জাতীয়

এশিয়ার প্রবৃদ্ধিতে নতুন চ্যালেঞ্জ, ভরসা এআই ও সহযোগিতা

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এশিয়া এখন নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক দশকের দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের পর বাণিজ্য বিভাজন, জ্বালানি নিরাপত্তার উদ্বেগ, জনসংখ্যার বার্ধক্য ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতি কমে আসায় অঞ্চলটির পুরোনো প্রবৃদ্ধির মডেল এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে সামনে সুযোগও রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটালাইজেশন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুন প্রবৃদ্ধির পথ খুলে দিতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আরও পড়ুন দুই সাবমেরিন ক্যাবলেই নির্ভরতা, বাড়ছে ইন্টারনেট বিপর্যয়ের ঝুঁকি আইএমএফের সাময়িকী ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যায় এশিয়ার অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষের আবাসস্থল এশিয়া বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের বড় অংশের উৎস হলেও অঞ্চলটির সামনে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত ভূ-অর্থনৈতিক পরিবেশ। আইএমএফ এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের মতে, এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনো বিশাল। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে দেশগুলোকে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন নীতিপথ বেছে নিতে হবে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশগুলো বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে পারে। আর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বয়স্ক জনসংখ্যার দেশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনমিতিক চাপের প্রভাব কমাতে পারে। পুরোনো প্রবৃদ্ধির মডেলে চাপ এশিয়ার দ্রুত প্রবৃদ্ধির পেছনে এতদিন বড় ভূমিকা রেখেছে রপ্তানি, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ। কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্য এখন আগের মতো উন্মুক্ত ও স্থিতিশীল নেই। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস ও বাণিজ্য বিভাজনের কারণে এশিয়ার অর্থনীতিগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। অনেক দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমছে এবং প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে সংকুচিত হচ্ছে শ্রমনির্ভর প্রবৃদ্ধির সুযোগ। একই সময়ে আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোও। আইএমএফের বিশ্লেষণ বলছে, এ অবস্থায় শুধু বেশি বিনিয়োগ বা বেশি রপ্তানি দিয়ে আগের প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখা কঠিন হবে। অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থান ও আয় নিয়ে প্রশ্ন এশিয়ার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণদের বিক্ষোভ ও অসন্তোষের পেছনে নিরাপদ কর্মসংস্থান, আয় ও সামাজিক অগ্রগতির প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আরও পড়ুন পিএমআই প্রতিবেদন / অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমছে, উৎপাদন খাতে বড় পতন ইন্দোনেশিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ চাতিব বাসরি আইএমএফ সাময়িকীতে লিখেছেন, অর্থনীতির সূচকে সমৃদ্ধি দেখা গেলেও রাস্তায় মানুষের ক্ষোভ থাকতে পারে। তার মতে, সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সুরক্ষা দেওয়া। অর্থাৎ, শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, প্রবৃদ্ধিকে এমন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে, যা মানুষের আয় ও সামাজিক গতিশীলতা বাড়ায়। এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন। এআইয়ে বড় সুযোগ, প্রয়োজন নতুন নীতি প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্রে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। বিশেষ করে এশিয়ার বিপুল অনানুষ্ঠানিক কর্মশক্তির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গ্র্যাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্থনি ট্যানের মতে, রাস্তার বিক্রেতা, নির্মাণশ্রমিক ও রাইড-হেইলিং চালকদের মতো অনানুষ্ঠানিক কর্মীরা এশিয়ার দৈনন্দিন অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এআইভিত্তিক প্রযুক্তি তাদের আয়, কাজের দক্ষতা ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে পারে। তবে এখানে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আনুষ্ঠানিক চাকরির জন্য তৈরি নিয়ম-কানুন অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রয়োগ করলে উল্টো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন নীতিমালা তৈরি করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ এশিয়ায় ডিজিটাল পেমেন্ট ও আর্থিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বাণিজ্য ও লেনদেনকে সহজ করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পরবর্তী পর্যায়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা ও আস্থা। থাইল্যান্ডের সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর সেথাপুত সুথিওয়ার্তনারুয়েপের মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে দ্রুত ও সস্তা করার পর এখন এগুলোকে জালিয়াতি, প্রযুক্তিগত ব্যর্থতাসহ অন্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও স্থিতিস্থাপক করতে হবে। আরও পড়ুন ‘ক্যানসার আক্রান্ত’ ১৩ জীবন বিমা কোম্পানি একই সঙ্গে এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ও টোকেনাইজড ফাইন্যান্সের দিকে এগোচ্ছে। এতে আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হলেও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রয়োজন হবে। নতুন শক্তি আঞ্চলিক সহযোগিতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বাণিজ্য বিভাজন বাড়ায় এককভাবে প্রতিযোগিতা করার পরিবর্তে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফের সাময়িকী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে শিল্পনীতি সমন্বয়, এআই উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ এবং অন্য মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের মতো একটি পুরোপুরি উন্মুক্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এশিয়ার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও নমনীয় আঞ্চলিক জোট, যেখানে অভিন্ন স্বার্থের জায়গায় দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করবে। ভারত-চীনেও ভিন্ন ধরনের চাপ এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতি ভারত ও চীনের সামনেও আলাদা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভারতের প্রবৃদ্ধি কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে বলে মনে করেন দেশটির সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ডুভুরি সুব্বারাও। অর্থনীতির সম্ভাবনা ধরে রাখতে এসব কাঠামোগত বাধা মোকাবিলা করা জরুরি। আরও পড়ুন উচ্চ সুদ ও ব্ল্যাকমেইল, বন্ধ হচ্ছে অবৈধ ঋণদাতা অ্যাপের পেমেন্ট চীনের প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধি নতুন অর্থনৈতিক ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করলেও আইএমএফ সাময়িকীর বিশ্লেষণে আরও ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সেবা খাতের ভোগ বাড়ানো চীনের প্রবৃদ্ধিকে আরও টেকসই করতে পারে। সামনে প্রবৃদ্ধির নতুন গল্প গত কয়েক দশকে এশিয়ার প্রবৃদ্ধি শুধু অঞ্চলটির অর্থনীতি বদলায়নি, বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্যও পাল্টে দিয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং এশিয়া বৈশ্বিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ের প্রবৃদ্ধির জন্য আগের সাফল্যের ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট হবে না। বাণিজ্য বিভাজন, জনসংখ্যার বার্ধক্য, উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতা এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আইএইচও/এএসএ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>