্য হবে? সম্ভবত হবে। কিন্তু আমাকে বলবেন না যে জেনারেটিভ এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমন কোনো কাজ করবে, যা আমার অন্তরের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যাবে। জেনারেটিভ এআইয়ের কোনো জীবন্ত অভিজ্ঞতা বা বাস্তব জীবন নেই। এটি একটি ভুয়া জীবনের অভিনয় করতে পারে, কিন্তু ভুয়া জীবনের কোনো ভুয়া সঙ্গী কে-ই বা চায়?

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি বিশ্বাস করি এমন কিছু পেশা বা চাকরি থেকেই যাবে, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর সংযোগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ধরনের নতুন নতুন চাকরি আরও তৈরি হবে। এগুলো হারিয়ে যাবে না। ভবিষ্যতে এগুলোর সংখ্যা আরও বাড়বে। মানুষের মানুষকে প্রয়োজন।

তাই গ্র্যাজুয়েটরা, আমরা মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হব, ভীত হব, এটা হয়তো এড়ানো সম্ভব না। তবু কিছু বিষয় তোমাদের সাহায্য করতে পারে।

প্রথমত, লম্বা একটা দম নাও। এমন নয় যে দ্রুতই তোমাকে সুযোগগুলো ছিনিয়ে নিতে হবে, না হলে সেগুলো গায়েব হয়ে যাবে। সুযোগ আর চ্যালেঞ্জগুলো আজ থেকে এক বছর পর, পাঁচ বছর পর, এমনকি ১০ বছর পরও থাকবে। এই যুগটিকে বরং শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সে সময় চিন্তাশীল মানুষ এমন সব উদ্ভাবন করেছিলেন, যা ২০০ বছর ধরে মানবজাতিকে সেবা দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে।

তুমি যদি ইতিমধ্যেই একজন চিন্তাশীল মানুষ হয়ে না থাকো, কীভাবে চিন্তাশীল হবে? একটু সময় বের করে উপন্যাস পড়ো, ইতিহাস চর্চা করো, একটা নতুন ভাষা শেখো, বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্ত থেকে ঘুরে আসো। কোনো একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখো।

দ্বিতীয়ত, মনে রেখো মানুষ যখন এক হয়, তখনই আশ্চর্যজনক ঘটনাগুলো ঘটে। আমরা তথাকথিত ‘জিনিয়াসদের’ অর্জনকে একটু বেশিই প্রাধান্য দিই। বাস্তবে পুরো একটা সমাজই এর পেছনে কাজ করে, অথচ কৃতিত্বটা আমরা ‘জিনিয়াসকে’ দিয়ে দিই। যেমনটা উত্তর–আধুনিক দার্শনিক টেলর সুইফট একবার বলেছিলেন, ‘আমি কেবলই এক সাধারণ মেয়ে, যাকে সবাই জিনিয়াস বলে। কিন্তু সে যদি হয় একা, তবে জিনিয়াস হয়ে লাভ কি?’

সবাইকে ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>