বিজ্ঞাপন
ময়মনসিংহের নান্দাইলে জীবিত মাকে কাগজপত্রে মৃত দেখিয়ে পৈতৃক বসতভিটাসহ ২১ শতক জমি বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ছেলের বিরুদ্ধে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে মায়ের মৃত্যুর ভুয়া সনদ ও ওয়ারিশান সনদ ব্যবহার করে জমি বিক্রির এমন ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার শেরপুর ইউনিয়নের রাজাবাড়িয়া গ্রামে। অভিযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জীবিত একজন নারীকে কীভাবে সরকারি কাগজপত্রে মৃত দেখানো হলো এবং সেই কাগজের ভিত্তিতে কীভাবে জমির দলিল রেজিস্ট্রি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত জমসেদ আলীর ছেলে আব্দুল জলিল দীর্ঘদিন ধরে জুয়া খেলায় আসক্ত। জুয়া খেলতে গিয়ে তিনি এর আগেও পরিবারের বিভিন্ন সম্পত্তি বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে জুয়ার টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে নিজের জীবিত মা রহিমাকে মৃত দেখিয়ে তার বসতঘরের ভিটাসহ ২১ শতক জমি বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় সাত মাস আগে গোপনে এ জমি বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। বিষয়টি পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছেও গোপন রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি জমির ক্রেতা মজিবুর রহমান তার লোকজন নিয়ে ওই বাড়ির আশপাশের পানের বরজ, বড় পুকুরসহ বিভিন্ন জায়গা নিজের বলে দাবি করে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
এরপর ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট দলিলের নকল কপি সংগ্রহ করেন। সেখানে দেখা যায়, জমির প্রকৃত মালিকদের একজন জীবিত থাকা সত্ত্বেও কাগজপত্রে তাকে মৃত দেখানো হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১১৫৪ ও ১১৫৫ নম্বরসহ মোট দুটি দলিলের মাধ্যমে ২১ শতক জমি রেজিস্ট্রি করা হয়। জমির ক্রেতা হিসেবে নাম রয়েছে পাশের পূর্ব রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত আমির হোসেনের ছেলে মজিবুর রহমানের।
বিতর্কিত দলিলের সাক্ষী হিসেবে একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মো. হোসেন মিয়া স্বাক্ষর করেছেন। আর দলিলটি সম্পাদন করেন ঝন্টু সরকার নামের এক দলিল লেখক।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, দলিল সম্পাদনের সময় যে মৃত সনদ ও ওয়ারিশান কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো কীভাবে তৈরি হলো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাইয়ের পরও কীভাবে তা গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হলো।
নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে ভুক্তভোগী বৃদ্ধা রহিমা ক্ষোভ ও অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘আমি তো মরছি না। তা অইলে কেমনে ছেলে আমারে মরা বানাইয়া জমি বেচছে? আমি এইডার কঠিন বিচার চাই।’
রহিমার অভিযোগ, তার অজান্তেই তাকে মৃত দেখিয়ে পরিবারের সম্পত্তি বিক্রি করা হয়েছে। নিজের বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় তিনি এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন।
জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগমও স্বামীর কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, আমার স্বামী নিজের মাকে জীবিত রেখে যেভাবে মৃত বলে জমি বিক্রি করে দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই মানা যায় না।
নাছিমা বেগমের দাবি, তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে জুয়া খেলায় আসক্ত। জুয়া খেলতে গিয়ে এর আগেও পরিবারের আরও অনেক জমি বিক্রি করেছেন তিনি। এবার মাকেই কাগজে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রি করার ঘটনা ঘটেছে।
অভিযুক্ত জলিলের ছোট ভাই অলি মিয়া বলেন, তার বড় ভাই মূলত একটি জুয়াড়ি চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। দিনের পর দিন ধারদেনা করে জুয়া খেলে বিপুল পরিমাণ টাকা হারিয়েছেন তিনি। একপর্যায়ে জুয়ার আসরেই জমি বিক্রির কথা বলে ওই চক্রের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেন। সেই দেনা পরিশোধ করতেই গোপনে মাকে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অলি মিয়া আরও বলেন, মা যে মারা গেলেন, সেই ভুয়া মৃত্যু সার্টিফিকেট কে দিল? আর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই বা কীভাবে এত বড় জালিয়াতির দলিল রেজিস্ট্রি করল?
তার অভিযোগ, ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত জলিল ও দলিল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত একটি চক্র তাদের পরিবারের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলিল লেখক ঝন্টু সরকার বলেন, আমাকে মৃত সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশান দিয়েছে। তা দেখে দলিল সম্পন্ন করে দিয়েছি। যাচাই করার দায়িত্ব আমার না।
তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. হামিদুল মৃত সনদ ও ওয়ারিশান দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আসলে আমার ভুল হয়ে গেছে। এখন বিষয়টি দেখছি।
একজন জীবিত মানুষকে সরকারি নথিতে মৃত দেখিয়ে তার সম্পত্তি বিক্রির অভিযোগ শুধু একটি পরিবারের জমি নিয়ে বিরোধের বিষয় নয়, এর সঙ্গে সরকারি নথির সত্যতা, স্থানীয় পর্যায়ে সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন মানুষের মৃত্যু সনদ তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি তার মৃত্যুর বিষয়ে যথাযথভাবে খোঁজ নিয়েছিল? ওয়ারিশান সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রেই বা কী ধরনের যাচাই করা হয়েছিল? আর এসব কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে জমি রেজিস্ট্রির আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করেছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
হোসাইন সুলভ/এফএ
বিজ্ঞাপন