বিজ্ঞাপন
পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণে তাৎক্ষণিকভাবে কাঙ্ক্ষিত আর্থিক সুফল পাওয়া না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ইতিবাচক প্রভাব অনেক বেশি। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি কর্মীদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা এবং টেকসই ব্যবসায়িক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই গ্রিন বিল্ডিংয়ের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেছেন আবাসন প্রতিষ্ঠান ইনস্টার লিমিটেডের পরিচালক এসএনআর তৌফিক।
জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন। রিয়েল এস্টেট খাতে পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত এই উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণ করেছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
জাগো নিউজ: পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন বিল্ডিং উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হলেন কেন?
এসএনআর তৌফিক: আমাদের কাছে গ্রিন সার্টিফিকেশন বা লিড সার্টিফাইড বিল্ডিংয়ের উদ্যোগটি কখনোই পুরোপুরি ব্যবসাকেন্দ্রিক ছিল না। বরং এটি ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। আমরা বিশ্বাস করি, যদি আমাদের ছোট কোনো উদ্যোগও পরিবেশের উপকারে আসে, তাহলে সেই সুফল আমরাও পাব। কারণ আমরা এই দেশের নাগরিক, এই শহরের বাসিন্দা। পরিবেশ ভালো থাকলে তার উপকার সবাই ভোগ করবে। শুরু থেকেই আমাদের মূল অনুপ্রেরণা ছিল এটিই। কোনো ক্রেতা চেয়েছেন বলে, কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণের জন্য আমরা এই উদ্যোগ নিইনি।
আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার ছিল কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা। একই সঙ্গে কারখানার আশপাশে বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপর যেন কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি।
ইনস্টার লিমিটেডের পরিচালক এসএনআর তৌফিক, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: গ্রিন বিল্ডিং বা লিড সার্টিফিকেশন বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
এসএনআর তৌফিক: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এর ব্যয়। এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রচলিত ভবনের তুলনায় একটি এলইইডি সনদপ্রাপ্ত ভবন নির্মাণে অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যয় হয়। কারণ দেশের বাইরে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি, উপযুক্ত নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হয়।
অতিরিক্ত বিনিয়োগ করলেও ভাড়া, বিক্রয়মূল্য বা পণ্যের দামের ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত বিনিয়োগের সমপরিমাণ বাড়তি মূল্য সব সময় পাওয়া যায় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্রেতার অগ্রাধিকার ও ব্যবসায়িক গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ।
জাগো নিউজ: তাহলে এর ব্যবসায়িক সুবিধা কোথায়?
এসএনআর তৌফিক: বড় সুবিধা হলো ‘প্রেফারেন্স’ বা অগ্রাধিকার পাওয়ায়। যখন একজন ক্রেতার সামনে একই দামে অফিস স্পেস বা ফ্লোর ক্রয়ের জন্য দুই ধরনের সুযোগ থাকে তখন পরিবেশবান্ধব স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয়, প্রচলিত ভবনের তুলনায়। এটিই আমাদের বড় সুবিধা এবং এটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেলিং পয়েন্টে পরিণত হয়েছিল। তবে বাস্তবতা হলো, এই ধরনের বিনিয়োগ বাণিজ্যিকভাবে এখনও চ্যালেঞ্জিং।
একটি বড় সুবিধা হলো, অনেক বহুজাতিক কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান গ্রিন বিল্ডিংকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে ভবন বা কারখানা মূল্যায়নের সময় আমরা প্রচলিত ভবনের তুলনায় বাড়তি সুবিধা পাই।
আরও পড়ুন
পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে ঝুঁকছে আবাসন-করপোরেট প্রতিষ্ঠান
সবুজ কারখানার সনদ পেল আরও ৩ কারখানা
জাগো নিউজ: একটি গ্রিন বিল্ডিংয়ে কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়?
এসএনআর তৌফিক: পরিবেশবান্ধব বিল্ডিংয়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো এবং জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনা।
এজন্য আমরা সর্বপ্রথম ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন বিশ্লেষণ করি। একটি ভবনে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয় কুলিং বা এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থায়। তাই আমরা উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো সিস্টেম ব্যবহার করি এবং এমন ব্র্যান্ড ও কনফিগারেশন নির্বাচন করি, যেগুলো সর্বোচ্চ জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করে।
আমরা বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (বিএমএস) ব্যবহার করি। অনেক বিষয় মানুষের পক্ষে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অটোমেশন সেই কাজটি করে দেয় এবং বিদ্যুতের অপচয় কমায়।
উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, আমাদের একটি ভবনের বেসমেন্টে অধিকাংশ লাইট সেন্সরভিত্তিক। সেখানে কেউ প্রবেশ করলেই কেবল সংশ্লিষ্ট অংশের আলো জ্বলে ওঠে। অন্য সময় আলো নিভে থাকে। নিরাপত্তার জন্য কিছু লাইট সব সময় জ্বালানো থাকে, যাতে সিসিটিভি পর্যবেক্ষণে সমস্যা না হয়।
প্রথমে এই সাশ্রয় খুব বড় মনে না হলেও কয়েক বছরের ব্যবধানে এর প্রভাব অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। ইনস্টার লিমিটেডের পরিচালক এসএনআর তৌফিক, ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি আর কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়?
এসএনআর তৌফিক: আমরা প্রতিটি যন্ত্রপাতি এনার্জি এফিসিয়েন্সি বিবেচনা করে নির্বাচন করি। এতে ভবনের তাপ উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খরচ কমে, এয়ার কন্ডিশনারের ওপর চাপ হ্রাস পায় এবং সামগ্রিক শক্তি ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পরিশোধনের মাধ্যমে ভবনের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করি, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমে। শুধু বাগানে ব্যবহারের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে আমি খুব কার্যকর মনে করি না, কারণ বর্ষায় বাগানে আলাদা পানি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। আমাদের লক্ষ্য বৃষ্টির পানি পরিশোধন করে ভবনের মূল পানির ব্যবস্থায় যুক্ত করা। পাশাপাশি আংশিক গ্রে ওয়াটার পুনর্ব্যবহার করি এবং টয়লেটের বর্জ্যপানি এসটিপিতে পরিশোধন করে গ্রহণযোগ্য মানে নিষ্কাশন করি।
জাগো নিউজ: ছোট ছোট প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলো কতটা কার্যকর?
এসএনআর তৌফিক: খুবই কার্যকর। ধরুন, একটি সাধারণ পানির কলের সঙ্গে যদি উন্নত মানের অ্যারেটর ব্যবহার করা হয়, তাহলে পানির সঙ্গে বাতাস মিশে প্রবাহ তৈরি হয়। এতে হাত ধোয়ার মতো কাজে অনেক কম পানি লাগে, আবার পানির ছিটাও কম হয়।
এ ধরনের ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি ভবনে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আমার মতে, গ্রিন বিল্ডিং কোনো একটি বড় প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। বরং অসংখ্য ছোট ছোট কার্যকর উদ্যোগের সমন্বয়ই একটি ভবনকে সত্যিকার অর্থে পরিবেশবান্ধব করে তোলে।
আরও পড়ুন
আমাদের নিজস্ব গ্রিন বিল্ডিং রেটিং ব্যবস্থা জরুরি
সবুজ সনদ পেলো আরও দুই পোশাক কারখানা
জাগো নিউজ: আপনারা কিভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকেন? এসএনআর তৌফিক: আমরা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করি, বিশেষ করে রুফটপ সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে। আমরা সাধারণত অন-গ্রিড সিস্টেম ব্যবহার করি, যেখানে ব্যাটারি সংরক্ষণ না করে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে পাঠানো হয়। এটি নেট মিটারিং সিস্টেমের মাধ্যমে হিসাব করা হয়। এর ফলে উৎপাদিত প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়।
জাগো নিউজ: কোন ধরনের নীতি পরিবেশবান্ধব স্থাপনাকে উৎসাহী করবে?
এসএনআর তৌফিক: সবুজ ভবন বা পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হলে বাস্তবসম্মত নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। যেমন—সবুজ ভবনের জন্য কর ছাড়, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং আমদানি শুল্কে ছাড় দেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে এসব সুবিধা থাকলেও প্রক্রিয়াগুলো জটিল। যদি এগুলো সহজ করা হয়, তাহলে আরও বেশি বিনিয়োগকারী এ খাতে আগ্রহী হবে।
আরও পড়ুন
পরিবেশবান্ধব কারখানায় ৫% সুদে ঋণ, ১০০০ কোটি টাকার গ্রিন তহবিল গঠন
শ্রমিক যেখানে সবুজ বিপ্লবের স্বপ্নসারথি
জাগো নিউজ: আপনাদের ক্লায়েন্ট কারা? এসএনআর তৌফিক: আমাদের পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের সংখ্যা খুব বেশি নয়। আমরা সীমিত সংখ্যক কিন্তু উচ্চমানের প্রকল্প করি। বর্তমানে যেসব কমার্শিয়াল প্রকল্প চলছে, সেগুলোর মান খুবই ভালো। আমাদের অধিকাংশ ক্লায়েন্ট করপোরেট প্রতিষ্ঠান। তারা সাধারণত পরিবেশ ও মানের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখে।
জাগো নিউজ: আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
এসএনআর তৌফিক: পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়বে। তবে এটি বাজারের চাহিদা এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। যে প্রতিষ্ঠান আগে শুরু করবে, সে কিছুটা ব্যয়বহুল অবস্থায় থাকবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অন্যরাও এই পথে আসবে।
আমরা সবসময় চেষ্টা করি প্রতিটি নতুন প্রকল্পকে আগের চেয়ে আরও উন্নত করতে। প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে শিখে আমরা পরবর্তী প্রকল্পকে আরও কার্যকর, আরও পরিবেশবান্ধব এবং আরও উন্নত করার চেষ্টা করি। এটাই আমাদের মূল দর্শন।
আইএইচও/এমএমএআর
বিজ্ঞাপন