অনলাইনে চোখে পড়ল একটি পোশাক। নিচে বড় করে লেখা’ ৫০ শতাংশ ছাড়’। দাম নাগালের মধ্যেই। খুব বেশি না ভেবেই পোশাকটি চলে গেল শপিং কার্টে। কিন্তু কেনার আগে হঠাৎ মনে পড়ল, আলমারিতে প্রায় একই রকম আরও পোশাক আছে। তবু মন বলছে, এটা না কিনলে যেন কিছু একটা বাদ পড়ে যাবে। বারবার কিনতে মন চাইলেও ঠিক এই জায়গাতেই কেউ কেউ নিজেকে থামানোর সিদ্ধান্ত নেন, নিজেকে বলেন ‘যা প্রয়োজন নয়, আপাতত তা কেনা যাবে না’। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াই ‘নো-বাই চ্যালেঞ্জ’।
নতুন একটি পোশাক, আরেকটি লিপস্টিক, ছাড়ে পাওয়া জুতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনো ‘ভাইরাল’ পণ্য কেনার কারণের যেন শেষ নেই। অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে নতুন কিছু পাওয়ার ইচ্ছাটাই এসব জিনিস কেনার বড় কারণ হয়ে ওঠে।
অনলাইনে কয়েকটি ছবি দেখার পর মনে হয়, ঘরটা নতুন করে সাজানো দরকার। কারও নতুন ব্যাগ দেখে মনে হয়, নিজেরও একটি চাই। আবার সবাই কিনছে দেখে অপ্রয়োজনীয় হলেও নিজের সংগ্রহে রাখার জন্য কিনতে ইচ্ছা হয়।
তবে শখের বসে কেনা এই জিনিসগুলো ব্যবহার করা হয় না অনেক সময়। তাই এই কেনাকাটার অভ্যাসকে সীমিত করতে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘নো-বাই চ্যালেঞ্জ’।
নাম শুনে যতটা কঠিন মনে হয়, নিয়মটি আসলে ততটা কঠিন নয়। চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণকারীদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোন কোন জিনিস আপাতত কেনা হবে না।
‘নো-বাই’ মানে একেবারেই কিছু না কেনা নয়, বরং প্রয়োজন আর ইচ্ছার মধ্যে একটু স্পষ্ট সীমারেখা টানা।
অপরিহার্য বা প্রয়োজনীয় চাহিদা সাধারণত ‘নো-বাই’ তালিকার বাইরে থাকে। যেমন বাজার, খাবার, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-পানির বিল, প্রয়োজনীয় যাতায়াত, ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা। কোনো জিনিস নষ্ট হয়ে গেলে বা জরুরি প্রয়োজন হলে সেটির বিকল্প কেনাও এ তালিকার বাইরে।
অন্যদিকে, নতুন পোশাক, জুতা, বাড়তি মেকআপ বা স্কিনকেয়ার, ঘর সাজানোর জিনিস, অপ্রয়োজনীয় গ্যাজেট কিংবা হঠাৎ ভালো লেগে যাওয়া কোনো পণ্য ‘নো-বাই’ তালিকায় থাকে। তবে এখানে সবার জন্য কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। কারও জন্য এক মাস নতুন পোশাক না কেনাই চ্যালেঞ্জ।
আবার কারও জন্য সেটি হতে পারে বাইরে কফি খাওয়া বা খাবার অর্ডার না করা। কেউ হয়তো সিদ্ধান্ত নেন, ঘরে থাকা সব লিপস্টিক শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুনটি কিনবেন না। আর কেউ নিজের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি খুঁজে বের করে সেটিকেই ‘নো-বাই’ তালিকায় রাখেন।

এক সপ্তাহ, এক মাস, তিন মাস কিংবা পুরো এক বছর—‘নো-বাই’ চ্যালেঞ্জের সময়সীমাও সবাই নিজের মতো ঠিক করেন। অনেকে অল্প সময় দিয়ে শুরু করেন। কারণ, এক বছরের জন্য সবকিছুতে লাগাম টানার চেয়ে এক মাস নিজের খরচের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলক সহজ।
আবার অনেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি জিনিসকে কেনাকাটার তালিকা থেকে বাদ দেন। সহজ কথায়, ‘নো-বাই’ চ্যালেঞ্জের নিয়ম নির্দিষ্ট কোনো তালিকা নয়। নিজের প্রয়োজন, আয় এবং কেনাকাটার অভ্যাস বুঝে নিয়ম তৈরি করাটাই এর মূলকথা।
কেউ টাকা বাঁচানোর জন্য এই চ্যালেঞ্জে অংশ নেন। কেউ বড় কোনো পরিকল্পনার জন্য সঞ্চয় করতে চান। কারও লক্ষ্য ঘরে জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় জিনিস কমানো। আবার কেউ শুধু নিজের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার অভ্যাসটি একটু নিয়ন্ত্রণে আনতে চান।
চ্যালেঞ্জ শেষে হয়তো দেখা গেল, যে পোশাকটি একসময় খুব দরকারি মনে হচ্ছিল, কয়েক সপ্তাহ পর সেটি কেনার ইচ্ছাটাই আর নেই। আলমারিতে থাকা পুরোনো পোশাকটিই হয়তো দিব্যি কাজে লাগছে। কিংবা নতুন আরেকটি লিপস্টিক কেনার আগে মনে পড়ল, একই রকম কয়েকটি তো আগেই আছে।
এভাবেই ধীরে ধীরে বোঝা যায়, সব ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে কেনাকাটা করাটা জরুরি নয়। কিছু ইচ্ছা সময়ের সঙ্গে এমনিতেই চলে যায়। আর কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, নতুন কিছু কেনার দরকারই ছিল না, ঘরে থাকা জিনিস দিয়েই কাজ চলে যাচ্ছে।
নতুন কিছু না কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অনেকেই প্রথমবারের মতো নিজের ঘরের জিনিস নতুন করে দেখতে শুরু করেন। দীর্ঘদিন না পরা পোশাক বেরিয়ে আসে আলমারি থেকে। আলাদা আলাদা পোশাক নতুনভাবে মিলিয়ে তৈরি হয় নতুন সাজ।
নতুন মেকআপ বা স্কিনকেয়ার কেনার আগে ঘরে থাকা পণ্যগুলোই আগে ব্যবহার করা হয়। নতুন কোনো ঘর সাজানোর জিনিস কেনার বদলে পুরোনো জিনিস সরিয়ে বা অন্যভাবে সাজিয়ে তৈরি করা যায় নতুন কিছু। চ্যালেঞ্জটি আমাদের কাছে যা আছে, তা-ই নতুন করে খুঁজে পাওয়ার একটি মাধ্যম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা বিভিন্ন জিনিসের বিজ্ঞাপন আমাদের কেনাকাটার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। আবার এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই জনপ্রিয় হয়েছে ‘নো-বাই’ চ্যালেঞ্জ, তৈরি হয়েছে নানা কমিউনিটি। সেখানে মানুষ নিজেদের নিয়ম, কেনাকাটা না করার কঠিন মুহূর্ত কিংবা কতটা সঞ্চয় করতে পারলেন, তা বাকিদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। একই চ্যালেঞ্জে থাকা অন্যদের অভিজ্ঞতা অনেকের জন্য উৎসাহেরও কাজ করে।
একসময় নতুন জিনিস কেনার সামর্থ্যকে জীবনযাপনের উন্নতির একটি চিহ্ন হিসেবে দেখা হতো। এখন অনেকের কাছে কম কেনাও একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। জীবনযাত্রার ব্যয়, সঞ্চয়ের চিন্তা, অতিরিক্ত ভোগ এবং দ্রুত বদলে যাওয়া ট্রেন্ড-ই এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ।

সবার পক্ষে হঠাৎ করে সব অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বন্ধ করা সহজ নয়। তাই ‘নো-বাই’-এর পাশাপাশি জনপ্রিয় হয়েছে ‘লো-বাই’ ধারণাও। ‘নো-বাই’-এ কেউ নির্দিষ্ট ধরনের পণ্য একেবারেই না কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
আর ‘লো-বাই’-এ পুরোপুরি বন্ধ না করে কেনাকাটার একটি সীমা ঠিক করা হয়। যেমন এক মাসে একটি নতুন পোশাক কেনা যাবে, কিন্তু তার বেশি নয়। অথবা নতুন কোনো স্কিনকেয়ার কেনার আগে ঘরে থাকা একই ধরনের পণ্য শেষ করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ‘নো-বাই চ্যালেঞ্জ’ শুধু টাকা বাঁচানোর হিসাব নয়। বরং নিজের কেনাকাটার অভ্যাসটা একটু নতুন করে দেখার সুযোগ। কী কিনছি, কেন কিনছি, আর সত্যিই সেটি দরকার কি না, এই প্রশ্নগুলোই চ্যালেঞ্জটির সবচেয়ে বড় অংশ।
সূত্র: নিউজ উইক, ডেইলি রয়টার্স
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>