জাতীয়

ক্যামেরার ফ্রেমে অন্যের স্বপ্ন বন্দি করেন কুষ্টিয়ার আনন্দ

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
নাজমুল হুসাইন নিজের ক্যামেরা ছিল না, ফটোগ্রাফির প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জ্ঞানও ছিল না। ছিল শুধু ছবি তোলার প্রতি অদ্ভুত এক টান। ছোটবেলা থেকেই ভালো কোনো ছবি দেখলেই অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করতো কুষ্টিয়ার ছেলে জহির উদ্দিন আনন্দের মনে। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে আনন্দের রয়েছে বড় এক বোন। কুষ্টিয়াতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা তার। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। তখনো ফটোগ্রাফি তার জীবনের পেশা নয়, বরং মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক ভালো লাগা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তিন বন্ধুর সঙ্গে চায়ের আড্ডা থেকেই একদিন শুরু হয় সেই ভালো লাগাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প। তিনজন মিলে চায়ের আড্ডায় বসে ছোট্ট পরিকল্পনা করেন ফটোগ্রাফি নিয়ে কিছু একটা করবেন। নিজস্ব ক্যামেরা ছিল না আনন্দের। এক বন্ধুর ক্যামেরাই হয়ে ওঠে তার প্রথম ভরসা। সেই ক্যামেরা হাতে নিয়ে কয়েকটি ছবি তোলেন। ছবিগুলো খুব বেশি কিছু না ভেবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এরপরই আসে অপ্রত্যাশিত সাড়া। ছবিগুলো মানুষের নজর কাড়ে, প্রশংসা আসে। অথচ তখনো আলো, কম্পোজিশন কিংবা ক্যামেরার জটিল সেটিংস ফটোগ্রাফির মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। মানুষের প্রশংসা আর নিজের ভেতরের ভালো লাগা তাকে ধীরে ধীরে আরও গভীরে টেনে নেয় ছবির জগতে। আরও পড়ুন আলোকচিত্র: সময় যেখানে জীবন্ত! তিন বন্ধু মিলে শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে অন্য দুজন নিজেদের আলাদা পথ বেছে নেন। কিন্তু আনন্দের পথ তখন তৈরি হয়ে গেছে। ছবি তোলার নেশা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তার জীবনের অন্যতম পরিচয়। শুরু হয় শেখার দীর্ঘ পথ। কাজ করতে করতে শেখা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, আলো-ছায়ার ভাষা বোঝা এবং একটি মুহূর্তের ভেতর লুকিয়ে থাকা গল্পকে খুঁজে বের করা। তবে এই পথচলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। শুরুর দিকে আশপাশের অনেকেই এই পেশা নিয়ে নানা কথা বলতেন। পরিবার থেকেও পুরোপুরি সমর্থন শুরুতে মেলেনি। আনন্দের মা তার শখকে প্রথম থেকেই সমর্থন করতেন, কিন্তু এটিকে যে একদিন পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে বেছে নেবেন সেটি শুরুতে মেনে নিতে পারেননি। পরে আনন্দ যখন নিজের কাজ দিয়ে ভালো করতে শুরু করেন, ধীরে ধীরে পরিচিতি ও সাফল্য আসে, তখন মায়ের সমর্থনও আরও দৃঢ় হয়। প্রকৌশলের পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যামেরার সঙ্গে তার সম্পর্কও গভীর হতে থাকে। একসময় শখের কাজকে পেশাদার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর একে একে আসতে থাকে সাফল্যও। ২০১৮ সালে ডব্লিউপিপিবি আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ‘গ্রুম সিঙ্গেল’ ক্যাটাগরিতে প্রথম রানারআপ হওয়ার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন আনন্দ। পরের বছর ২০১৯ সালে একই প্ল্যাটফর্মে অর্জন করেন আরও তিনটি পুরস্কার। ধারাবাহিক এই অর্জনগুলো তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার পথকে শক্ত করে। এরপর ২০২৫ সালে সনি আলফা কানেক্ট ডে-এর প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হওয়ার সাফল্যও যুক্ত হয় তার অর্জনের তালিকায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালের গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড কোনো আকস্মিক সাফল্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের চর্চা, অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক অর্জনের পরিণতি। আরও পড়ুন ৮ বছর আগে ফটোগ্রাফারের করা এক ভুল, সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ ছবিটির বিশেষ করে ওয়েডিং ফটোগ্রাফিকে তিনি শুধু ছবি তোলার কাজ হিসেবে দেখেননি; মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে স্মৃতিতে ধরে রাখার শিল্প হিসেবে নিয়েছেন। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যেখানে অন্যরা শুধু আনন্দ দেখেন, একজন ফটোগ্রাফারকে সেখানে খুঁজে নিতে হয় চোখের কোণের জল, হঠাৎ ফুটে ওঠা হাসি, প্রিয় মানুষকে ঘিরে আবেগ কিংবা কয়েক সেকেন্ডের এমন কোনো মুহূর্ত, যা হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না। সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে করতে নিজেকেও বদলেছেন আনন্দ। আর সেই বদলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি এসেছে ২০২৬ সালে। ওয়েডিং ফটোগ্রাফারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের আয়োজিত জাতীয় বিবাহ আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘ফরএভার স্টোরি: চ্যাপ্টার ১’-এ দেশের ৩০টিরও বেশি জেলা থেকে জমা পড়ে তিন হাজারের বেশি ছবি ও ভিডিও। কঠোর বিচার ও বাছাইয়ের পর প্রদর্শনীর জন্য জায়গা পায় মাত্র ১৪০টি ছবি। হাজারো ফ্রেমকে পেছনে ফেলে আনন্দের একটি ছবি অর্জন করে প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘গ্র্যান্ড উইনার অ্যাওয়ার্ড’। একই আয়োজনে তার আরেকটি ছবি প্রথম স্থান অর্জন করে ‘ব্রাইড সিঙ্গেল পোর্ট্রেট’ ক্যাটাগরিতে। এক ছবিতে গ্র্যান্ড উইনার, আরেক ছবিতে ক্যাটাগরি সেরা একই মঞ্চে জোড়া সাফল্য। কিন্তু গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড পাওয়া ছবিটির গল্প আরও চমকপ্রদ। মিশি ও অনিকের সঙ্গে কক্সবাজারে ছবি তোলার পরিকল্পনা চলছিল অনেক দিন ধরেই। অথচ কক্সবাজারের শুট যেন আনন্দের জন্য বরাবরই দুর্ভাগ্যের। প্রতিবারই কোনো না কোনো সমস্যায় শুট নষ্ট হয়ে যায়। এবারও প্রথম দিন শুটে যাওয়ার পর শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। ২০-৩০ মিনিট চুপচাপ বসে ছিলেন আনন্দ। মনে হচ্ছিল, এবারও কি ভালো ছবি পাওয়া হবে না? কিন্তু হতাশার মধ্যেই বদলে গেল পরিকল্পনা। আপু-ভাইয়াকে বললেন, ‘বৃষ্টিতে ভিজতে হবে, চলুন।’ ক্যামেরা ও লাইটকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখতে সঙ্গে নেওয়া হলো কিছু কাপড়। এরপর বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হলো শুট। আরও পড়ুন মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে শাড়ি-স্যান্ডেল পরে ম্যারাথনে মা আনন্দের পুরো টিম রাফি, আশিক, নাফিস ও প্রিতম তার সঙ্গে কাকভেজা হয়ে গেলেন। প্রতিকূল আবহাওয়াকে বাধা না ভেবে সেটিকেই ছবির সৌন্দর্যের অংশ বানিয়ে ফেললেন তারা। শেষ পর্যন্ত তৈরি হলো সেই ফ্রেম, যা পরে জাতীয় পর্যায়ে জিতে নিল গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড। শুট শেষ করে ফেরার পর আরও একটি ঘটনা ঘটে-আনন্দের একটি ফ্ল্যাশ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তাতেও তার কোনো আক্ষেপ ছিল না। কারণ তার কাছে একটি ফ্ল্যাশ আবার কেনা সম্ভব, কিন্তু এমন একটি ছবি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। যে মানুষটির হাতে একসময় নিজের কোনো ক্যামেরাই ছিল না, সেই মানুষটির ছবিই আজ হাজারো ফ্রেমকে পেছনে ফেলে দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শেখা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যর্থতা ও অর্জনের ধারাবাহিকতা। ২০১৮-এর প্রথম রানার আপ, ২০১৯-এর তিনটি পুরস্কার, ২০২৫-এর সনি আলফা কানেক্ট ডে-এর প্রথম রানারআপ এবং সবশেষে ২০২৬-এর গ্র্যান্ড উইনার প্রতিটি অর্জন যেন আনন্দের ফটোগ্রাফি-যাত্রার একেকটি মাইলফলক। তাই আনন্দের এই সাফল্য শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি একটি স্বপ্নের দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি। এটি প্রমাণ করে, শুরুতে দামি ক্যামেরা কিংবা বড় সুযোগ না থাকলেও স্বপ্ন, শেখার আগ্রহ আর থেমে না যাওয়ার মানসিকতা থাকলে পথ তৈরি করা যায়। বন্ধুর ক্যামেরায় তোলা কয়েকটি ছবি থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ তাকে নিয়ে এসেছে জাতীয় মঞ্চের শীর্ষে। আরও পড়ুন ডাকপিয়নের ব্যাগ-ডিজিটাল ইনবক্স, প্রিয়জনের বার্তা কি একই আবেগ নিয়ে আসে? কুষ্টিয়ার সেই তরুণ এখন কুষ্টিয়াতেই ক্যাপচার মোমেন্টেসের প্রতিষ্ঠাতা ও পেশাদার ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে নিজের গল্প লিখছেন। আর তার কাছে এই অর্জন কোনো শেষ অধ্যায় নয় বরং আরও বড় গল্পের শুরু। কারণ একটি ভালো ছবি যেমন একটি গল্পের সমাপ্তি নয়, বরং পরের গল্পের সূচনা করে; তেমনি জাতীয় পর্যায়ের এই স্বীকৃতিও আনন্দের সামনে খুলে দিয়েছে আরও বড় স্বপ্নের পথ। লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেএসকে
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>