বিজ্ঞাপন
কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমাদের জাতীয় আলোচনা ঘুরেফিরে কয়েকটি নির্দিষ্ট উপাদানেই সীমাবদ্ধ থাকে। সড়কের নকশাগত ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সহীন চালক কিংবা বেপরোয়া গতি। এর বাইরেও কিছু সূক্ষ্ম অথচ মারাত্মক মানবীয় আচরণগত ঝুঁকি আছে, যা প্রতিদিন নিঃশব্দে আমাদের সড়কগুলোকে মৃত্যুর মিছিলে পরিণত করছে। এমনই এক অবহেলিত ও প্রায়-উপেক্ষিত ঘাতক হলো ‘গাড়ি চালনাকালে ধূমপান’। উন্নয়ন সংস্থা ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্টিভিটিস অব সোসাইটির সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই আশঙ্কাজনক তথ্য। ড্রাইভিংকালে ধূমপান কেবল চালকের ব্যক্তিগত ফুসফুসের ক্ষতি করছে না বরং এটি হয়ে উঠেছে মনোযোগ বিচ্যুতি এবং কঠিন মাদকাসক্তির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার।
আন্তর্জাতিক ট্রাফিক নিরাপত্তা প্রটোকল অনুযায়ী, চালকের মনোযোগ বিচ্যুতি চার ধরনের হতে পারে। যথা: দৃশ্যমান, শারীরিক, জ্ঞানীয় বা মানসিক এবং শ্রবণগত। ড্রাইভিংয়ের সময় ধূমপান এমন একটি বিপজ্জনক গৌণ কাজ, যা একই সঙ্গে এই চার ধরনের মনোযোগই কেড়ে নেয়। পকেট বা ড্যাশবোর্ড থেকে লাইটার বা ম্যাচ বের করা, দেশলাই জ্বালানো, ঠোঁটে সিগারেট নেওয়া এবং ছাই ফেলা—এসব আপাত সাধারণ কাজে একজন চালকের দৃষ্টি ও হাত স্টিয়ারিং থেকে সরে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য। ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলা একটি গাড়ি মাত্র দুই সেকেন্ডে প্রায় ২৭ মিটার বা ৮০ ফিটেরও বেশি পথ অতিক্রম করে ফেলে। যে সময়ে চালকের দৃষ্টি থাকে রাস্তার বাইরে। ইতালীয় চিকিৎসা সাময়িকী অ্যানালস অব হাইজিনে প্রকাশিত মানজিয়্যারাসিনা ও পালুম্বোর গবেষণা বলছে, ধূমপানজনিত ব্যস্ততা গড়ে প্রায় ১২ সেকেন্ড মনোযোগ বিচ্যুতি ঘটায়। সাধারণ গাণিতিক হিসাব বলে, এই ১২ সেকেন্ডে ৫০ কিমি গতিতে চলা একটি গাড়ি চোখ বন্ধ রেখে ১৬০ মিটারের মতো পথ পাড়ি দেয়। রাতের বেলা ক্যাবিনের ভেতর লাইটারের আকস্মিক আলো চালকের চোখে সাময়িক ‘নাইট ব্লাইন্ডনেস’ তৈরি করে। উপরন্তু তামাকের ধোঁয়ায় থাকা কার্বন মনোক্সাইড রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয়। যা চালকের মধ্যে অলসতা, ঝিমুনি এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস ঘটায়।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক পরিবহন খাতে এ পরিস্থিতি আরও কদর্য রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ভারী যানবাহন (বাস ও ট্রাক) চালকদের প্রায় ৭৫.৯ শতাংশই তামাকসেবী এবং অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের ৫৭.৯ শতাংশ চালক চলন্ত অবস্থায় নিয়মিত ধূমপান করেন। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলন্ত অবস্থায় ধূমপানের সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার অত্যন্ত জোরালো সম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থাৎ যেসব চালক চলন্ত অবস্থায় ধূমপান করেন, তাদের দুর্ঘটনায় পড়ার ঝুঁকি সাধারণ চালকদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
ধূমপান কীভাবে একজন চালককে বেপরোয়া করে তোলে, তার একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। তামাকের প্রধান উপাদান নিকোটিন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সাময়িকভাবে উত্তেজিত করে ডোপামিন ও এড্রেনালিন হরমোন নিঃসরিত করে। এটি চালকের মধ্যে একধরনের মিথ্যা আত্মতুষ্টি বা ওভারকনফিডেন্স তৈরি করে, যার ফলে তারা বেপরোয়া ওভারটেকিং ও গতিসীমা লঙ্ঘনে প্ররোচিত হন। আবার এই ক্ষণিক উত্তেজনা কেটে গেলেই শরীরে ফুটে ওঠে নিকোটিন উইথড্রয়াল লক্ষণ। চালক তখন অস্থির ও মেজাজ খিঁচড়ে হয়ে পড়েন। তীব্র যানজট বা সিগন্যালে আটকে থাকলে এই অস্থিরতা থেকে অনবরত ও অহেতুক উচ্চশব্দের হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর প্রবণতা দেখা যায়, যা আমাদের নগরগুলোকে মারাত্মক শব্দদূষণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন
সমুদ্রে নিখোঁজ জেলের পথচেয়ে দিন কাটে পরিবারের
এর চেয়েও বড় শঙ্কার জায়গা হলো, ধূমপান কঠিন মাদক সেবনের গেটওয়ে বা প্রাথমিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। নৈশকালীন দূরপাল্লার যাত্রায় ক্লান্তি কাটাতে চালকেরা প্রথমে তামাক সেবন শুরু করেন। সময়ের পরিক্রমায় নিকোটিনের সহনশীলতা বৃদ্ধি পেলে তামাক বের করে সিগারেটের ভেতর গাঁজা কিংবা গুঁড়ো মাদক পুরে সেবনের প্রবণতা বাড়ে। চালকেরা একপর্যায়ে রাত জাগতে অ্যাম্ফিটামিন বা ইয়াবার মতো সিন্থেটিক মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ধূমপায়ী চালকদের গাড়ি চালনাকালে অন্যান্য মাদক গ্রহণের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের চেয়ে প্রায় ৮ গুণ বেশি। ২০১৯ সালে প্রবর্তিত বিআরটিএ ও পুলিশের ডোপ টেস্ট কার্যক্রমে যেসব চালক মাদকের পরীক্ষায় পজিটিভ হয়েছেন, অনুসন্ধানে দেখা গেছে তাদের প্রায় ১০০ শতাংশেরই হাতেখড়ি হয়েছিল সিগারেট দিয়ে। এই মাদকের প্রভাবেই চালকেরা রাস্তায় অলীক দৃশ্য দেখেন এবং গাড়ি খাদে ফেলে দেন বা বিপরীতমুখী গাড়িতে ধাক্কা দেন।
বাংলাদেশের ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’ (সংশোধিত ২০১৩)-এ গণপরিবহনকে ‘পাবলিক প্লেস’ হিসেবে গণ্য করে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ২০০৮ সালের ‘সড়ক পরিবহন আইন’-এ চলন্ত অবস্থায় চালকের আসন থেকে ধূমপানকে প্রত্যক্ষ ‘মনোযোগ বিচ্যুতিমূলক অপরাধ’ হিসেবে সুনির্দিষ্ট করা হয়নি কিংবা এর জন্য ‘ডি-মেরিট পয়েন্ট’ কাটার কোনো কার্যকর এনফোর্সমেন্ট ধারা নেই। যেখানে যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে ড্রাইভিং অবস্থায় ধূমপানকে ‘অসাবধানতাবশত ড্রাইভিং’ হিসেবে গণ্য করে ভারী জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। সেখানে আমাদের দেশে আইনি অস্পষ্টতা ও শিথিল প্রয়োগ দৃশ্যমান।
এই জাতীয় ঝুঁকি মোকাবিলায় কেবল আশ্বাস বা মোবাইল কোর্টের খণ্ডকালীন অভিযান যথেষ্ট নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হলে নীতিনির্ধারক, পরিবহন মালিক ও চালক সংগঠনগুলোকে নিচের সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে:
আইনি কাঠামোর সংশোধন
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-তে স্পষ্ট সংশোধনী এনে গাড়ি চালনাকালে ধূমপানকে সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং চালকের লাইসেন্স থেকে ডিমেরিট পয়েন্ট কাটার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।
লাইসেন্স প্রদান ও ডোপ টেস্টের আধুনিকীকরণ
পেশাদার চালকদের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় ডোপ টেস্টের পাশাপাশি তামাক আসক্তির মাত্রা মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে। শুধু শাস্তি নয়, চালকদের নিয়মিত মানসিক ও আচরণগত কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
আরও পড়ুন
মাদকের কড়াল গ্রাস থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
প্রযুক্তিভিত্তিক তদারকি
দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকে ইন-ক্যাব সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ‘স্মোক ডিটেক্টর’ স্থাপন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। সেন্ট্রাল মনিটরিংয়ে স্টিয়ারিংয়ে বসে ধূমপানের প্রমাণ মিললে মালিক ও চালক উভয়কে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের আইনি সুরক্ষা
চালকেরা অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকেই মূলত তামাক ও মাদকের আশ্রয় নেন। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাণিজ্যিক চালকদের টানা ৮ ঘণ্টার বেশি ড্রাইভিং নিষিদ্ধ করতে হবে এবং হাইওয়েগুলোতে পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার নিশ্চিত করতে হবে।
গণসচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
পরিবহন মালিক সমিতিগুলোকে কেবল মুনাফা না দেখে চালকদের স্বাস্থ্যের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রী ও সাধারণ মানুষকেও চলন্ত গাড়িতে চালকের ধূমপানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে।
গাড়ির স্টিয়ারিং একটি বিশাল দায়িত্বের জায়গা। সেখানে বসা চালকের হাত যদি দেশলাই বা সিগারেটের ধোঁয়ায় ব্যস্ত থাকে। তবে সেই বাহনটি আর কোনো যাত্রীবাহী যান থাকে না। তা হয়ে ওঠে একটি চলন্ত প্রাণঘাতী অস্ত্র। সময় এসেছে স্টিয়ারিং হাতে ধূমপানকে কেবল একটি ব্যক্তিগত ‘বাজে অভ্যাস’ হিসেবে না দেখে, সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি ‘প্রকাশ্য অপরাধ’ ও ‘গুরুতর হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করার। রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যত দ্রুত এই সত্য উপলব্ধি করবে; আমাদের মহাসড়কগুলো তত দ্রুত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী।
এসইউ
বিজ্ঞাপন