ব্রেকিং নিউজ
জাতিসংঘে ইরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো’ বৈঠক হয়েছে: ট্রাম্প ৭ জেলায় ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস ধারদেনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, অর্থাভাবে পাঁচ মাস পর ফিরলেন বাড়িতে ১৯ বছর পর করা অপির সিনেমা এবার দেখা যাবে ঘরে বসেই আয়কর রিটার্ন জমায় করছাড় নিয়ে জটিলতা, অগ্রিম করের ওপর ছাড় নেই তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক, সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যয় ‘সাথী’ আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে: প্রিয়াঙ্কা পত্রিকা: 'বোয়িংয়ের সাথে চুক্তি চূড়ান্তের পথে, এয়ারবাস নিয়ে ফ্রান্সের চাপ' তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক: সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যয় ‘আমি আসলে এক চরম আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে আছি’—কীভাবে অনলাইনে যৌন নিপীড়নের ভয়ানক ফাঁদ পাতছে অপরাধীরা
জাতীয়

ঘরে ঘরে যখন জ্বর, তখন কীভাবে বুঝব কোনটা জটিল আর কোনটায় শঙ্কা নেই

P
Prothom Alo অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
‘জ্বর’ নিজে কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গমাত্র; তাই রোগীভেদে কারণটাও ভিন্ন

মৌসুম বদলের এই সময় ঘরে ঘরে জ্বর। কারও ডেঙ্গু, কারও চিকুনগুনিয়া, কারও হাম, কারও আবার সাধারণ ফ্লু। বেশির ভাগ জ্বর কয়েক দিনের ভোগান্তির পর সেরে গেলেও কারও কারও কিন্তু বিপদ নেমে আসছে। কাউকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে, কারও কারও আবার মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে।

কে যে সহজেই সেরে উঠবেন, আর কার জটিলতা দেখা দেবে—শুরুতে তা বোঝা মুশকিল। যেহেতু ‘জ্বর’ নিজে কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গমাত্র; তাই ভেতরের গল্পটা রোগীভেদে ভিন্ন।

জ্বরের তীব্রতা ও স্থায়িত্বকাল, রোগীর বয়স, নারীদের গর্ভকালীন সময়, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, সাম্প্রতিক ভ্রমণ ইতিহাস প্রভৃতি পর্যালোচনার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা তাই জরুরি। আর সেই সঙ্গেই জরুরি সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং।

জ্বর হলেই আতঙ্ক নয়, তবে ‘আরেকটু দেখি’ বা ‘এ আর এমন কি’—এমনটা ভেবে অবহেলা করাও অনুচিত। কেননা জ্বরের পেছনে থাকতে পারে ফ্লু, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া, প্রস্রাবে ইনফেকশন, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হেপাটাইটিস থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুতর সংক্রামক ব্যাধিও।

নানা কারণে এখন জ্বর

  • এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণের ধরনে কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয় হচ্ছে। উচ্চমাত্রার জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও গিরাব্যথা, বমিভাব, র‍্যাশ ইত্যাদি থাকতে পারে। কিন্তু ডেঙ্গুর সবচেয়ে সংকটের সময়টি হলো জ্বর সেরে যাওয়ার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা। এ সময় কিছু রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে, দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা। তাই বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা, রক্তপাত, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, পানিশূন্যতা ইত্যাদি ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণগুলো খেয়াল রাখতে হবে। এসবে ভুগতে থাকলে বাড়িতে বসে না থেকে অবশ্যই হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। সাধারণত ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রয়োজন নেই, প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য যেকোনো ব্যথানাশক ওষুধ বা স্টেরয়েড সেবন করাটাও বরং বিপজ্জনক। এ সময় পর্যাপ্ত পানি ও তরল খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের সিবিসি, হিমাটোক্রিট, এসজিপিটি ইত্যাদি মনিটরিং করতে হবে। আনুষঙ্গিক চিকিৎসাব্যবস্থাও মেনে চলতে হবে।

  • চিকুনগুনিয়াতে জ্বরের সঙ্গে তীব্র জয়েন্টের ব্যথা ও প্রদাহ থাকে। হাত-পায়ের জয়েন্ট ফুলে যেতে পারে, হাঁটাচলা, এমনকি নড়াচড়া করতেও কষ্ট হয়। মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, র‍্যাশ ও দুর্বলতা থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে জয়েন্টের ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কখনো দেখা যায়, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর বাতরোগ ধরা পড়ে এবং তা স্থায়ী হয়ে যায়। তাই এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ প্রয়োজন। চিকুনগুনিয়া হলে রোগীর কষ্ট এবং ব্যথা তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি হয় কিন্তু এতে ডেঙ্গুর মতো জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা কম।

  • ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণত হঠাৎ জ্বর, দুর্বলতা, সর্দি-কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা এবং সারা শরীরে ব্যথা দিয়ে শুরু হয়। উপসর্গভিত্তিক সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে বেশির ভাগ মানুষ কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ফ্লু মানেই সব সময় হেলাফেলার বিষয় নয়। যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, যেমন শিশু, বৃদ্ধ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনির রোগ, ক্যানসার বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে যাঁরা ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া বা গুরুতর সংক্রমণও হতে পারে। সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে গিয়ে সেপসিস হয়ে যেতে পারে। তাই সব সময় এটিকে ‘সাধারণ জ্বর’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

  • টাইফয়েড জ্বর একটানা কয়েক দিন থাকে এবং দিনে দিনে জ্বরের তীব্রতা বাড়ে। দুর্বলতা, মাথাব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকতে পারে। যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু না করলে অন্ত্রে রক্তক্ষরণ বা ছিদ্রের মতো গুরুতর সমস্যা থেকে শুরু করে নানাবিধ জটিলতা হতে পারে। তাই টানা কয়েক দিন ধরে জ্বর, যা ক্রমশ বাড়ে এবং কিছুতেই কমে না, সে ক্ষেত্রে একে শুধু ‘ভাইরাল জ্বর’ ভেবে বসে থাকা ঠিক নয়। সাধারণত রক্তের কালচার করে সালমোনেলা টাইফি জীবাণু শনাক্ত করার মাধ্যমে টাইফয়েড শনাক্ত করা যায়। টাইফয়েড হলে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক বিশেষ ডোজে বেশ কিছুদিন ধরে সেবন বা ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। টাইফয়েডের চিকিৎসা যথাসময়ে শুরু না করলে গুরুতর জটিলতা হতে পারে।

  • তীব্র জ্বরের সঙ্গে কাশি, কফ, বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে নিউমোনিয়াও হতে পারে। শুরুতে সাধারণ সর্দি কাশির মতো মনে হলেও নিউমোনিয়া দ্রুত খারাপের দিকে চলে যেতে পারে। ফুসফুসে সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে, কমে যেতে পারে অক্সিজেন। এখনো সংক্রমণজনিত মৃত্যু, বিশেষ করে শিশুমৃত্যুর কারণ হিসেবে নিউমোনিয়া সারা বিশ্বে প্রথম কাতারে আছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের অবস্থা দ্রুত খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাস, শিশুদের বুক দেবে যাওয়া, ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া কিংবা কথা বলতেও কষ্ট হওয়া—এমন সব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।

  • মূত্রনালির সংক্রমণেও জ্বর নিয়ে রোগী আসেন। সাধারণত নারীদের ক্ষেত্রে প্রস্রাবে ইনফেকশন বেশি দেখা যায়। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কারণে এ সমস্যা হতে পারে। প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, বারবার প্রস্রাবের বেগ বা তলপেটে অস্বস্তিবোধ থাকতে পারে। সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে জ্বরের সঙ্গে কাঁপুনি, বমি এবং কোমর বা পিঠের এক পাশে ব্যথা হতে পারে। সঠিকভাবে চিকিৎসা না হলে গুরুতর অবস্থায় এই সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে ‘সেপসিস’ পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। প্রস্রাবে সংক্রমণ খুবই পরিচিত একটি সংক্রমণ, তাই জ্বর হলে একে ভুলে গেলে চলবে না।

  • জ্বরের সঙ্গে যদি তীব্র মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ, খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া দরকার। এসব লক্ষণ মস্তিষ্কের গুরুতর সংক্রমণে (মেনিনজাইটিস বা এনকেফালাইটিস) হলে দেখা দেয়। দ্রুত চিকিৎসা না হলে জীবনহানির ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসার দরকার হয়। মস্তিষ্কের এসব সংক্রমণ ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া—দুই ধরনেরই সংক্রমণের কারণেই হতে পারে।

  • জ্বরের সঙ্গে ক্ষুধামান্দ্য, বমি, পেটব্যথা, চোখ ও শরীর হলুদ হয়ে যাওয়া, গাঢ় বা হলুদ প্রস্রাব দেখা দিলে হেপাটাইটিস কি না, তা ভাবতে হবে। দূষিত পানি থেকে ছড়ায় বলে আমাদের দেশে এটি খুবই পরিচিত একটি রোগ। এমনটা হলে কবিরাজি ব্যবস্থা নিয়ে কালক্ষেপণ না করে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা শ্রেয়। নয়তো লিভারের গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।  

  • স্বল্প বা অধিকমাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উপসর্গ যেমন কাশি, ওজন হ্রাস, রক্তশূন্যতা ইত্যাদি থাকলে রোগটি যক্ষ্মা বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ কি না, তা নির্ণয় করে চিকিৎসা নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে

শুধু লক্ষণ দেখে সব সময় জ্বরের কারণ নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাই জ্বর হলে একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো। লক্ষণ বুঝে রক্ত, প্রস্রাব, কফ পরীক্ষা, ফুসফুসের পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা প্রয়োজন অনুযায়ী করে যথোপযুক্ত চিকিৎসা নিলে শঙ্কামুক্ত থাকা যায়। কখনোই নিজে নিজে বা দোকানির পরামর্শে  অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। এতে রোগনির্ণয়ে বিলম্ব ঘটে এবং অ্যান্টিবায়োটিক আর পরে কাজ করে না।

জ্বর বা অসুস্থতা হলে ডায়াবেটিসের রোগীদের ইনসুলিন বন্ধ করে রাখা প্রাণঘাতী হতে পারে। বয়স্ক রোগীদের ইনফেকশন থাকলে অচেতন হয়ে যাওয়া বা প্রলাপ করা বিপজ্জনক লক্ষণ। তাই এ ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে।

শিশু, বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা দরকার। সাম্প্রতিক ভ্রমণের ইতিহাস থাকলে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত সংক্রমণ যেমন ম্যালেরিয়া, ইয়েলো ফিভার ইত্যাদি কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

সর্বোপরি জ্বরের রোগীর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা ও সতর্ক পর্যবেক্ষণ দরকার। অনেক সময় সামান্য দেরি বা অবহেলা বড় বিপদের কারণ।

ডা. মাহবুবা শবনম, সহযোগী অধ্যাপক (মেডিসিন), গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>