বিজ্ঞাপন
দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর হয়ে গেছে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী জুবিন গার্গকে হারানোর। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তার আকস্মিক মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছিল গোটা ভারতজুড়ে। প্রিয় শিল্পীকে হারানোর সেই শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তার স্ত্রী গরিমা শইকীয়া। জুবিনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর আগে সম্প্রতি কলকাতা ঘুরে গেছেন তিনি। আর শহরের অলিগলি থেকে পরিচিত নানা জায়গায় বারবার ফিরে এসেছে প্রয়াত স্বামীর স্মৃতি।
জুবিনের সঙ্গে বহুবার কলকাতায় এসেছেন গরিমা। ফলে এই শহর তার কাছে নতুন নয়। বরং কলকাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের একসঙ্গে কাটানো নানা স্মৃতি। এবারও শহরে এসে সেই স্মৃতিই যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে তার কাছে।
শুধু গান নয়, বাংলা সংস্কৃতির প্রতিও জুবিনের ছিল গভীর ভালোবাসা। বাংলা বই পড়া ও বাংলা সিনেমা দেখতে পছন্দ করতেন তিনি। গরিমা জানান, ছোটবেলা থেকেই বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন জুবিন। তার পরিবারেও বাংলা বই পড়া ও সিনেমা দেখার চর্চা ছিল।
আরও পড়ুন
ওটিটিতে ‘বিশ্বনাথ অ্যান্ড সন্স’, দর্শকদের উচ্ছ্বাস
সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা দেখেছেন তারা। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাও পড়েছেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, পূর্ববঙ্গের সঙ্গেও জুবিনের ছিল আত্মিক টান। দুই বাংলার প্রতি ভালোবাসা থেকেই বাঙালি খাবারের প্রতিও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। ইলিশ, চিংড়ি ও পাবদার পাশাপাশি পোস্তও ছিল তার প্রিয়। সপ্তাহে অন্তত এক দিন তারা বাঙালি খাবার খেতেন বলেও জানান গরিমা।
জুবিনের কথা বলতে গিয়ে এখনো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন গরিমা। এক বছর হতে চললেও প্রয়াত স্বামীকে নিজের কাছ থেকেই হারিয়ে ফেলেননি তিনি। বরং মনের মধ্যেই জুবিনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
গরিমা বলেন, ‘মনের মধ্যে আসলে এক লড়াই চলতে থাকে। কিন্তু ওর সঙ্গেই আমি বাঁচি। ওকে আমার মনের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছি। আমি বিশ্বাস করি, ও আছে আমার সঙ্গে।’
আরও পড়ুন
১০ হাজার টাকা ছিল ব্যাংকে, যেভাবে ৮০ কোটির মালিক হলেন আয়ুষ্মান
তবে কখনো কখনো বাস্তবতা তাকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। তখন জুবিনের অনুপস্থিতির শূন্যতা আরও গভীরভাবে অনুভব করেন তিনি। গরিমার কথায়, মনে হয় জুবিন এখনো তার সঙ্গে আছেন। কিন্তু হঠাৎ বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন বুঝতে পারেন, বিরাট এক শূন্যতা তাকে ঘিরে আছে। আর সেই শূন্যতা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার সঙ্গী হবে।
এই শূন্যতার সঙ্গে লড়াই করেও থেমে যেতে চান না গরিমা। বরং জুবিনের কাজই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিচ্ছে। প্রয়াত স্বামীর রেখে যাওয়া কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি।
গরিমা বলেন, ‘ওর অনুপ্রেরণাতেই আমি এগিয়ে যেতে পারি। আমাকে এগোতে তো হবেই। থমকে গেলে চলবে না। ওর ঐতিহ্য বহন করার দায়িত্ব আমার ওপরেই। তবে আমি জানি না, আমার মধ্যে সেই যোগ্যতা রয়েছে কি না।’
জুবিন পরিবেশ রক্ষার জন্য নিয়মিত কাজ করতেন। সেই কাজকে অগ্রাধিকার দিয়েই এগিয়ে যেতে চান গরিমা। পাশাপাশি নতুন প্রজন্ম ও শিশুদের শিক্ষার জন্যও বেশ কিছু উদ্যোগ ছিল জুবিনের। বিশেষ করে অসমিয়া ভাষা ও মাতৃভাষার প্রতি শিশুদের আগ্রহ তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি।
গরিমা জানান, বর্তমানে অনেক বাবা-মা সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ান। ফলে মাতৃভাষা শেখার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে। জুবিন চাইতেন, শিশুরা যেন নিজেদের মাতৃভাষা আসামিয়া ভালোভাবে শেখে। তার শুরু করা এসব কাজ কোনোভাবেই থেমে যেতে দিতে চান না গরিমা।
একজন শিল্পী হিসেবে জুবিনের প্রভাব ছিল ব্যাপক। তবে সংগীতের বাইরেও পরিবেশ, সমাজ ও নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন তিনি। তাই তার মৃত্যুর পর অসমের রাস্তায় নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। দীর্ঘ সময় শোকের আবহে ছিল গোটা রাজ্য।
জুবিনের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে তিনি নিজেও কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন বলে জানান গরিমা। তার ভাষ্য, জুবিন প্রায়ই বলতেন, তার কিছু হয়ে গেলে সাত দিন অসম বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এত দ্রুত এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা কেউ ভাবেননি।
এদিকে জুবিনের জীবন ও কাজ নিয়ে নির্মিত হচ্ছে সিনেমা। বাঙালি সংগীত পরিচালক শ্রীপ্রীতম নির্মাণ করছেন ‘লভ ইউ জুবিনদা’ নামের ছবিটি। জুবিনের সুরে গানও গেয়েছেন এই অসমিয়া শিল্পী। সেই ছবির শুটিং শুরু হয়েছে কলকাতায়। শুটিং উপলক্ষেই সম্প্রতি শহরটিতে এসেছিলেন গরিমা।
কলকাতায় এসে পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে যান তিনি। মনে পড়ে, কখনও পাঁচতারা হোটেলে থাকতে ভালোবাসতেন জুবিন, আবার কখনো সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যেও ঘুরে বেড়াতেন। তাই জুবিনকে হারানোর পরও কলকাতার রাস্তা-গলি ও পরিচিত জায়গাগুলো গরিমার কাছে আজও আপন।
জুবিন নেই, কিন্তু তার কাজ ও আদর্শকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চান গরিমা। প্রয়াত স্বামীর রেখে যাওয়া পরিবেশ, শিক্ষা ও মাতৃভাষা নিয়ে কাজগুলোই এখন তার কাছে হয়ে উঠেছে স্মৃতি ধরে রাখার অন্যতম পথ।
এমএমএফ
বিজ্ঞাপন