২০১০ সালে আন্তর্জাতিক বৃত্তি নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) থেকে দেশের বাইরে পড়তে গিয়েছিলেন ২৪ জন। তাঁদের মধ্যে একজনের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৬ বছরে চিত্রটা অনেকটাই বদলেছে। এ বছর বৃত্তিসহ বিভিন্ন দেশে পড়তে যাচ্ছেন ১২৬ জন। ৫৬ জন যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে।
আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, বৃত্তি পেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া এসব শিক্ষার্থীর প্রায় ৫৫ শতাংশই নারী।
চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডিজ সোসাইটি (সিইউআরএইচএস) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সিইউআরএইচএস বলছে, একসময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরাই বিদেশে বেশি পড়তে যেতেন। এখন মানবিক, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন ও অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত আন্তর্জাতিক বৃত্তি পাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রিয় গন্তব্য এখন যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৯ সালেও গিয়েছিলেন মাত্র ৫ জন। ২০২১ সালের পর থেকে সংখ্যাটা বাড়তে শুরু করে। কারণ, কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই আবেদনপ্রক্রিয়া কিছুটা সহজ করেছিল। তবে শুধু আবেদনপ্রক্রিয়ার পরিবর্তনই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণা অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বৃত্তি সম্পর্কে তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ার বিষয়টিও এ প্রবণতার পেছনে কাজ করছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩০ শতাংশই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি পাড়ি জমাচ্ছেন জার্মানিতে। এরপর সুইডেন, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য ও ফিনল্যান্ড। ইউরোপের পর পছন্দের তালিকায় আছে চীন, মালয়েশিয়া, কোরিয়া ও জাপান। অস্ট্রেলিয়াও শিক্ষার্থীদের অন্যতম গন্তব্য।
আন্তর্জাতিক বৃত্তি অর্জনের ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাফল্য বেড়েছে। নিয়মিতই ফুলব্রাইট, কমনওয়েলথ, অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস, জাপানের মেক্সট, ইরাসমাস মুন্ডুস, মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল স্কলারশিপ, জার্মানির ডিএএডি ও সুইডিশ ইনস্টিটিউট স্কলারশিপের মতো বৃত্তি পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল–সংক্রান্ত বিষয়ের শিক্ষার্থীরাই এখনো বিদেশে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যায় তাঁরা প্রায় ৭০ শতাংশ। বিজ্ঞানভিত্তিক বিভাগগুলোর মধ্যে আবার জিনপ্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ থেকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে যাচ্ছেন। প্রায় ৩৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে রসায়ন, ফরেস্ট্রি, ফলিত রসায়ন, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা বিভাগ।
তবে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এসব বিষয়ে প্রতিবছর গড়ে এক-দুজন শিক্ষার্থী বিদেশে যেতেন। এখন সংখ্যাটা ১০-এর বেশি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, অর্থনীতি, ব্যবসায় প্রশাসনের মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এখন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ বেশি পাচ্ছেন।
কিছু সাফল্য আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও নতুন নজির তৈরি করেছে। এ বছর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মিশকাতুল মমতাজ যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহ্ জুলকার নাঈনও বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। পালি বিভাগের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন গিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে; তিনি নীলা রাখাইন। ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নেবেন তিনি। বাংলা বিভাগ থেকেও প্রথমবারের মতো একজন শিক্ষার্থী জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখন আর নির্দিষ্ট কয়েকটি বিভাগের মধ্যে আটকে নেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা বাড়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার পরিবেশ ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গবেষণাপত্র প্রকাশের হারও আগের চেয়ে বেড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও প্রকাশনা সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গবেষণা তথ্যভান্ডার স্কোপাসে অন্তর্ভুক্ত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ৬১৫টি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। স্কোপাসের চূড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সংখ্যাটা ৭০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২০২৪ সালে স্কোপাসে অন্তর্ভুক্ত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ছিল ৫৯৪। আর ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ১১৬। অর্থাৎ ছয় বছরে গবেষণাপত্র প্রকাশ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।
সিইউআরএইচএসের সভাপতি দিদারুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় অনেক সহজে তথ্য পাচ্ছেন। পাশাপাশি সিইউআরএইচএসসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণাবান্ধব সংগঠন আইইএলটিএস, জিআরই, গবেষণা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন করছে। ফলে উচ্চশিক্ষা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য আরও সহজে ও বিস্তৃতভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এমনকি অনেক শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সংস্কৃতি পরিবর্তনে এক ধরনের বিপ্লব আমরা প্রত্যক্ষ করছি।’
উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ফুলব্রাইট স্কলার খাদিজা মিতু বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আগের তুলনায় নারীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার বাধাগুলো কিছুটা কমেছে। তবে এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে।’ বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষার পরিবেশ ভালো হলেও উচ্চশিক্ষা ও পিএইচডি পর্যায়ে এসে অনেকে বিয়ে ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে পিছিয়ে পড়েন বলে মনে করেন তিনি।
গবেষণার সুযোগ বাড়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সিইউআরএইচএসের ডেপুটি মডারেটর ও তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের সভাপতি কাজী তানভীর আহম্মদ। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। গবেষণা সেলের প্রকল্প, বিভিন্ন স্কলারশিপ ও ফেলোশিপ, তরুণ শিক্ষকদের গবেষণা এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের গবেষণা ভাতা দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভর্তুকি হিসেবে কাজ করছে।’
তবে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও জীববিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় ল্যাবের জন্য আরও অর্থায়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, এসব ক্ষেত্রে আরও অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
কথা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-আমীনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বিদেশে উচ্চশিক্ষায় নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগেই এগোচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে একটি আন্তর্জাতিক অফিস চালু হয়েছে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় ও যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরির কাজ চলছে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>