বিজ্ঞাপন
নাজমুন নাহার
কাঁদা মাটির মধ্যে পড়ে আছে একটি ব্যাকপ্যাক, পাশে নিথর একটি ক্যামেরা। মানুষটি নেই, পড়ে আছে শুধু তার ভ্রমণের শেষ চিহ্নগুলো! এই ব্যাকপ্যাক আর ক্যামেরা একজন অচেনা ট্রাভেলারের অসমাপ্ত অভিযাত্রার হৃদয়বিদারক এক গল্প যেন বলে যাচ্ছে আজ পৃথিবীকে!
হয়তো সে পৃথিবীর কোনো এক প্রান্ত থেকে নেপাল আর তিব্বতের পাহাড় দেখতে এসেছিল। হয়তো তার চোখে ছিল হিমালয় দেখার স্বপ্ন। হাতে ছিল ক্যামেরা, কাঁধে ছিল ব্যাকপ্যাক। কিন্তু প্রকৃতির এক আকস্মিক নির্মমতায় তার এই যাত্রা স্বপ্নের নতুন জায়গায় যাওয়া হলো না। কি ভয়ানক নেপাল ট্রাজেডি! চোখের জল মুছে উঠতে পারেনি এখনো কেউ।
আমরা জানি না কোথায় শেষ গন্তব্য। তবুও বেরিয়ে পড়ি। মানুষটি হয়তো সে পৃথিবীর কোনো দূর দেশ থেকে এসেছিল কৈলাশ শৃঙ্গকে ক্যামেরায় বন্দি করতে, তিব্বতের মালভূমি কিংবা চেয়েছিল মেঘে ঢাকা হিমালয়, পাহাড়ি নদী আর মানুষের জীবন দেখতে।
কিন্তু বন্যার স্রোত তাকে কোথায় নিয়ে গেল, তার গল্প হয়তো আর কোনোদিন জানা যাবে না। ফিরে গেলো না সে তার ঘরে। পড়ে রইল শুধু তার ব্যাকপ্যাক, তার ক্যামেরা আর তার ভ্রমণের অসমাপ্ত স্মৃতি। সে কি জানত সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে? কোন পাহাড়, কোন নদী, কোন দুর্গম পথ, কিংবা কোনো অনিশ্চিত বিপদ?
আরও পড়ুন
ডেনমার্কে স্টুডেন্ট ভিসায় সরকারি ৯ সুবিধা বন্ধ, তালিকায় বাংলাদেশিরাও
সে হয়তো ভেবেছিল, পাহাড়ের সৌন্দর্য ক্যামেরায় বন্দি করবে। বৃষ্টিভেজা পথ পেরিয়ে যাবে, নদীর পাশে দাঁড়াবে, মেঘে ঢাকা হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হবে। হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় অচেনা শহরের ছোট্ট হোস্টেলের রুমে ফিরে পরিবারের কাউকে ফোন করে বলবে- ‘আজ পৃথিবীর অসাধারণ একটা জায়গা দেখলাম।’
কিন্তু সেই ফোন আর করা হয়নি। বন্যার স্রোত তাকে কোথায় নিয়ে গেল, তার গল্প হয়তো আর কোনোদিন জানা যাবে না। ফিরে যাওয়া হলো না প্রিয় মানুষের কাছে। পড়ে রইল শুধু তার ব্যাকপ্যাক, তার ক্যামেরা—আর তার স্বপ্নের কিছু নীরব চিহ্ন।
এই দৃশ্যের দিকে তাকালে আমি যেন নিজের জীবনকেও কখনো দেখতে পাই। ১৮৫ দেশ ভ্রমণের এই দীর্ঘ যাত্রায় কতবার যে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছি। দুর্গম পর্বত থেকে উত্তাল সমুদ্রে, অচেনা সীমান্ত থেকে অজানা মরুভূমি আমি পাড়ি দিয়েছি সহস্র নটিকাল মাইল। কখনো সামনে ছিল ভয়ংকর পবত শৃঙ্গ হয়েছে, কখনো অনিশ্চিত সীমান্ত, কখনো এমন পথ যেখানে পা বাড়ানোর আগে নিজেকেই প্রশ্ন করেছি আমি কি সত্যিই এই পথ পাড়ি দিতে পারব?
কতবার মনে হয়েছে, হয়তো এখানেই শেষ! কিন্তু প্রতিবারই কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পড়তেও বেঁচে গেছি। আবার ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়েছি। আবার পথে নেমেছি- পৃথিবীকে দেখেছি লাল সবুজের পতাকা নিয়ে।
উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, এশিয়া থেকে ইউরোপ, ওশেনিয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের কত অজানা পথ পাড়ি দিয়েছি। প্রখর রোদ, কখনো ঝড় বৃষ্টি, কখনো মরুঝড় কিংবা সমুদ্রের উত্তাল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বিধাতা রক্ষা করেছেন, তাই আমি বারবার ঘরে ফিরে এসেছি।
কিন্তু এই ব্যাকপ্যাক আর ক্যামেরার প্রতিচ্ছবি দেখে আমাকে নীরবে ভাবালো- একজন ট্রাভেলারের জীবন আসলে নিশ্চিত কোনো গল্প নয়। ঘর থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে একজন ট্রাভেলার জানে না, সে আবার ঘরে ফিরবে কি না। সে জানে না পরের পথ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে। তবু সে বেরিয়ে পড়ে। অজানাকে জানার জন্য, পৃথিবীকে নিজের চোখে দেখার জন্য, প্রকৃতির কাছে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার জন্য।
একজন ট্রাভেলারের কাঁধের ব্যাকপ্যাক, তার স্বপ্ন, সাহস, স্মৃতি আর অজানাকে ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষায় ভরপুর। তার হাতে থাকা ক্যামেরা ধরে রাখে মানুষের মুখ, পাহাড়ের নীরবতা, নদীর স্রোত, পথের ধুলো, অচেনা শহরের আলো, পৃথিবীর একটি চলমান জীবনের গল্প। তাইতো আমরা বেরিয়ে পড়ি বারবার, পৃথিবীর পাহাড় প্রকৃতিতে জীবনকে অনুভব করার জন্য, অজানাকে আলিঙ্গন করার জন্য!
হয়তো অসাধারণ কোনো সূর্যোদয়, হয়তো বন্ধুত্ব, হয়তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটি মুহূর্ত কাটানোর জন্য। আর আমিতো আমার বিশ্ব ভ্রমণের মিশনে লাল সবুজের পতাকা হাতে পৃথিবীর শেষ দেশটি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য এখনো এক জীবন্ত গল্পের ভেতর সংগ্রাম করছি। প্রকৃতির মহাশক্তির কাছে আমরা অসহায়, তবুও আমরা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকি, সামনে এগিয়ে যাই, ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি পৃথিবীর অজানাকে আবিষ্কার করার জন্য।
এমআরএম
বিজ্ঞাপন