বাংলাদেশের সংবিধান ‘চিঠিপত্র ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার’কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে হাল জমানার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মুঠোফোনের সব তথ্যই অনলাইনের খোলাবাজারে পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রথম আলোর প্রতিবেদনে নাগরিকের মুঠোফোনের তথ্যের অবাধ বেচাকেনা নিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করি।
সাধারণ নাগরিক তো বটেই, স্বয়ং দেশের মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গোপন তথ্যও অনলাইনে প্রকাশ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে। টাকা দিলেই দেশের যেকোনো মুঠোফোন ব্যবহারকারীর কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর), অবস্থান কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সংবেদনশীল তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর অর্থ যে কেউই জানতে পারবে নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিমুহূর্তের গতিবিধি। দীর্ঘদিন ধরে একশ্রেণির অসাধু চক্র ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই বাণিজ্য চালিয়ে আসছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তথ্য ফাঁসের এই চিত্র হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এক চরম অব্যবস্থাপনার ফলাফল বলেই আমরা মনে করি। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৩৬টি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৩২টি। এমনকি ২০২৩ সালে এবং গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তথ্যভান্ডারের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল। এই তথ্যগুলোই প্রমাণ করে, আমাদের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য নিলেও সেগুলোর সুরক্ষার প্রতি তাদের কোনো মনোযোগ ও দায়বদ্ধতা নেই।
মোবাইল অপারেটরদের তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থা। কিন্তু প্রতিবেদনসূত্রে আমরা জানতে পারছি যে কিছু সরকারি সংস্থার কাছে অপারেটরদের অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সরাসরি তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। এমনকি এ ক্ষেত্রে অপারেটরের কাছে আলাদাভাবে তথ্য চাওয়ারও প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কারা কীভাবে মানুষের তথ্য নিয়ে যাচ্ছে, তা বের করাও সম্ভব বলে মোবাইল অপারেটররা জানিয়েছেন।
সবচেয়ে হতাশাজনক অংশ হলো ধারাবাহিক তথ্য ফাঁসের ঘটনায় রাষ্ট্র ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিষ্ক্রিয়তা। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার থেকে কোটি কোটি নাগরিকের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও কোনো কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, এমনকি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য রাখার দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠানের, তারা ফাঁসের ঘটনা জানত না। যারা তথ্য ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, তারা জানে যে সরকার তাদের কিছু করবে না। ফলে কেবল তথ্য ফাঁস করেই ক্ষান্ত দিচ্ছে না, খোলাবাজারে নাগরিকের গোপন তথ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে।
আমরা মনে করি, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার আগে তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্র ও প্ল্যাটফর্ম দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এখন পর্যন্ত যেসব প্রতিষ্ঠানে তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। মোবাইল অপারেটর ও সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যভান্ডারে কার কার প্রবেশের সুযোগ রয়েছে, তা অবিলম্বে পুনর্মূল্যায়ন ও কঠোর আইনি নজরদারির আওতায় আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত না হলে নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা যেভাবে হুমকির মুখে পড়ে, তেমনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>