বিজ্ঞাপন
চুল পড়া বন্ধের নতুন কিছু ওষুধ ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে চুল পড়ার ওষুধের বাজার বড় হওয়ার সম্ভাবনা এবং দীর্ঘদিন পর নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির আবির্ভাবই এর মূল কারণ।
বর্তমানে চুল পড়া বন্ধের নতুন ওষুধ তৈরিতে কাজ করছে বেশ কয়েকটি কোম্পানি। বিদ্যমান সীমিত চিকিৎসার বিকল্প তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। এ কারণে এ খাতকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও দ্রুত বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের প্রতিষ্ঠিত বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ভেরাডার্মিকসের শেয়ারের দাম ফেব্রুয়ারিতে বাজারে আসার পর থেকে প্রায় ৫০০ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যাঙ্কুভার, ওয়াশিংটনভিত্তিক অ্যাবসির শেয়ারের দামও এ বছর দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের ওষুধ কোম্পানি কসমোও চুল পড়ার জন্য তৈরি করা তাদের নতুন ওষুধ ক্লাসকোটেরোনের কারণে বিনিয়োগকারীদের নজরে এসেছে।
আরও পড়ুন
হারানো চুল ফিরল ১০০ শতাংশই, যে ওষুধে মিলল অবিশ্বাস্য ফল!
চুল পড়ার চিকিৎসায় নতুন কী
বংশগত কারণে চুল পড়াকে সাধারণত ‘প্যাটার্ন হেয়ার লস’ বলা হয়। এ ক্ষেত্রে জিনগতভাবে সংবেদনশীল চুলের গোড়া ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়। ফলে চুল পাতলা ও ছোট হতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক পাঁচ কোটি পুরুষ ও তিন কোটি নারী এই সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকের পর চুল পড়ার চিকিৎসায় নতুন কোনো ওষুধ অনুমোদন পায়নি।
বর্তমানে রোগীরা মূলত বিদ্যমান ওষুধ, বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি এবং হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের ওপর নির্ভর করেন।
নতুন ওষুধগুলোর মধ্যে অন্যতম ভেরাডার্মিকসের পরীক্ষাধীন ওষুধ VDPHL01। এটি মুখে খাওয়ার মিনোক্সিডিলের দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতার একটি নতুন সংস্করণ।
আরও পড়ুন
চুল পড়া কমাতে যা খাবেন
অনুমোদন পেলে এটি পুরুষ ও নারী উভয়ের প্যাটার্ন হেয়ার লসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদিত প্রথম নন-হরমোনাল মুখে খাওয়ার ওষুধ হতে পারে।
পুরোনো ওষুধের নতুন ব্যবহার
মিনোক্সিডিল অবশ্য নতুন কোনো ওষুধ নয়। উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার জন্য এটি প্রথম তৈরি করা হয়েছিল। পরে চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেন, এটি ব্যবহার করা ব্যক্তিদের শরীরে অস্বাভাবিকভাবে বেশি চুল গজাচ্ছে।
এরপর চুল পড়ার চিকিৎসায় মিনোক্সিডিলের ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে এটি মাথার ত্বকে লাগানোর ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
নয়াদিল্লির স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ রোহিত বাত্রা বলেন, কম মাত্রার মুখে খাওয়ার মিনোক্সিডিলও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে ব্যবহার করছেন। তবে চুল পড়ার চিকিৎসার জন্য এটি এখনো এফডিএ অনুমোদিত নয়।
আরও পড়ুন
চুল পড়া ও মাথার ত্বকের সমস্যা যেসব রোগের লক্ষণ
তার মতে, VDPHL01-এর মূল বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য মিনোক্সিডিলের নতুন কোনো আবিষ্কার নয়, বরং ওষুধটি শরীরে কীভাবে পৌঁছাবে, সেটি।
VDPHL01-এর ৮ দশমিক ৫ মিলিগ্রামের ট্যাবলেটটি শরীরে ধীরে ধীরে মিনোক্সিডিল ছাড়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মুখে খাওয়ার মিনোক্সিডিলের তুলনায় ওষুধের মাত্রা শরীরে তুলনামূলক স্থির থাকতে পারে।
ব্যবহারে সতর্কতা
মিনোক্সিডিল শরীরের রক্তনালিতে প্রভাব ফেলে। ফলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। মাত্রা বেশি হলে হৃদযন্ত্রের ওপরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
কম মাত্রার মুখে খাওয়ার মিনোক্সিডিল ব্যবহারে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। মুখ বা শরীরের অন্য অংশে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চুল গজানোর ঘটনাও ঘটতে পারে।
বিরল ক্ষেত্রে হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা এবং শরীরে পানি জমার মতো হৃদ্যন্ত্রসংক্রান্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
নয়াদিল্লির ডা. আরএমএল হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগের প্রধান কবির সারদানা বলেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার মিনোক্সিডিল মাঝারি মাত্রায় কার্যকর হতে পারে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
পরীক্ষায় কতটা চুল গজিয়েছে
ভেরাডার্মিকস এপ্রিল ২০২৬-এ পুরুষদের ওপর চালানো দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার ইতিবাচক ফল প্রকাশ করে। জুলাইয়ে নারীদের ওপর দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষার ফলও ইতিবাচক বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
পুরুষদের পরীক্ষায় প্যাটার্ন হেয়ার লসে আক্রান্ত ৫১৯ জনকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দলকে প্রতিদিন একবার VDPHL01, আরেকটি দলকে দিনে দুবার ও তৃতীয় দলকে প্লাসিবো দেওয়া হয়।
ছয় মাস পর দেখা যায়, দিনে একবার ওষুধ নেওয়া পুরুষদের চিকিৎসাধীন অংশে প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে গড়ে প্রায় ৩০টি নতুন চুল বেড়েছে। দিনে দুবার ওষুধ নেওয়া দলের ক্ষেত্রে বেড়েছে প্রায় ৩৩টি চুল।
অন্যদিকে প্লাসিবো নেওয়া দলের ক্ষেত্রে বেড়েছে প্রায় সাতটি চুল।
দিনে একবার ওষুধ নেওয়া পুরুষদের প্রায় ৭৯ শতাংশ এবং দিনে দুবার নেওয়া পুরুষদের ৮৬ শতাংশ চুলের ঘনত্বে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন। প্লাসিবো নেওয়া দলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৩৬ শতাংশ।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও এখনই এটিকে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক সাফল্য বলা যাবে না। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম এবং VDPHL01 এখনো এফডিএর অনুমোদন পায়নি।
পুরুষদের ওপর ভেরাডার্মিকসের আরেকটি বড় পরিসরের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এর ফল ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে প্রকাশের কথা। নারীদের ওপরও ওষুধটির পরীক্ষা চলছে।
শুধু মিনোক্সিডিল নয়, আসছে আরও ওষুধ
চুল পড়ার চিকিৎসায় VDPHL01-ই একমাত্র নতুন ওষুধ নয়। বিভিন্ন কোম্পানি চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন ধাপকে লক্ষ্য করে নতুন চিকিৎসা তৈরি করছে।
বংশগত পুরুষের প্যাটার্ন হেয়ার লসের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন থেকে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন বা DHT নামের একটি হরমোন তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে এই হরমোন চুলের গোড়া ছোট করে দিতে পারে।
ফলে চুল ক্রমে পাতলা ও ছোট হয় এবং একপর্যায়ে দৃশ্যমানভাবে চুল পড়ে যায়।
বিদ্যমান ফিনাস্টেরাইডের মতো ওষুধ টেস্টোস্টেরন থেকে DHT তৈরির প্রক্রিয়া কমিয়ে দেয়। এতে চুলের গোড়ায় DHT-এর প্রভাব কমে।
কসমো ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি ক্লাসকোটেরোন ভিন্নভাবে কাজ করে। এটি DHT তৈরি কমানোর পরিবর্তে চুলের গোড়ায় হরমোনের কার্যক্রম আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। পুরুষের প্যাটার্ন হেয়ার লসের জন্য এটি মাথার ত্বকে ব্যবহারের ওষুধ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।
আরেকটি সম্ভাবনাময় ওষুধ ABS-201 তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাবসি। এটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়ার ওষুধ এবং চুল পড়ার চিকিৎসায় ভিন্ন ধরনের জৈবিক প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য প্রিন্টকেএএ/
বিজ্ঞাপন