বিজ্ঞাপন
কখনো তার নাম মহাদেব, কখনো আবার সাধু। এছাড়াও কোথাও নিজেকে পরিচয় দেন গোবিন্দ অথবা মন্ডল নামে। একেক স্থানে একেক নাম ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করাই তার মূল পেশা। বাংলাদেশের খুব কম জেলা বাকি যেখানে তিনি প্রতারণা করেননি। দেশব্যাপী প্রতারণার জাল বিছিয়ে ব্যবসার নামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় শতাধিক কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ভয়ংকর এই প্রতারককে ধরিয়ে দিতে দেশের একাধিক জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়ে ছবিসহ বিজ্ঞাপনও প্রকাশ করা হয়েছিল।
দেশের বিভিন্ন থানায় অন্তত ৩৫টি ওয়ারেন্ট, পত্রিকায় পুরস্কার ঘোষণা ছাড়াও বিজ্ঞপ্তি, জেল-জরিমানা মাথায় নিয়েই পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে ধুলা দিয়ে এতদিন প্রতারণা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি।
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী এই প্রতারকের নাম মহাদেব চন্দ্র সাধু, পিতার নাম সোনাতন চন্দ্র সাধু, মাতা স্বপ্না রানী সাধু, ঠিকানা-গ্রাম/রাস্তা: মাগুরা, মাগুরা গোপীনাথপুর, ডাকঘর: বিনেরপোতা-৯৪০০, সাতক্ষীরা সদর, থানা ও জেলা: সাতক্ষীরা। জন্ম তারিখ ২০ মার্চ ১৯৮৪।
শনিবার কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগর থেকে এক ট্রাক খোলা চিনি জব্দ করে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ। এসময় চিনির মালিকসহ পাঁচজনকে আটক করে থানায় আনা হয়।
পুলিশের খাঁচায় বন্দি হওয়ার পরও ভয়ংকর রকমের প্রতারক মহাদেব চন্দ্র সাধু তার প্রকৃত নাম-পরিচয় গোপন করে পুলিশকে জানান, তার পিতার নাম হারান মন্ডল আর নিজের নাম মো. গোবিন্দ মন্ডল (৪২)। ঠিকানা উল্লেখ করেন খুলনা জেলার হরিণটানা থানার বটিয়াঘাটা, স্বারাপপুর বাজার এলাকা। আর বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়া শহরের হাজীর গলি, পুলিশ লাইন এলাকায় থাকেন।
পুলিশ বলছে, জাতীয় পরিচয়পত্রে তার বয়স ৪২ বলে উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত পক্ষে তার আসল বয়স ৫০ বা তার কিছু বেশি হবে।
এসময় পুলিশ তার সঙ্গে ট্রাকভর্তি ওই চিনির মালিক পাবনা সদর থানার মাদারবাড়িয়া এলাকার আব্দুল জলিল শেখের ছেলে মো. আজিজুল শেখ (৪৫), আরিফপুর, পশ্চিমপাড়া এলাকার মো. রমজান আলীর ছের মো. শামীম হোসেন (৪৮) ও আরিফপুর হাজির হাট এলাকার ওহাব আলী শেখের ছেলে মো. আব্দুল মালেক (৪৭) এবং চিনিভর্তি ট্রাকের চালক আতাইকোলা গাঙ্গুহাটি এলাকার জিলার পরামানিকের ছেলে মো. জুবেল হোসেন (৩০) নামে আরও চার জনকেও আটক করে।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, চিনি গলে গলে ট্রাকের নিচ দিয়ে রাস্তায় গড়িয়ে পড়ার কারণে সন্দেহবশত সকালে এলাকাবাসী ট্রাকটি আটক করে থানায় খবর দিলে পুলিশ ট্রাকসহ পাঁচ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। ওই ট্রাকে ১২ টন চিনি ছিল। আটক ব্যক্তিরা চিনি তাদের ক্রয় করা বলে দাবি করলেও চিনি ক্রয়ের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে আগের দিন শুক্রবার রাতে আরও দুই ট্রাক চিনি খাজানগরে প্রবেশ করেছে। অপর দুই ট্রাক ভর্তি চিনি কেন কার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে সে তথ্য উদঘাটনে অনুসন্ধান চালাচ্ছে পুলিশ।
যেভাবে ফাঁস হলো ভয়ংকর প্রতারক সাধুর গোমর
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, মূলত শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত পুলিশ মহাদেব চন্দ্র সাধুর প্রকৃত নাম-পরিচয় জানতে পারেনি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সে ছাড়া বাকি যে চারজনকে আটক করা হয়েছে তাদের দেওয়া নাম-পরিচয় অনুযায়ী রোববার মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। সকাল থেকেই ট্রাকভর্তি চিনিসহ ৫ জন আটকের খবর ছবি-ভিডিওসহ ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচার হতে থাকে। মূলত গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের কারণেই ভয়ংকর রকমের প্রতারক মহাদেব চন্দ্র সাধুর প্রকৃত নাম-পরিচয় বেরিয়ে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মহাদেব ওরফে সাধুর কাছ থেকে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তি কুষ্টিয়া মডেল থানায় ফোন করে তার বিষয়ে একের পর এক তথ্য দিতে থাকে।
ভয়ংকর প্রতারক সাধুর নামে যত মামলা-ওয়ারেন্ট
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, পুলিশ সদর দফতরের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী মহাদেব চন্দ্র ওরফে সাধুর নামে এ পর্যন্ত সার্চ করে তারা ৩৫টির মতো মামলা পেয়েছেন, যার সবগুলোই প্রতারণাসহ অর্থ আত্মসাতের মামলা। মামলাগুলোর অধিকাংশেরই ওয়ারেন্ট অর্থাৎ গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। দেশের অধিকাংশ জেলায় তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ডিএমপি, যাত্রাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ, সাতক্ষীরা, খুলনা মহানগর, চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবন নগর থানা, ঝালকাঠি, পাবনা সদর থানা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন থানাতেও রয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর থানার ওসি মো. মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মহাদেব চন্দ্র ওরফে সাধুর নামে তার থানায় ৬টি ওয়ারেন্ট রয়েছে। সে অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির এবং ভয়ংকর রকমের প্রতারক। কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের হাতে আটক হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য ভুক্তভোগীদের বেশ কয়েকজন তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
মহাদেব চন্দ্র ওরফে সাধুর প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীদের একজন সাতক্ষীরা জেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব আব্দুর সবুর। ইট ভাটা, অটো রাইস মিল, আমদানি রপ্তানিসহ তার বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে। তিনি মুঠোফোনে সাধুর প্রতারণার কাহিনী তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, মহাদেব চন্দ্র সাধু যে কত বড় মাপের প্রতারক তা বলে বোঝানো মুশকিল।
তিনি জানান, ওর (মহাদেব) কৌশল হচ্ছে প্রথমে ছোট ছোট দুই-একটা ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যম বিশ্বাস অর্জন করা। এরকম কয়েকটি ছোট খাটো লেনদেনের পরই সে চেক দিয়ে বড় লেনদেনের দিকে পা বাড়ায়। এভাবে তার কাছে দুটি চেক দিয়ে ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তিনি তার বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা আদালতে ২টি চেক ডিজঅনার এনআই অ্যাক্টের মামলা দায়ের করেছেন। তার বিরুদ্ধে ২৯-৬-২০২৬ইং তারিখে সাতক্ষীরা যুগ্ম দায়রা জজ ৩য় আদালতে এনআই অ্যাক্টের-১৩৮, সি আর-২৪৩/২০২৪ (সাত) ধারায় অর্থ আত্মসাতের মামলা রয়েছে। মামলা নং-১০২১/২০২৫। মামলার রায়ে আদালত মহাদেব চন্দ্র ওরফে সাধুকে দোষী সাব্যস্ত করে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং দুটি চেকে বর্ণিত ২ কোটি টাকা অর্থদণ্ড প্রদানের রায় দিয়েছেন। মামলায় সাজা হলেও এতদিন সে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকেছে।
তিনি জানান, সে কারণে চলতি বছরের ১৩ জুলাই তাকে ধরিয়ে দিতে এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। তার মতো আরও অনেক ব্যবসায়ীকে সে প্রতারণার মাধ্যমে পথে বসিয়েছে। তাকে গ্রেফতার করায় তিনি কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশকে ধন্যবাদ জানান।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, সে চরম ধূর্ত এবং অনেক বড় মাপের প্রতারক। শনিবার রাত ৮টার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা প্রাথমিক যে তথ্য পেয়েছি তাতে সে প্রতারণার মাধ্যমে অন্তত একশো কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সে পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো ধরনের তথ্য দিচ্ছে না। কোনো কথার উত্তর না দিয়ে মুখে কুলুপ এটে বসে থাকছে। রোববার মহাদেব চন্দ্র ওরফে সাধুসহ ৫ জনকে এক ট্রাক চিনিসহ আটকের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে। তার কাছ থেকে তার নেটওয়ার্কসহ প্রতারণার বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। তবে এর আগে সে কোনোদিন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল কি না বা সাজা খেটেছে কি না এ বিষয়ে পুলিশের কাছে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আল-মামুন সাগর/এফএ
বিজ্ঞাপন