জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে স্বামী মো. জসিম উদ্দিন প্রাণ হারিয়েছেন। পরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে মেয়ে। আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দিতে এসে দুই প্রিয়জনকে হারানোর কথা তুলে ধরতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা বেগম।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার সাক্ষী রুমা বেগম। পটুয়াখালীর বাসিন্দা রুমা বেগম একজন গৃহিণী। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে তাঁর স্বামী মো. জসিম উদ্দিন শহীদ হন। জসিম ঢাকায় একটি এনজিওর গাড়ি চালাতেন।
জবানবন্দিতে রুমা বেগম বলেন, তাঁর স্বামী জসিম উদ্দিন একটি এনজিওতে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। তখন তাঁরা রাজধানীর আদাবর থানার শেখেরটেক ৬ নম্বর সড়কের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তাঁর স্বামী নামাজ পড়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। সেদিন সন্ধ্যায় এক প্রতিবেশী তাঁকে জানান, তাঁর স্বামী আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন। সেখানে পৌঁছে অপারেশন থিয়েটারের সামনে তাঁর স্বামীকে রক্তাক্ত অবস্থায় ট্রলিতে দেখেন।
এই কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা বেগম। তিনি বলেন, তখন তাঁর স্বামীর জ্ঞান ছিল। তিনি দেখতে পান, গুলি তাঁর স্বামীর বুকে লেগে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। ক্ষতস্থানে গজ ভরে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরও রক্ত বের হচ্ছিল। তাঁর স্বামী তাঁকে জানান, সেদিন জুমার নামাজ পড়ে তিনি আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে যান। সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
২০২৪ সালের ২৯ জুলাই তাঁর স্বামী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান উল্লেখ করে রুমা বেগম বলেন, অনেক জটিলতা শেষে ৩১ জুলাই স্বামীর মরদেহ পান। পরে গ্রামের বাড়িতে তাঁর স্বামীকে দাফন করা হয়। তিনি স্বামী হত্যার বিচার চান।
এ মামলার ২৮ আসামির মধ্যে ৪ জন গ্রেপ্তার আছেন। তাঁরা হলেন সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন ও যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী।
নানক, তাপসসহ এ মামলার ২৪ আসামি পলাতক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশ সদর দপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও পুলিশের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সাবেক এডিসি রৌশানুল হক সৈকত।
নির্যাতনের শিকার হয়ে মেয়ের আত্মহত্যা
জবানবন্দিতে রুমা বেগম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে তিনি গত বছরের ১৭ মার্চ ঢাকায় আসেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর ভাই, মেজ মেয়ে ও ছোট ছেলে ছিল। তাঁর বড় মেয়ে তখন উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী ছিল। তাই তাকে বাড়িতে রেখে আসেন। সে বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করত। গত বছরের ১৮ মার্চ তাঁর বড় মেয়ে বাবার কবর জিয়ারত করে আসার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে যৌন নির্যাতন করে। ওই ঘটনার খবর সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর মেয়ে মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যা করে।
উল্লেখ্য, গত বছর ২৬ এপ্রিল রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার ভাড়া বাসা থেকে রুমা বেগমের বড় মেয়ের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁকে নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায় এজাহারভুক্ত দুজনসহ তিন কিশোরকে অভিযুক্ত করা হয়। গত বছর ২২ অক্টোবর পটুয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় দেন। তাতে দুই কিশোরকে ১৩ বছর করে এবং অন্যজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>