বিজ্ঞাপন
লিংকন ও জেফারসন মেমোরিয়াল পরিদর্শনের পর দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এসেছে। দিনের আলো তখন কোমল হয়ে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির সাদা মার্বেলের স্থাপনাগুলোর গায়ে এক অপূর্ব সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্মৃতিসৌধের গাম্ভীর্য পেরিয়ে আমরা আবার গাড়িতে উঠলাম। দেবাশীষ ধীরস্থির ভঙ্গিতে গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে চললেন যুক্তরাষ্ট্রের আরেক ঐতিহাসিক ও প্রতীকী স্থাপনার দিকে। আমাদের গন্তব্য ইউনাইটেড স্টেটস ক্যাপিটাল, যা শুধু একটি ভবন নয়, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের কেন্দ্র। পথের দুই পাশে বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর, পরিচ্ছন্ন সড়ক, দূরে দেখা জাদুঘর ও সরকারি স্থাপনাগুলো মিলিয়ে রাজধানী শহরটিকে মনে হচ্ছিল যেন পরিকল্পিত ইতিহাসের এক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। বহুদিন ধরে সংবাদপত্র, বই, তথ্যচিত্র ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনায় যে ভবনের নাম শুনে এসেছি, আজ তার সামনে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা মনে এক ধরনের কৌতূহল, শ্রদ্ধা ও নীরব উত্তেজনা জাগিয়ে তুলছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি স্থাপনা দেখতে যাচ্ছি না, বরং এমন এক প্রতিষ্ঠানের দিকে এগিয়ে চলেছি, যেখানে একটি জাতির আইন, নীতি, বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
পথে যেতে যেতে দূর থেকেই চোখে পড়ল আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সাদা গম্বুজ। যতই কাছে যাচ্ছিলাম, ততই তার সৌন্দর্য স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরের মাঝখানে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাপিটাল ভবন যেন ইতিহাস, শিল্প ও রাষ্ট্রদর্শনের এক অনন্য সমন্বয়। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমবার ভবনটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, একটি ভবনের সামনে নয় বরং গণতন্ত্রের এক জীবন্ত প্রতীকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বিকেলের আলোয় গম্বুজের শুভ্রতা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, আর চারপাশের সবুজ লনের বিস্তার ভবনটির মহিমাকে যেন আরও প্রসারিত করছিল। সেই মুহূর্তে অনুভব করলাম, পৃথিবীর কিছু স্থাপনা শুধু স্থাপত্য নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয় বহন করে।
১৭৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটনের উপস্থিতিতে এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৮০০ সালে এখানে প্রথম কংগ্রেসের অধিবেশন বসে। পরবর্তী দুই শতাব্দীতে ভবনটি বহুবার সম্প্রসারিত হয়েছে। আজকের এই মহিমান্বিত রূপ অসংখ্য স্থপতি, প্রকৌশলী ও শিল্পীর সৃজনশীলতার ফল। ইতিহাসের নানা ঝড়-ঝাপ্টার মধ্য দিয়েও এর যাত্রা থেমে থাকেনি। ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময় ১৮১৪ সালের ২৪ আগস্ট ব্রিটিশ বাহিনী ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রবেশ করে ক্যাপিটাল, হোয়াইট হাউজসহ একাধিক সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করে। ক্যাপিটালের সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের কক্ষ, গ্রন্থাগারের বড় অংশ এবং অভ্যন্তরের বহু কাঠের স্থাপনা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনের তীব্রতায় ছাদ ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোর বড় অংশ ধসে পড়ে। তবু ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি। যুদ্ধ শেষে দ্রুত পুনর্নির্মাণ শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এটি আগের চেয়েও আরও বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ রূপ লাভ করে। সেই পুনর্গঠন শুধু স্থাপত্যের পুনর্জন্ম ছিল না বরং নবীন আমেরিকান রাষ্ট্রের দৃঢ়তা, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক আত্মবিশ্বাসেরও প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রতিটি পুনর্নির্মাণ যেন জাতিকে মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ টিকে থাকলে গণতন্ত্র আবারও উঠে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন
শিকাগো নদীর বুকে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে ভ্রমণ
ক্যাপিটাল ভবনের স্থাপত্যশৈলী সত্যিই বিস্ময়কর এবং দৃষ্টিনন্দন। নিওক্লাসিক্যাল নকশায় নির্মিত এই ঐতিহাসিক ভবনে প্রাচীন গ্রিস ও রোমের স্থাপত্যধারার সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। সারিবদ্ধ সুউচ্চ স্তম্ভ, প্রশস্ত সিঁড়ি, সুষম নকশা এবং মাঝখানে সুউচ্চ সাদা গম্বুজ ভবনটিকে দিয়েছে এক অনন্য ও রাজকীয় সৌন্দর্য। গম্বুজের চূড়ায় স্থাপিত স্বাধীনতার প্রতীক ভাস্কর্য স্টাচু অব ফ্রিডম যেন পুরো জাতির আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার অঙ্গীকারকে প্রতীকীভাবে আকাশের দিকে তুলে ধরেছে। বিকেলের স্নিগ্ধ আলোয় সাদা গম্বুজটি তখন রুপালি দীপ্তিতে ঝলমল করছিল। সামনে বিস্তৃত সবুজ লন, দূরে ওয়াশিংটন মনুমেন্টের রেখা, আর আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ ভবনটির সৌন্দর্যকে আরও নাটকীয় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। দূর থেকে যতটা সুন্দর ও মহিমান্বিত মনে হয়েছিল, সামনে এসে দাঁড়ালে তার সৌন্দর্য ও বিশালতা যেন আরও বহুগুণ বেড়ে গেল। স্থাপত্যের এই অপূর্ব সৌন্দর্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার কোনো অহংকার নয় বরং শৃঙ্খলা, ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক আদর্শের এক গভীর প্রতীকী ভাষা।
এই ভবনের প্রতিটি ইট যেন আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ, সিনেট এবং হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস, দেশের গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেট অনুমোদন, নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গণতন্ত্রের যে মূল দর্শন জনগণের মতামত ও প্রতিনিধিত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত, ক্যাপিটাল ভবন তারই বাস্তব প্রতিফলন। নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানও সাধারণত এই ভবনের পশ্চিম প্রান্তের বিশাল সিঁড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে এটি শুধু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়, জাতীয় ঐক্য, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রের মর্যাদারও অন্যতম প্রতীক। বিশ্বের নানা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্ক, যুদ্ধ ও শান্তি সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক নীতি এবং নাগরিক অধিকারবিষয়ক আইন এই ভবনের ভেতরেই আলোচিত ও অনুমোদিত হয়েছে। তাই ক্যাপিটাল ভবন শুধু আমেরিকার নয়, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসেও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আরও পড়ুন
শিকাগোর আকাশে বাংলাদেশের গর্ব উইলিস টাওয়ারের চূড়ায়
চারদিকে হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলাম, বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়। কেউ ভবনের স্থাপত্য মুগ্ধ হয়ে দেখছেন, কেউ ইতিহাস জানার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ স্মৃতিচারণের জন্য ছবি তুলছেন। পরিচ্ছন্ন উদ্যান, সুবিন্যস্ত পথ, সবুজ লন এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও কোথাও অযথা কোলাহল নেই। পরিবেশে ছিল শৃঙ্খলা, মর্যাদা এবং ইতিহাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। মনে হলো, একটি জাতি যখন তার রাষ্ট্রব্যবস্থা, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে সম্মান করতে শেখে, তখন সেই সম্মান তার স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং নাগরিক আচরণেও প্রতিফলিত হয়। ক্যাপিটল ভবন কেবল একটি সরকারি ভবন নয়, এটি আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। প্রতি বছর বিশ্বের লাখ লাখ পর্যটক এখানে আসেন। তাদের উপস্থিতি শুধু রাজধানীর পর্যটন অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে না, ইতিহাসভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং নাগরিক সচেতনতার ক্ষেত্রও প্রসারিত করে। একটি স্থাপনা কীভাবে একটি জাতির ইতিহাস, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে পারে, ক্যাপিটাল ভবন তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
ভবনটির দিকে শেষবারের মতো তাকালাম। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। সাদা গম্বুজের গায়ে শেষ সূর্যের আভা, চারপাশের সবুজ লন আর প্রশস্ত আকাশ মিলিয়ে ক্যাপিটল ভবনটিকে তখন অন্যরকম সুন্দর লাগছিল। কিছুক্ষণ আগেও যে ভবনকে দেখছিলাম ইতিহাস ও স্থাপত্যের বিস্ময় হিসেবে, বিদায়ের মুহূর্তে সেটিই যেন আমার কাছে একটি দীর্ঘ দিনের স্মৃতির অংশ হয়ে উঠল। কত বইয়ের পাতা, কত সংবাদচিত্র আর কত দূরদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় যে ভবনের নাম শুনেছি, আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যেন সেই দূরত্বটুকু এক মুহূর্তে মুছে দিলো। ধীরে ধীরে আমরা গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। দেবাশীষ গাড়ি চালু করলেন। জানালার পাশে বসে ক্যাপিটলের দিকে আরেকবার চোখ ফেরালাম। গাড়ি যত এগিয়ে যাচ্ছিল, সাদা গম্বুজটি ততই দূরে সরে যাচ্ছিল, কিন্তু মনের ভেতর তার ছবিটি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। মনে হলো, ভ্রমণের আনন্দ শুধু নতুন কোনো স্থান দেখার মধ্যে নয়, সেই স্থানকে নিজের স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার মধ্যেও।
আরও পড়ুন
শ্রমিক দিবসের সূতিকাগার শিকাগোর হে মার্কেট ঘুরে দেখা
ওয়াশিংটনের এই বিকেলও তেমনই একটি স্মৃতি হয়ে রইল। সামনে তখন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও কিছু পথ, আরও কিছু দৃশ্য, আরও কিছু নতুন অভিজ্ঞতা। ক্যাপিটল ভবন ধীরে ধীরে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, আর আমরা এগিয়ে চললাম রাজধানীর অন্য প্রান্তের পথে। পেছনে রয়ে গেল সাদা গম্বুজটি, আর সঙ্গে রইল ইতিহাসের এক টুকরো বিকেল, যা দীর্ঘদিন আমার ভ্রমণস্মৃতির পাতায় নীরবে জ্বলজ্বল করবে।
এসইউ
বিজ্ঞাপন