বিজ্ঞাপন
ইতিহাসে অনেক শাসক বিশাল সাম্রাজ্য জয় করেছেন, কিন্তু বিজিত ভূখণ্ডকে সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে রূপ দিতে পেরেছেন খুব কম জনই। আবার কেউ কেউ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছেন, কিন্তু সেই কাঠামোর কেন্দ্রে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে স্থান দিতে পারেননি। খোলাফায়ে রাশেদিনের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর শাসনামল এই দুই দিক থেকে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তার সময়ে মুসলিম রাষ্ট্র দ্রুত বিস্তৃত হয়ে বিশাল ভূখণ্ডে পরিণত হয়। সেই বিস্তৃত রাষ্ট্রকে পরিচালনার জন্য তিনি যে প্রশাসনিক ও রাজস্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল যোগ্যতা, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং জনকল্যাণ।
বিশাল রাষ্ট্র, সুসংগঠিত প্রশাসন
হজরত ওমর (রা.) খলিফা হওয়ার পর মুসলিম রাষ্ট্রের পরিধি দ্রুত বাড়তে থাকে। ইরাক, সিরিয়া, মিসর, পারস্যসহ একের পর এক অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। এত বিশাল ভূখণ্ডকে কেন্দ্র থেকে সরাসরি পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশ ও প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করেন।
প্রতিটি প্রদেশে নিযুক্ত করা হয় একজন ওয়ালি বা গভর্নর। তার অধীনে থাকত রাজস্ব, বিচার, সেনাবাহিনী, কোষাগার ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিভাগ। স্থানীয় পর্যায়েও আমিল ও কাজি নিয়োগ করা হতো। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা হয়ে ওঠে বিকেন্দ্রীভূত, কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত।
ওমরের (রা.) প্রশাসনিক দক্ষতার সবচেয়ে বড় দিক ছিল শুধু দফতর সৃষ্টি নয়; বরং সঠিক পদে সঠিক মানুষ নির্বাচন। কোনো ব্যক্তি শুধু প্রভাবশালী বা অভিজাত হওয়ার কারণে সরকারি পদ পেতেন না। তার যোগ্যতা, সততা, ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বিবেচনা করা হতো।
শাসক নন, জনগণের সেবক
ওমরের (রা.) প্রশাসনিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক ধারণা; রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা জনগণের মালিক নন, বরং জনগণের সেবক।
কর্মকর্তাদের নিয়োগের সময় তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা লিখিতভাবে নির্ধারণ করা হতো। কর্মস্থলে গিয়ে সেই নির্দেশনামা জনগণের সামনে পাঠ করতে হতো। এর ফলে জনগণ জানতে পারত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ক্ষমতার সীমা কোথায় এবং তার কাছ থেকে কী ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত।
তিনি কর্মকর্তাদের বিলাসিতা থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দিতেন। তাদের প্রাসাদসদৃশ বাসস্থান, দেহরক্ষী কিংবা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করে এমন জীবনযাপন পছন্দ করতেন না। তার আশঙ্কা ছিল, শাসক ও জনগণের মধ্যে দেয়াল তৈরি হলে ক্ষমতার অপব্যবহার সহজ হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন
খলিফা ওমরের (রা.) জনমুখী শাসনের গল্প
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
ওমর (রা.) বুঝেছিলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনের সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণের সময় নিজের সম্পদের হিসাব দিতেন। পরে সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গেলে তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতো।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ সরকারি পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে ব্যবহারের পথ তিনি বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার নিয়মিত পরিদর্শন ও অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা। প্রতি বছর হজের সময় প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের মক্কায় উপস্থিত হতে হতো। সেখানে তাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব নেওয়া হতো এবং জনগণের অভিযোগ শোনা হতো।
কোনো কর্মকর্তা অন্যায় করলে তার পদমর্যাদা তাকে রক্ষা করতে পারত না। একবার একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে এক ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওমর (রা.) তার বিরুদ্ধে শাস্তির নির্দেশ দেন। এতে তার প্রশাসনিক দর্শনের একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, আইনের কাছে কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিকের মর্যাদা সমান।
অভিযোগ তদন্তে স্বাধীনতা
প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে ওমর (রা.) তা উপেক্ষা করতেন না। বরং তদন্তের জন্য বিশ্বস্ত সাহাবিদের দায়িত্ব দিতেন। মুহাম্মদ ইবন মুসলিমাহ (রা.) এর মতো ব্যক্তিদের এ কাজে ব্যবহার করা হতো। তাদের দায়িত্ব ছিল অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং সরাসরি খলিফার কাছে রিপোর্ট পেশ করা।
কোনো গভর্নর বা সেনাপতি যতই জনপ্রিয় কিংবা সফল হোন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হতে পারত। সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) এর মতো বিশিষ্ট সেনাপতির বিরুদ্ধেও অভিযোগ তদন্ত করা হয়েছিল।
এখানে প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি দেখা যায়। ব্যক্তির মর্যাদা নয়, অভিযোগের সত্যতা বিবেচ্য।
রাজস্বনীতি: বিজিত ভূমি কার?
ওমর (রা.) এর রাজস্বব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর একটি ছিল বিজিত কৃষিজমির মালিকানা নিয়ে তার সিদ্ধান্ত।
অনেক সাহাবি ও সেনাপতি মত দিয়েছিলেন, বিজিত জমি মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হোক। কিন্তু ওমর (রা.) এর বিরোধিতা করেন। তার যুক্তি ছিল, আজকের বিজয়ীদের মধ্যে সব জমি ভাগ করে দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী থাকবে? আর স্থানীয় কৃষকদের উৎখাত করা হলে উৎপাদনব্যবস্থা ধ্বংস হবে এবং সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হবে।
তিনি কোরআনের সুরা হাশরের আয়াতের আলোকে বিষয়টি বিবেচনা করেন। বিশেষত আল্লাহ বলেন, বিজিত সম্পদ যেন কেবল ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়; একই সঙ্গে মুহাজির, আনসার এবং পরবর্তী প্রজন্মের অধিকারও আয়াতে বিবেচিত হয়েছে।
ফলে বিজিত অঞ্চলের কৃষিজমি স্থানীয় কৃষকদের দখলে রাখার নীতি গ্রহণ করা হয়। তারা জমি চাষ করবে, উৎপাদন করবে এবং রাষ্ট্রকে নির্ধারিত হারে খরাজ বা ভূমি-কর দেবে। এর ফলে একদিকে কৃষকের অধিকার রক্ষা পেল, অন্যদিকে রাষ্ট্রও একটি স্থায়ী রাজস্বব্যবস্থা পেল।
কৃষক ও উৎপাদনের সুরক্ষা
ওমর (রা.) শুধু কর আদায়ের কথা ভাবেননি; বরং কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন।
অনাবাদী জমি আবাদ করার জন্য তিনি উৎসাহ প্রদান করেন। কেউ অনাবাদী জমিকে আবাদ করলে তার মালিকানা স্বীকৃত হওয়ার নীতি চালু করা হয়। আবার দীর্ঘদিন জমি অনাবাদী ফেলে রাখলে মালিকানা হারানোর বিধানও ইসলামী ভূমিনীতি-সংক্রান্ত সাহিত্যে আলোচিত হয়েছে।
সেচব্যবস্থার উন্নয়নেও তিনি গুরুত্ব দেন। খাল খনন, বাঁধ নির্মাণ ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। কারণ তার কাছে রাজস্ব আদায়ের মূল শর্ত ছিল উৎপাদনশীল অর্থনীতি। কৃষকের ফসল নষ্ট করে রাজস্ব বাড়ানো নয়; বরং কৃষককে উৎপাদনে সক্ষম করাই ছিল তার লক্ষ্য।
এমন কি সামরিক অভিযানের সময়ও কৃষিজমি ও ফসলের ক্ষতি না করার নির্দেশ দেওয়া হতো। কোনো সৈন্যের কারণে কৃষকের ফসল নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নজিরও পাওয়া যায়।
বায়তুলমাল ও রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা
রাষ্ট্রের আয় বাড়তে থাকলে তা সংরক্ষণ ও সুষ্ঠুভাবে ব্যয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। ওমর (রা.) এর আমলেই কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সুসংগঠিত রূপ গড়ে ওঠে।
মদিনায় কেন্দ্রীয় কোষাগার স্থাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাদেশিক রাজধানীতেও কোষাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় কোষাগারে পাঠানো হতো।
এই অর্থ শুধু রাজপ্রাসাদ বা শাসকদের বিলাসিতায় ব্যয় করা হতো না। সৈন্যদের বেতন, সরকারি কর্মচারীদের পারিশ্রমিক, জনকল্যাণ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং নাগরিকদের নির্দিষ্ট ভাতা প্রদানে তা ব্যবহার করা হতো।
এখানে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে পৃথক রাখার একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেখা যায়।
দিওয়ান, আদমশুমারি ও হিজরি সন
প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নথিপত্র সংরক্ষণের প্রয়োজনও বাড়ে। ওমর (রা.) এ ক্ষেত্রে দিওয়ান ব্যবস্থা চালু করেন। নাগরিকদের তালিকা, সৈন্যদের বেতন ও ভাতা, সরকারি আয়-ব্যয় সবকিছু নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়।
রাষ্ট্রীয় বণ্টন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আদমশুমারিও গ্রহণ করা হয়।
এমন কি সরকারি নথিপত্রে সময়ের হিসাব নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন দেখা দিলে ওমর (রা.) এর আমলেই হিজরি সাল চালু হয়। হিজরতকে ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এর ফলে প্রশাসনিক নথি, চিঠিপত্র ও সরকারি হিসাব সংরক্ষণে একটি অভিন্ন কালপঞ্জি প্রতিষ্ঠিত হয়।
আরও পড়ুন
ইসলাম-পূর্ব যুগে কেমন ছিলেন ওমর (রা.)?
প্রশাসনের সাফল্যের পেছনে যে দর্শন
ওমরের (রা.) প্রশাসনিক সংস্কারকে শুধু প্রাচীন যুগের বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর পেছনে ছিল একটি সুসংহত রাষ্ট্রদর্শন।
তিনি জানতেন, শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে শক্তিশালী শাসক নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। কর্মকর্তা নিয়োগে যোগ্যতা, ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ, সম্পদের হিসাব, নিয়মিত তদন্ত, জনগণের অভিযোগ গ্রহণ, কৃষকের অধিকার রক্ষা, রাজস্বের ন্যায়সংগত বণ্টন, কোষাগারের স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার—সবকিছু মিলিয়ে তিনি এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্রের শক্তির চেয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল বড়।
আজকের পৃথিবীতে প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি, ভূমি ব্যবস্থাপনা কিংবা জনকল্যাণমূলক অর্থনীতি নিয়ে যত আলোচনা হয়, ওমর (রা.) এর শাসনামলের অভিজ্ঞতা সেখানে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
তথ্যসূত্র:
১. আবু ইউসুফ (রহ.), কিতাবুল খারাজ
২. আবু উবাইদুল কাসিম ইবন সাল্লাম, কিতাবুল আমওয়াল
৩. ইয়াহইয়া ইবন আদম, কিতাবুল খারাজ
৪. মুহাম্মদ ইবন জারির তাবারি, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক
৫. ইবন সা‘দ, তাবাকাতুল কুবরা
৬. ইবনুল জাওযি, মানাকিবু ওমর ইবনুল খাত্তাব
৭. আল মাওয়ারদি, আল আহকামুস সুলতানিয়্যাহ
৮. ইবন হাজর আল আসকালানি, ফাতহুল বারি
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন