বিজ্ঞাপন
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকারের নীতিতে বড় পরিবর্তন ঘিরে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে তৈরি পণ্যের সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার যুক্তরাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি আরও ১১টি দেশ একই পদক্ষেপ নেওয়ায় তেল আবিবের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
লন্ডনের কর্মকর্তারা আগে থেকেই জানতেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতিতে এমন বড় পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া কঠোর হবে। তবে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া যে এত দ্রুত ও তীব্র হবে, তা তারা কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখেছেন। এরই মধ্যে পূর্ব জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া ও গাজা সাপোর্ট সেন্টার থেকে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল।
পশ্চিম তীরের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের যোগাযোগ ও রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি কাজের ক্ষেত্রে জেরুজালেমের কনস্যুলেটটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গাজায় স্থিতিশীলতা ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য গত বছর গঠিত আন্তর্জাতিক গাজা সাপোর্ট সেন্টারেও যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিরা কাজ করছিলেন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স, স্পেন ও কানাডাসহ আরও ১১টি দেশের নেওয়া পদক্ষেপের রাজনৈতিক গুরুত্বই ইসরায়েলের উদ্বেগের বড় কারণ। বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্য ইসরায়েলের মোট রপ্তানির বড় অংশ না হলেও, এসব পণ্যকে আলাদাভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিকে অবৈধ বলে আসছে। তবে এতদিন সেসব বসতিতে উৎপাদিত বা চাষ করা পণ্য নিষিদ্ধ করেনি তারা। এবার যুক্তরাজ্য ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায়ের সঙ্গে একমত হয়ে বলেছে, ইসরায়েলের পুরো দখলদারত্ব, এমনকি দেশটির সামরিক উপস্থিতিও বেআইনি।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের যুক্তি, অর্থনৈতিক সম্পর্কেও এই অবস্থানের প্রতিফলন থাকা উচিত।
ফলে শুধু বসতিতে উৎপাদিত পণ্য নয়, সেখানে নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন বা অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। দখলদারত্বে সরাসরি ‘বস্তুগতভাবে অবদান রাখে’ এমন অস্ত্র বিক্রির ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ প্রত্যাশার চেয়েও কঠোর বলে মনে করা হচ্ছে।
মিলিব্যান্ডের বক্তব্যের ভাষাও তাৎপর্যপূর্ণ। নিজেকে ‘গর্বিত ব্রিটিশ ইহুদি’ ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের ‘অটল সমর্থক’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি আগের অনেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তুলনায় সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের ‘সন্ত্রাসবাদ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে’ ও এর কারণে ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নির্মূল’ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সরকার এসব ঘটনায় ‘চোখ বন্ধ করে রেখেছে’ বলেও অভিযোগ করেছেন। মিলিব্যান্ড একে যুক্তরাজ্যের নীতির ‘রিসেট’ বা পুনর্গঠন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইসরায়েলে নির্বাচন সামনে থাকায় উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সারের কঠোর প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অধিকাংশ ইসরায়েলিই তার ক্ষোভের সঙ্গে একমত হতে পারেন। যদিও অনেক ইসরায়েলি উগ্র ও ধর্মীয় উন্মাদনায় প্রভাবিত কিছু বসতিস্থাপনকারীর সহিংস আদর্শকে সমস্যাজনক মনে করেন ও কেউ কেউ তাদের জাতীয়ভাবে বিব্রতকর বিষয়ও মনে করেন। তবুও ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে দখল করা ভূমিতে বসতি স্থাপনকে অবৈধ বলা হলে তারা তীব্রভাবে আপত্তি করবেন।
আন্তর্জাতিক চাপও ইসরায়েলিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ইউরোভিশন ও বিভিন্ন ক্রীড়া অনুষ্ঠানে বিক্ষোভ, ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা ও এবার বসতি-উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক নিন্দার দেয়াল আরও ঘন হয়ে আসছে বলে মনে করছেন অনেকে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরা যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তকে অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়ে ইসরায়েলের ‘অবৈধ বসতি প্রকল্প’ বন্ধে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
লন্ডনে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলত একে যুক্তরাজ্য-ফিলিস্তিন সম্পর্কের ‘মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত’ বলেছেন। তার মতে, যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপ ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করবে।
তবে জোমলতও জানেন, ইসরায়েলের ৫৯ বছরের দখলদারত্ব এখনো শেষ হয়নি, এমনকি বড় কোনো পরিবর্তনও আসেনি। কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এখনো অত্যন্ত ক্ষীণ। ১২টি দেশের সমন্বিত পদক্ষেপ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ থামাতে পারবে- এমন তাৎক্ষণিক কোনো লক্ষণও নেই।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক শামিরকে অধিকৃত এলাকায় বসতি স্থাপনে ঋণের অর্থ ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দিতে চাপ দেন। শামির রাজি না হওয়ায় ১০ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের ঋণ নিশ্চয়তা আটকে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঠেকাতে আগ্রহ দেখাননি। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের কিছু অংশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সমালোচনা করলেও ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি একজন কট্টর খ্রিষ্টান জায়নবাদী।
হাকাবি পশ্চিম তীর ইহুদিদের জন্য ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমি- ইসরায়েলের এই অবস্থানকে সমর্থন করেন। ফলে যুক্তরাজ্য ও তার মিত্রদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধেই নয়, ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রধান সমর্থকের বিরুদ্ধেও অবস্থান তৈরি করছে।
সূত্র: বিবিসি
এসএএইচ
বিজ্ঞাপন